সেরা অর্জন ও উন্নত দেশের হাতছানি 

স্বাধীনতার পর পর সদ্যভূমিষ্ঠ বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ তকমা দিয়েছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। সেই দেশটি এখন সমৃদ্ধির দুয়ারে কড়া নাড়ছে। ইতিমধ্যে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি। উন্নত দেশ হওয়ার সিঁড়িতে পা রেখেছি বলা যায়। আগামী দুই দশকের মধ্যে উন্নত দেশের মর্যাদা ছিনিয়ে আনব, এটি নিজেদের কাছেই আমাদের নিজেদের প্রতিশ্রুতি। এটি আসলে আমার সন্তানের কাছেও আমার প্রতিশ্রুতি। কারণ আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন। তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ থেকেও তাদের প্রজন্মই আমাদের মুক্তি দিয়েছেন। এখন এটিকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদের কাঁধে।

আমরা যারা ৫০ এমনকি ৪০ বছরের নিচের বয়সি, তারা ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র সেই তাচ্ছিল্য হয়তো সরাসরি অনুভব করিনি। তবে যতই এ দেশের মাটি-পানি-বাতাস গায়ে মেখে বড় হয়েছি, ততই তাচ্ছিল্যটা ধরতে পেরেছি। কী পরিমাণ অপমানের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আমার পূর্বপ্রজন্মকে, সেটা চিন্তা করে আমার নিজের বুকের ভেতরটা ব্যথায় টনটন করে ওঠে। তবে এটাও বলি যে, এই অপমানের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কারণে আমাদের মধ্যে একটা জেদও তৈরি হয়েছে। বলতে গেলে দাঁতে দাঁত চেপে আমাদের উন্নয়নের পথ খুঁজতে হয়েছে।

আমার বিবেচনায় এই জেদটাই আমাদের শক্তি। এটি আমাদের এগিয়ে যাওয়ার প্রশস্ত পথরেখা তৈরি করতে সাহায্য করছে। এই পথ ধরেই বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের তালিকার জ্বলজ্বলে উজ্জ্বল নাম। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। খবরটা এমন সময় এলো, যখন স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পূর্ণ করার একেবারে দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আমরা। ৫০ বছরের অর্জনকে উদ্যাপন করতে এরচেয়ে বড় উপলক্ষ্য হয়তো আর হয়ই না।

এই অর্জনকে আমি আমাদের ৫০ বছরের অর্জন বলব না। তবে ৫০ বছরের মধ্য নিশ্চয়ই এটি সেরা অর্জন। আমার বিবেচনায় গত মাত্র ১০-১২ বছরের প্রচেষ্টায় এসেছে অর্জনটি। কারণ ২০০৮ সালের আগে তো আসলে এমন অর্জনের স্বপ্নও ছিল আমাদের কাছে দুঃস্বপ্নের মতো। ১৯৯৬ সালের আগে তো ধার-দেনা আর সহায়তাই ছিল বাজেট তৈরি করার মূল জোগান। আর এখন আমরাই বরং অন্য দেশকে চলার জন্য ধার দিচ্ছি। কিছুদিন আগে শ্রীংকাকে যেমন বাংলাদেশের রিজার্ভ থেকে ২০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়টা বোঝা যায়।

আমার কাছে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ যেমন একটি জাতিকে জাগিয়ে তোলার ঘোষণা, তেমনি ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর মতো দিনবদলের স্লোগানও গোটা জাতিকে আড়মোড়া ভেঙে জাগিয়ে তোলারই মন্ত্র। আমি এই মন্ত্রে বিশ্বাসীদের একজন।

