বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ৫০ বছরপূর্তির সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ১৫-১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সফর করছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ।
গত ২৬ মার্চ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। একই বছরে প্রতিবেশি দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরে আসা ইতিহাসে বিরল ঘটনা। আগামী ২৬ জানুয়ারি ভারতের ৭৩তম প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনিই প্রথম এই সম্মান পাচ্ছেন। এ ঘটনা শুধু বাংলাদেশের মানুষের নয়, ভারতসহ সব বাঙালির জন্য গর্বের।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শুধু দুটি রাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, দু-দেশের জনগণের মধ্যেও বিদ্যমান। মহান মুক্তিযুদ্ধে দুই দেশের বীর শহিদদের মিলিত রক্তধারার ওপর নির্মিত এই সম্পর্ক। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও সমঝোতা ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি সম্পর্ক। এই সম্পর্কে কোনো দেনা-পাওনার হিসেব নেই। এই সম্পর্ক চিরস্হায়ী সম্পর্ক, যেমনভাবে ১৯৭২ সালের ফেব্র‚য়ারিতে কলকাতায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্ব চিরকাল অটুট থাকবে। বিশ্বের কোনো শক্তিই এটিকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না।’
১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল; কিন্তু অনানুষ্ঠানিক স্বীকৃতিটি মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরই দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। যখন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতার শিকার বাংলাদেশের মানুষ জীবন বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শুরু করলে সীমান্ত খুলে দেয় ভারত সরকার। পাকিস্তানের দখল থেকে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার জন্য ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রসহ প্রশিক্ষণের ব্যবস্হা করে মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়ে দিয়েছিল। এক কোটি লোককে আশ্রয় ও খাদ্য সরবরাহ, বাংলাদেশকে সমর্থন করতে বহির্বিশ্বে কুটনৈতিক প্রচেষ্টা চালায় ভারত সরকার। দু-দেশের সম্পর্কের বন্ধনটা তো তখনই বাঁধা হয়ে গিয়েছিল।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন হয়ে স্বদেশে ফেরার পথে ভারতের সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য দিল্লি হয়ে ঢাকায় ফিরেছিলেন। এর পরও বঙ্গবন্ধু আরো একাধিকবার ভারত সফর করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে ১৭ মার্চ ১৯৭২ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী ও ১৫ জুন ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। দুই দেশ শুরু থেকেই যে তাদের সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিল, এই সফরগুলো তারই প্রতিফলন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর এই সম্পর্ক থমকে যায়। অগণতান্ত্রিক সামরিক সরকার ও পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকা কালেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খুবই শীতল হয়।
তবে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পাঁচ মাসের মধ্যেই গঙ্গার ঐতিহাসিক পানিবণ্টন সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়। ঐতিহাসিক গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিটি দুই প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দ্বিতীয় বার সরকার গঠন করলে দুই দেশের সম্পর্ক আবার মূলধারায় ফিরে আসে। তবে ২০১৪ সালে ভারতে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্কের ক্ষেত্রে তৈরি হয় এক নতুন মাইলফলক। দু-দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইসু্যগুলো নিষ্পতি হতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি ভারত সফর করেন। ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফর করেন। ভারতের একমাত্র বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রথম সফর হিসেবে বাংলাদেশকেই বেছে নেন। ২০১৩ সালের ৩ মার্চ তিনি বাংলাদেশ আসেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর ভারত সফর করেন।
ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৫ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। তার সফরের এক মাসের মধ্যেই দীর্ঘ ৬৮ বছরের সংকট ছিটমহল সমস্যার শান্িতপূর্ণ সমাধান হয়। ২০১৬ সালের ১৬ অক্টোবর ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস-বিমসটেক আউটরিচ শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের সময় শেখ হাসিনা-নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল ভারত সফরে গিয়ে রাষ্ট্রপতির বাসভবনে অবস্হান করেছিলেন, যা ভারতের ইতিহাসে প্রথম কোনো ঘটনা। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ১৯ মার্চ ২০১৮ নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সোলার অ্যালায়েন্স ফাউন্ডিং কনফারেন্সে অংশ নিতে ভারত সফর করেন। একই বছরের ২৫ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্িতনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পশ্চিমবঙ্গ সফর করেছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ঐ অনুষ্ঠানে ছিলেন।
বাংলাদেশ-ভারত দু-দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যে কুটনৈতিক বেড়াজালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তার প্রমাণ বেশ কিছু সফর থেকে পাওয়া যায়। ১৯ জানুয়ারি ২০১০ সালে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শ্রী জ্যোতি বসুর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কলকাতা সফর, ১৯ আগস্ট ২০১৫ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী শ্রীমতী শুভ্রা মুখোপাধ্যায়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফর, ২৯ মে ২০১৯ দ্বিতীয় মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের যোগদান ও ২২ নভেম্বর ২০১৯ সালে ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলির আমন্ত্রণে ইডেন গার্ডেনে বাংলাদেশ ও ভারতের দিবা-রাত্রির টেস্ট ম্যাচ উদ্বোধন করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কলকাতা সফর, সবই ছিল রাজনৈতিক-কুটনৈতিক নিয়মনীতির বাইরে বন্ধুত্বপূর্ণ সফর।
১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল ভারত। এ বছর প্রথম দু-টি দেশ ৬ ডিসেম্বর মৈত্রী দিবস হিসেবে পালন করছে। মৈত্রী দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে ‘লোগো এবং ব্যাকড্রপ’ ডিজাইনিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। এছাড়া ৬ ডিসেম্বর এবং ১৬ ডিসেম্বর যথাক্রমে মৈত্রী দিবস এবং বাংলাদেশের বিজয় দিবসের বিশাল আয়োজন উপলক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করেছে বাংলাদেশ এবং ভারত। ডিসেম্বর মাসটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশ এক সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তি উদ্যাপন করছে। ভারতীয় সেনা ও বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা ১৯৭১ সালে এক সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল, রক্ত দিয়েছিল। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল।
ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ বাংলাদেশ সফরকালে উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছেন ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ব্যবহূত একটি টি-৫৫ ট্যাঙ্ক ও একটি মিগ-২৯ যুদ্ধ বিমান। এই ট্যাঙ্ক ও যুদ্ধবিমান প্রদর্শনীর জন্য সামরিক জাদুঘরে রাখা হবে, যা দেখে দেশের তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা আরো বিশদভাবে জানতে পারবে।
বাংলাদেশ-ভারত দুটি দেশ প্রতিবেশি ও অকৃত্রিম বন্ধু। বাংলাদেশ-ভারত শুধু সীমান্ত সম্পর্কেই আবদ্ধ নয়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দুই দেশের জনগণের রক্তস্রোতই সুসম্পর্কের ভিত্তি রচনা করে। দুই দেশের অভিন্ন মূল্যবোধ, পারস্পরিক আস্হা ও শ্রদ্ধা এবং সমঝোতার ভিত্তিতে রচিত বন্ধুত্ব ও সৌহার্দে্যর সম্পর্ক।পরবর্তী সময়ে জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো সৃদৃঢ় ও গতিশীল হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের বিজয় দিবসের সমাপনী অনুষ্ঠানে ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দর বাংলাদেশ সফর।
লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা