বদলে গেছে বাঙালির আতিথেয়তা!

ছোটবেলায় ঈদের দিন মানুষের বাসায় বাসায় যাওয়াটা ছিল খুব রোমাঞ্চের বিষয়। শুধু ঈদ পরবি আদায় করা নয়, সঙ্গে ভালো-মন্দ খাওয়ার লোভটাও জুড়ে থাকত এর সঙ্গে। কিংবা শবেবরাতে ট্রে হাতে প্লেটে প্লেটে রুটি হালুয়া নিয়ে আত্মীয়স্বজন পাড়া-প্রতিবেশীর বাসায় বাসায় ছোটার কী যে আনন্দ ছিল তা এখনকার বাচ্চারা বুঝতেও পারবে না। যাদের বাসায় যাওয়া হতো তাদের বাসার হালুয়ার স্বাদ নেওয়ার আকর্ষণ ছিল বেশি। নিজেদের বাসাতেও আসত হালুয়া রুটি। সেসব আনন্দের দিন যে কোথায় চলে গেল। এখন ফেসবুকে বসে অন্যের বাড়ির হাঁড়ির খবর নিতে হয়। কারো বাসায় গিয়ে হাঁড়িতে রান্না করা খাবারের স্বাদ নেওয়ার দিন হারিয়েই গেল বুঝি।

শুধু উৎসব কেন, মানুষের বাসায় দাওয়াত খেতে যাওয়াটাই যেন হারিয়ে গেছে বাঙালির জীবন থেকে। আগে তো ঘরে ঘরে টেলিফোন ছিল না। বিকালে, সন্ধ্যায় কারো বাসায় গেলে না খেয়ে ফেরার কোনো চল ছিল না। এখন তো ফোন করে কারো বাসায় যাওয়াই যাবে না। অলিখিত আইন যেন! খুব কাছের কোনো আত্মীয় না হলে কারো বাসায় যাওয়াটাও একেবারে উঠেই গেছে। ‘এসো না আমাদের বাসায় এক দিন’—এ কথা এখন আর কেউ বলবে না। আজকাল ঈদ, পহেলা বৈশাখ, জন্মদিনে ইনবক্স ভর্তি মেসেজ, ফেসবুক ভর্তি ছবি আর শুভেচ্ছা পাওয়া গেলেও দাওয়াত পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। শুধু দাওয়াত পাওয়াই তো নয়, খুব কাছের আত্মীয়র বাড়ি ছাড়া বোধহয় বাসায় যাওয়া-আসাটাকে একটু অদ্ভুত চোখেই দেখা হয় এখন। শুধু সময়ের অভাব নয়, আতিথেয়তার ধরনেই বদল এসেছে বাঙালির! এখন ফোন, ইন্টারনেট আসার কারণে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ সুবিধা বেড়েছে। মেসেঞ্জারে, হোয়াটসঅ্যাপে দেখাও হয়। তাই বাসায় আসার চলটা কমেছে, মিটে গেছে খাওয়ার চলেরও। মানুষের ব্যস্ততাও তো বেড়েছে। সময়ের দাবি তো অস্বীকার করা যাবে না। তবে এটা ঠিক মানুষের যোগাযোগ যত সহজ হয়েছে, মানুষের দূরত্ব ততই বাড়ছে। ‘সে সকল দিন সেও চলে যায়’ বাসায় দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানোর সে কী বিশাল ব্যাপারটাই না ছিল। অর্থের ঘাটতি থাকতে পারে কিন্তু স্বজনকে আপ্যায়নের আয়োজনটা ছিল দেখবার মতো। বাজার থেকে সক্কাল সক্কাল চলে আসত মাছ, মুরগি, মাংস। এরপর বাড়ির মেয়েদের রান্নার ব্যস্ততা। এর মধ্যেই আত্মীয়স্বজনরা চলে এসে হই হট্টগোলে বাড়ির মশগুল আড্ডায় মেতে ওঠা। রান্নাঘরে মেয়েদের, ছেলেদের বৈঠকখানায় আর ছোটদের মাঠে খেলা। কী একটা দিনই না যেত। আর খাবারের আয়োজনে কত কিছুই না থাকত। কে কী খায় আর কে কী খায় না এসব বুঝে করা হতো রান্নার আয়োজন। না বলে কোনো আত্মীয় যদি