আমি বিশ্বাস করি যে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার ঘোষণার পেছনে দেশের প্রতিটি মানুষেরই কম-বেশি ভূমিকা আছে। তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে নিঃসন্দেহে ১৩ বছর আগের সেই সুদূরপ্রসারী ঘোষণা, যেখানে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে ‘ডিজিটাল দেশ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। আমি তখন সদ্যপাস করা একজন বিজনেস গ্র্যাজুয়েট মাত্র। কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণাটা শুনেই কেন যেন উদ্দীপ্ত হয়েছিলাম। এরপর একের পর এক ডিজিটাল সেবা কোম্পানি গঠন করেছি। আমার মতো অনেকেই ঝাঁপিয়ে পড়েন। শত শত ডিজিটাল কোম্পানির প্রতিষ্ঠা হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে ডিজিটাল অবকাঠামো। সহস্র-লক্ষ কর্মসংস্হা সৃষ্টি হয়েছে। ভেতর থেকেই দেশের চেহারাটা বদলে গেছে তাতে। ফলে একটু একটু করে উন্নতির দিকে এগিয়েছি আমরা।

ডিজিটাল বাংলাদেশের এই পথপরিক্রমাতেই জন্ম হয়েছে ‘নগদ’-এর মতো কোম্পানির। হাতের মুঠোয় লেনদেনকে নিয়ে আসতে ডাক বিভাগের একটি অঙ্গ সংস্হাও যে নেতৃত্ব দিতে পারে, ‘নগদ’-ই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আমি তো দেখতে পাচ্ছি মাত্র তিন বছর আগের এই উদ্ভাবনের ফলে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের বিপ্লব হয়েছে দেশে; এতে করে সামগ্রিকভাবে আর্থিক সেবার ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত হয়েছে।

শুধু লেনদেনের প্রেক্ষাপটে নয়, আরো অনেক দিক থেকেও আমূল পরিবর্তন হয়েছে। কয়েক দিন আগে দেখলাম, রাজশাহীতে বসে একটা কোম্পানি গোটা বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিকে সেবা দিচ্ছে। রাজশাহীর ঐ কোম্পানিটিতে এমনকি মাসে ১২ লাখ টাকা বেতন পাওয়া কর্মীও আছে! চিন্তা করেন পরিস্হিতি একবার। শুধু রাজশাহী নয়, গোটা দেশে এমন অসংখ্য উদাহরণ মিলছে। এসবই হচ্ছে, ২০০৮ সালের ঐ একটি ঘোষণার ফলাফল।

ডিজিটাল বাংলাদেশের ঘোষণায় ছিল জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। সেখানকার উন্নতির গ্রাফটা এখনই মাপা না গেলেও গোটা আর্থসামাজিক খাতেই বাঁক বদলের ঘটনা ঘটে গেছে। সেটা কড়া সমালোচকও স্বীকার করছেন। মূলত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর ঐ ঘোষণাতেই বড় রকম উন্নতি হয়েছে নানান ক্ষেত্রে। যার ফলে, কিসিঞ্জারের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এখন ‘এশিয়ান টাইগারস’। মাত্র কয়েক দশক আগেও এশিয়ান টাইগার বলতে সাধারণত হংকং, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানকেই বোঝাত। এই চার দেশ ১৯৬০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুবাদেই মূলত অমন খ্যাতি পেয়েছিল। আর ২০০৯ সাল থেকে পরের এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে নতুন ‘এশিয়ান টাইগার’ বাংলাদেশ। আমার বিবেচনায় এটি ঐ এক ঘোষণারই ফসল।

উন্নতির ক্ষেত্রে আমাদের বিশাল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীও বড় রকম ভূমিকা রেখেছে। আজকের কোরিয়া যে উন্নতির শিখরে চলে গেছে, সেখানে তাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। আমরাও এখন সেই অবস্হানে আছি। আরো বেশ কিছু সময় আমাদের এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট থাকবে। পৃথিবীতে কিন্তু আবার ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের সুবিধা না নিতে পারারও যথেষ্ট উদাহরণ আছে। নাইজেরিয়া তার একটি।

তারুণ্যের এই শক্তির ওপরে ভর করেই অর্থনীতির চাকা চলার গতি পেয়েছে। এই গতি আরো উচ্চগতি পাবে এবং প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিটে পৌঁছে গিয়ে উন্নতিকে ত্বরান্বিত করবে, এটি আমাদের বিশ্বাস। তাতে করে পরের ২০ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ উন্নত দেশ হবে, এটি বলে দেওয়াই যায়।

লেখক: ডাক বিভাগের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’-এর ব্যবস্হাপনা পরিচালক ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা