বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আলোচনার বিষয়। কার্বন নিঃসরণের ফলে জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তনের প্রভাব বেড়েই চলেছে। কার্বন নিঃসরণ যত বাড়বে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তত বেশি দৃশ্যমান হবে। কেননা কার্বন নিঃসরণের সঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বরফ গলা, খরা, দাবানল, দূষণ বৃদ্ধিসহ জীবনযাত্রার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটের সম্পর্ক বিদ্যমান। স্বাভাবিকভাবে কার্বন নিঃসরণ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির নির্ভরতা বাড়ানোর কথা ব্যাপকভাবে আলোচনা হচ্ছে। তবে এত কিছু আলোচনা করা হলেও সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ভবিষ্যৎ কর্ণধার শিশুদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মনে হয় কমই গুরুত্ব পাচ্ছে! বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিশুদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন দৃশ্যমান।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহে শিশুর কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়ছে। জলবায়ু উদ্বাস্ত্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের কথা মাথায় রেখে এখন বিশ্বকে পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি জলবায়ু পরিবর্তন ও শিশুদের কথা বিবেচনায় আনা হয় তাহলে উন্নত দেশসমূহের নীতিনির্ধারকদের টেকসহ ও বাস্তবসম্মত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে যে টালবাহানা দেখা যাচ্ছে তা যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে বর্তমান প্রজন্ম তো বটেই, ভবিষ্যত্ প্রজন্মও ভয়াবহ সমস্যার মুখোমুখি হবে। শিশুদের টেকসই ও উন্নত জীবনমান নিশ্চিতকল্পে কাজ করতে হবে এখনই। কার্বন নিঃসরণ কমানো, ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের জন্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক প্রসার, জলবায়ুর পরিবর্তিত পরিস্হিতির সঙ্গে খাপ-খাওয়ানো বা অভিযোজনই পারে জলবায়ু সমস্যার সমাধান করতে। শিশুরা জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তনের ভুক্তভোগী।
জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো না কোনো ভাবে প্রভাব ফেলছে। সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঝড়, বন্যা, খরাসহ জলবায়ুগত বিভিন্ন দুর্যোগের শিকার হয়ে হাজার হাজার পরিবার বাসস্হান পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক পরিবার জলবায়ু উদ্বাস্ত্ত হয়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। ফলে শিশুর লেখাপড়া ও স্বাভাবিক জীবনযাপন জলবায়ুর মতো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। শিশুর পুষ্টি, বাল্যবিবাহ, পাচার, শিশুশ্রম ইত্যাদি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। দরিদ্র শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবজনিত কারণে শিশু বয়স থেকে লেখাপড়া ছেড়ে কাজে নেমে পড়ছে। জলবায়ুগত দুর্যোগের শিকার হয়ে হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। উপকূলের মানুষের আয় কমে যাচ্ছে, কাজ হারাচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় জনপদের শিশুদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জলবায়ুগত দুর্যোগ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে শিশুদের লেখাপড়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উপকূলের জেলাসমূহের (খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী) হাজার হাজার পরিবার জলবায়ু সমস্যার শিকার হয়ে শহরে কিংবা অন্যত্র পাড়ি জমানোর ফলে আরো দরিদ্র হয়ে পড়ছে। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলো শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিটি শিশুর টেকসই ভবিষ্যতের বিষয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। উন্নত দেশসমূহের সৃষ্ট জলবায়ুগত দুর্যোগের কারণে যেন উন্নয়নশীল-স্বল্পোন্নত-দরিদ্র দেশের শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা বিশ্ব-নেতাদের গুরুদায়িত্ব বলে মনে করি। বৈশ্বিক দুর্যোগ জলবায়ুগত সমস্যা বৈশ্বিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে। পাশাপাশি তৈরি করতে হবে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ-খাওয়ানোর মতো সহনীয় প্রযুক্তি ও পরিবেশ। শিশুদের জন্য বসবাসের উপযোগী বিশ্ব গড়তে এবং টেকসই ভবিষ্যত্ নিশ্চিতকল্পে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণের সময় এখনই।