বৈরী আবহাওয়ায় যুদ্ধ করে মাছ ধরতে হয়। মাছ ধরে ফেরার পর সেই মাছ বিক্রির অর্থ প্রায় পুরোটাই চলে যায় মহাজনের পকেটে। ১৫ থেকে ১৮ দিন সাগরে থাকার পরে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা জোটে জেলেদের। অথচ নৌকায় তারা ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার মাছ নিয়ে ফিরে আসেন। মহাজনরা দাদন প্রক্রিয়াকে এমনভাবে সাজিয়েছে সেটাকে জেলারা জালের সঙ্গে তুলনা করেন। এই জাল ছিঁড়ে তাদের বের হওয়ার সুযোগ নেই। যত টাকার মাছই তারা ধরুক না কেন জেলেদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না। গত রবিবার সরেজমিন বরগুনার পাথরঘাটায় লঞ্চঘাটে জেলে-নৌকার মাঝিদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।
পাথরঘাটার ফোরকান খাঁ (৪০) গত ২৬ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরেন। ১৪ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে নৌকায় উঠেছিলেন। এখনো সাগরেই কাটে তার জীবনের বড় একটা সময়। জলদস্যু-ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তাকে মাছ ধরতে হয়। পাঁচ বার ডাকাতের কবলে পড়েছেন। ঘুদ্ধ করে ফিরে এসেছেন। ফোরকান বলছিলেন, ‘আমরা যখন সাগরে যাই মহাজন প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে দাদন দেন। এই টাকা দিয়ে আমরা পরিবারের জন্য খাবার কিনে দিয়ে সাগরে যাই। একবার সাগরে গেলে অন্তত ১৫ দিন, কখনো-বা ২০-২৫ দিনও পার হয়ে যায়। আসল কথা মাছ না ধরে তো ফিরে এসে কোনো লাভ নেই। আমরা নৌকায় ১৭ জন থাকি। সর্বশেষ বার আমরা ৩ লাখ টাকার মাছ ধরে ফিরেছি। সাগরে যাওয়ার সময় নৌকার তেল, আমাদের খাবারসহ সবকিছু মহাজন কিনে দেন। কত টাকার কেনেন আমরা জানি না। উনিই টাকা নির্ধারণ করে জানিয়ে দেন ২ লাখ টাকা তার খরচ হয়েছে। আবার মাছ ধরে ফিরে মহাজনের কাছেই বিক্রি করতে হয়। উনি যে দাম দেন সেটাই নিতে হয়। এখানে আমাদের কোনো স্বাধীনতা নেই।’
খায়রুল আলম নামে আরেক জেলে জানালেন, ‘মহাজন যখন মাছের দাম নির্ধারণ করেন ৩ লাখ টাকা, তার মধ্যে তার খরচের ২ লাখ আগেই বাদ। বাকি থাকে ১ লাখ। বিনিয়োগ করার কারণে এই ১ লাখের অর্ধেক মহাজনের। অর্থাৎ ৫০ হাজার টাকা। বাকি যে ৫০ হাজার তার অর্ধেক নৌকার মাঝির। এরপর যে ২৫ হাজার টাকা থাকে সেটা আমাদের ১৭ জনকে ভাগ করে দেয়। এর মধ্যে আগেই তো ১০ হাজার টাকা মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়েছি। ফলে এক টাকাও আমরা হাতে পাই না। এখানে যে হাজার দেড়েক টাকা পেলাম সেটা ঐ ১০ হাজার থেকে বাদ যাবে। ফলে মহাজনের ঋণ আমাদের কখনোই শেষ হয় না।
যদি ৫ লাখ টাকার মাছও ধরতাম, তাও আমরা হাতে এক টাকাও পেতাম না। নিজের জাল নেই, নৌকা নেই ফলে মহাজনের কাছ থেকেই সবকিছু নিতে হয়। উনি যেভাবে বলেন সেভাবেই মানতে হয়। মৃত্যু পর্যন্ত মহাজনের দাদন আমাদের শেষ হয় না। তবে কেউ মারা গেলে মহাজনরা টাকা মাফ করে দেন।’ তবে পাথরঘাটা আড়তদার সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর জমাদ্দার বলেন, ‘আমরা তো তাদের পেছনে বিনিয়োগ করি। এর মধ্যে ঝুঁকি থাকে বেশি। ২ লাখ টাকা খরচ করে নৌকা পাঠানোর পর অনেক সময় দেখা যায় ৫০ হাজার টাকার মাছও তারা আনতে পারেনি। ফলে এই লসটা আমাদেরই নিতে হয়। সাগরে যাওয়ার আগে জেলেদের যে টাকা আমরা দেই সেই টাকা তো ওরা কোনো দিন শোধ করতে পারে না। আমাদের অনেক লসও হয়। তারপরও জেলেদের টাকা দেওয়ার জন্য কোনো চাপ দেওয়া হয় না। ওদের দস্যুরা অপহরণ করলে আমরা চাঁদা পরিশোধ করে ওদের ফিরিয়ে আনি। এই টাকা তো ওদের পরিবারের কেউ শোধ করে না। কেউ বলতে পারবে না, টাকার জন্য জেলেদের আমরা দস্যুদের কাছ থেকে মুক্ত করে আনিনি।’ ১২ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরেন ছগির ফরাজী (৫৫)। তিনি বলছিলেন, কম মাছ নিয়ে ফেরার পর মালিকের খরচের টাকা না উঠলে বাকি টাকা আমাদের নামে ঋণ হিসেবে লিখে রাখেন। পরের বার মাছ ধরতে যাওয়ার পর বেশি মাছ ধরলে আগের ঋণের টাকা কেটে রাখেন। এই কারণে মালিকদের ঋণ আমাদের কোনো দিনও শোধ হয় না। আমরাও মেনে নিয়েছি, যতদিন বেঁচে থাকব মালিকদের ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে আমাদের বাঁচতে হবে। মারা গেলে মালিক মাফ করে দেবেন। এই থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই আমাদের।’ বরগুনার ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম চৌধুরী বলেন, ‘একটা ট্রলার তৈরি করতে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা খরচ হয়। একটা ট্রলার সাগরে পাঠাতে জেলেদের পেছনে কম করে হলেও ২ থেকে ৩ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। এর বাইরে জালসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র তো আছেই। এত টাকা বিনিয়োগের পরও লাভের পরিমাণ খুবই কম। এই টাকা যদি আমরা অন্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করতাম তাহলে অনেক বেশি লাভ হতো। বরং এভাবে আপনারা বলতে পারেন, আমরা এই গরিব জেলেদের খাওয়া-পরা দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছি।’