করোনা মহামারি বিশ্বের দেশে দেশে নানা সংকট সৃষ্টি করেছে| বিশেষ করে অর্থনীতিতে স্থবিরতা এনে দিয়েছে| যদিও পরে করোনার প্রকোপ কমে আসায় ধীরে ধীরে সচল হয়ে উঠছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড| ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদনে গতি ফিরে আসায় করোনাকালীন ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সচেষ্ট হয়েছেন সবাই| বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়| ইতিমধ্যে আমাদের অর্থনীতি অনেকটা গতি লাভ করেছে| অনেক সম্ভাবনাময় খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলেও করোনা মহামারি ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে| বাংলাদেশে মেডিক্যাল ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (এমপিপিই) উৎপাদনে নতুন এক উচ্চতায় উপনীত হয়েছে গত দেড় বছর সময়ে| অথচ একসময় এসব সামগ্রী আমাদের দেশে উৎপাদিত হতো না; বিদেশে উৎপাদিত এসব সামগ্রী আমদানির মাধ্যমে এখানকার চাহিদা মেটানো হতো| করোনা মহামারির প্রকোপ শুরু হওয়ায় সারা বিশ্বে করোনা সংক্রমণের বিস্তার রোধে বিশ্বে মেডিক্যাল ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (এমপিপিই) চাহিদা বেড়েছে| তাতে সার্জিক্যাল মাস্ক, মেডিকেল গ্লাভস, পিপিই, ফেস শিল্ড, গাউন, জুতার কাভার, অ্যাপ্রোন, সুরক্ষা চশমা প্রভৃতির বিপুল চাহিদা সৃষ্টি হয়| সেই চাহিদা মেটাতে দেশেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসব সুরক্ষাসামগ্রী উত্পাদন শুরু করে| ফলে দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি শুরু হয়েছে|
কোভিড-১৯-এর প্রভাব থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে ব্যবসা খাতকে উত্পাদন ও রপ্তানি আয় বাড়াতে নানা উদ্ভাবনী ও টেকসই উপায় খুঁজে বের করতে হবে| বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তৈরি পোশাক খাতের ওপর থেকে অতিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা| তবে কোভিড-১৯ সংক্রমণের বিস্তার রোধে সারা বিশ্বে মেডিক্যাল ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (এমপিপিই) চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের জন্য এটি অনেক সম্ভাবনাময়| তাই বাংলাদেশের জন্য রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে এমপিপিই খাতে জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা| এমপিপিই খাতের উন্নয়নে সরকার সব ধরনের সহযোগিতায় বদ্ধপরিকর| কেননা, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের লক্ষ্য অর্জনে এবং শিল্পায়নের বিকাশে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত| এই খাতের উন্নয়নে নীতিসংক্রান্ত সহায়তা প্রদানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে| রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো কৌশল হলো নিজেদের শক্তির জায়গাগুলোতে বেশি গুরুত্বারোপ করা| বাংলাদেশের মতো রপ্তানিমুখী দেশগুলোর জন্য নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে এসব পণ্য| এমপিপিই পণ্য উত্পাদন ও রপ্তানির মাধ্যমে রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনা এবং নতুন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে| বাংলাদেশ যেহেতু তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল, প্লাস্টিক ও ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে আগে থেকেই স্বয়ংসম্পূর্ণ, সে ক্ষেত্রে এমপিপিই উত্পাদনের ক্ষেত্রে অনেকাংশেই এগিয়ে আছি আমরা| সুতরাং রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে এমপিপিই খাতে জোর দেওয়া অবশ্যই বুদ্ধিমানের কাজ হবে| করোনাকালে সারা বিশ্বে মেডিক্যাল ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (এমপিপিই) চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে| তাতে সার্জিক্যাল মাস্কের বাজার বেড়েছে ৫০০ থেকে ১২০০ শতাংশ|
এ ছাড়া মেডিক্যাল গ্লাভস ২০০ থেকে ৬০০ শতাংশ, গাউন ১০০ থেকে ২০০, জুতার কাভার ৫০ থেকে ১০০, অ্যাপ্রোন ৫০ থেকে ১০০ এবং সুরক্ষা চশমার বাজার বেড়েছে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ| সব মিলিয়ে চলতি বছর এমপিপিইর বৈশ্বিক বাজার দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার কোটি ডলার থেকে ৫৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলার| এমপিপিইর বাজারে ছড়ি ঘোরাচ্ছে চীন| দেশটি একাই ১৮ হাজার কোটি ডলারের এমপিপিই রপ্তানি করছে| তার পরের অবস্হানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রপ্তানি করে ৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের মেডিক্যাল ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম| তা ছাড়া জার্মানি ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার এবং ভিয়েতনাম ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের এমপিপিই রপ্তানি করে| বাংলাদেশের ওষুধ খাত স্হানীয় চাহিদার ৯৮ শতাংশ পূরণ করছে| পাশাপাশি ৫৭টি দেশে রপ্তানি করছে| তবে ৯৫ শতাংশ মেডিক্যাল পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি হয়| বাংলাদেশ এরই মধ্যে ১২টি এমপিপিই পণ্য উত্পাদনে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছে, যার মধ্যে ৮টি পণ্য বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্হার (ডব্লিউএইচও) তালিকায় রয়েছে| চলতি বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ ৪৩টি প্রতিষ্ঠান সার্জিক্যাল মাস্কের জন্য, ৫৭টি প্রতিষ্ঠান পিপিই গাউনের জন্য ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিজিডিএ) কাছ থেকে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) লাভ করেছে| এমপিপিই পণ্যের মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে| ফলে এসব পণ্য উত্পাদনে শক্তিশালী কারিগরি দক্ষতা আবশ্যক| বাংলাদেশকে একটি কৌশলগত উপায়ে এমপিপিই খাত সম্প্রসারণ করতে হবে|