‘দীরহাম দৌলত দিয়ে ক্রীতদাস গোলাম কেনা চলে। বান্দা কেনা সম্ভব—! কিন্তু—কিন্তু—ক্রীতদাসের হাসি—না-না-না-না-।’
কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান রচিত ‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসটি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় তত্কালীন পাকিস্তানি স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খানের আমলে, ১৯৬৩ সালে। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন পাকিস্তানের সব ধরনের বাক-স্বাধীনতা হরণ করেছিল। সেই স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের শাসনব্যবস্থাকেই ব্যঙ্গ করে রচিত হয় উপন্যাসটি।
এ উপন্যাসের মূল চরিত্র ‘তাতারী’। গণতান্ত্রিক চেতনাকে ভয় পায় স্বৈরাচারী শাসক। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে শওকত ওসমানের ‘ক্রীতদাসের হাসি’র তাতারী। খলিফা হারুন-অর-রশিদ কোনো কিছুর বিনিময়েই তাতারীর হাসি কিনতে পারে না। তাতারী মনে করে, খলিফার নির্দেশে হাসার চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়। উপন্যাসের অন্তিম মুহূর্তে ক্রীতদাস তাতারীর এ আর্তনাদ যেন স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাত কোটি মানুষেরই প্রতিধ্বনি। অথচ এ রূপক উপন্যাসের জন্য স্বয়ং আইয়ুব খানই লেখককে ‘আদমজী সাহিত্য পুরস্কার’ প্রদান করেছিল। পরবর্তীকালে শওকত ওসমান লিখেছিলেন, ‘জুয়াড়ির মতো আমি দান ধরেছিলাম। হয় জয়, অথবা সর্বনাশ সুনিশ্চিত। জিতে গিয়েছিলাম শাসকশ্রেণির মূর্খতার জন্যে। বছরের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের পুরস্কার পায় ক্রীতদাসের হাসি।’
খলিফা হারুন-অর-রশিদ নিজের বোন আব্বাসাকে হত্যা করেছিলেন জাফরের সঙ্গে প্রণয়ের জন্য। তারপর নিজেই নিজের কাছে বারবার অনুতপ্ত হয়েছেন। এই অনুতাপ-অনুশোচনা ক্রমেই তাঁর আনন্দের দ্বার সংকুচিত করে ফেলছিল। খলিফার এ অবস্থা দেখে জল্লাদ ও তার সহচর মশরুর তাঁকে রাতের নির্মল পরিবেশে বাগানে পায়চারি করার পরামর্শ দেন। অতঃপর খলিফা রাতের আঁধারে সেখানে পায়চারি করতে গিয়ে দুটি মানব-মানবীর অস্পষ্ট হাসি শুনতে পান।
‘কোথা থেকে আসছে এই হাসি?’—তা বের করতে গিয়েই হাবশি গোলামের সন্ধান পেলেন খলিফা। কী এই প্রাণখোলা হাসির রহস্য? ঐশ্বর্য, খ্যাতি, প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি ঐ গোলামের মতো হাসতে পারছেন না?
সেই দুই মানব-মানবীকে খুঁজে বের করলেন খলিফা। দুজনকেই ক্রীতদাসের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে দিলেন তিনি। কিন্তু প্রকৃত অর্থে কেউই স্বাধীন রইল না। তাতারীর হাসি শোনার জন্য তাকে অঢেল সম্পদ আর সেবাযত্নকারী দাস দিয়ে বাড়িতেই আটকে রাখলেন খলিফা। অন্যদিকে আর্মেনীয় সুন্দরী মেহেরজানেরও স্থান হলো খলিফার হেরেমে। কিন্তু মেহেরজানকে হারিয়ে তাতারীর সেই প্রাণ চাঞ্চল্যকর হাসি হারিয়ে গেল। মেহেরজানের সান্নিধ্য তাঁকে যে আনন্দ দিতে পারত, এই অঢেল ধন-সম্পদ আর এত দাসদাসী তার যত্সামান্যও দিতে পারে না।
সেই পরাধীনতার শৃঙ্খল আর আর্তনাদকেই ঔপন্যাসিক শওকত ওসমান রূপকভাবে তুলে ধরলেন পাকিস্তানি-বাংলার পরাধীন জাতির মর্মবেদনা হিসেবে। যেখানে রূপক অর্থে পূর্ব বাংলা হয়ে উঠেছে বাগদাদ, খলিফা হারুন-অর-রশিদ হলেন স্বয়ং আইয়ুব খান আর তাতারী হয়ে উঠল স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের প্রতিনিধি। অর্থ, ক্ষমতা আর শক্তি দেখিয়ে মানুষের মুক্ত-স্বাধীন মন অধিকার করা যায় না। ‘হাসি মানুষের আত্মারই প্রতিধ্বনি’—বাক্যটির মাধ্যমে লেখক যেন স্বাধীনতার পূর্বাভাস দিচ্ছিলেন। আর পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষের চেপে রাখা প্রতিবাদকে ফুটিয়ে তুলেছেন হাবশি গোলাম তাতারীর আর্তনাদের মাধ্যমে।
আর এই রূপক অর্থকে ঢাকতে শওকত ওসমান ধার নিলেন আরব্য রজনীর ছদ্মবেশকে। ‘আলেফ লায়লা ওয়া লায়লা’কে পরিণত করলেন ‘আলেফ লায়লা ওয়া লায়লানে’তে। যার শেষ গল্প এই ‘জাহাকুল আবদ’ অর্থাৎ ‘ক্রীতদাসের হাসি’।
[চট্টগ্রাম]