চলেও আসে তাতে আয়োজনের কমতি হতো না। খাবার সময় এলেও ঘরে যা আছে তা দিয়ে খেতে দিতেও মান যেত না কারো। কিন্তু কী অদ্ভুত, কোনো দিনই ঐ নেমন্তন্ন খাওয়াতে অস্বস্তি লাগত না। আত্মীয়ের বাড়িকে নিজের বাড়ির মতোই লাগত, তখন। দুপুরে কিংবা সন্ধ্যাবেলা কোনো পরিবার বাসায় এলে তাকে চা-বিস্কুট দিয়ে বিদায় করাটা ছিল অভদ্রতা। এখন নিমন্ত্রণের ধরনেও বদল এসেছে। আগেকার সেই ‘সারা দিনের জন্য চলে এসো’ বলার বদলে এখন দাওয়াতটা ‘লাঞ্চের’ নাকি ‘ডিনারের’ তা আগেভাগে ঠিক করে নেওয়াই চল। কারণ, অন্যবেলায় তখন ভিন্ন কাজ রাখা যায়। খাবারের ক্ষেত্রেও বাঙালি খাবারের বদলে কাচ্চি বিরিয়ানি, পোলাও, কোরমা। আর রাতে হলে তো ‘চাইনিজ’ খাবার একেবারে বাধাধরা নিয়মই হয়ে গেছে প্রায়। সেই ভাতের সঙ্গে করলা ভাজি, ছোট মাছের চচ্চড়ি, রুই মাছের ঝোল, খাসি আর গরু ভুনা খাওয়ার দিনগুলো তো হারিয়েই গেল। এরপরে একটু টম্যাটোর টক, দই, মিষ্টি দিয়ে খেয়ে আরামের ঢেঁকুর তোলাই ছিল বাঙালির দাওয়াতে খাওয়ার চল। বাঙালির অতিথি আপ্যায়নেও পরিবর্তন এসেছে। আগে বড় বড় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের আপ্যায়ন করা হতো মাটিতে চাটাই পেতে কলাপাতায়। তারপর এলো মাটির শানকি বা বাসন। এরপর এলো চিনামাটি, কাচ, স্টিলের থালাবাসন। এখন তো ডাইনিং টেবিল না থাকলে কেউ বাসায় অতিথিকে আসতেই বলে না। খাবারের পর দই, মিষ্টি পরিবেশনের চলও কমেছে। বরং পানীয় হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে কোক, পেপসি, মিরিন্ডা। উপমহাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা প্রয়াত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ২০১৬ সালে ঢাকায় এসেছিলেন এক রেস্টুরেন্টের উদ্বোধন করতে। তখন বাাঙলির খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বলেছেন, সংস্কৃতি বলতে আমরা বুঝি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে। আসলে সংস্কৃতি জীবনধারার মধ্যে মিশে রয়েছে। মানুষের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে কত বিচিত্র বিষয় যে থাকে। মানুষের শ্রেণি বিচারও এর মধ্যে থেকে উঠে আসে। বাংলা খাবারের মধ্যেও অনেক বৈচিত্র্য। বাঙালি বলে অহংকার করতে পারি যে, বাঙালির মতো এমন ব্যালান্সড ফুড মনে হয় আর কোনো জাতের নেই। ‘সময় কোথায় সময় নষ্ট করবার’ এখন দাওয়াত মানেই রেস্টুরেন্ট। পরিবারের সঙ্গে কোয়ালিটি টাইম মানেও রেস্টুরেন্ট। তাই বাঙালি তার ড্রয়িং রুমটাকে বানিয়ে ফেলেছে হোটেল আর রেস্টুরেন্টে গিয়ে খোঁজে—কোথায় দেশি, বাঙালি রান্না পাওয়া যায়। এখন ঘরটা হয়ে গেছে রাত কাটানোর ছাদ আর হোটেল রেস্টুরেন্ট পরিণত হয়েছে অবসর কাটানোর উত্তম স্হানে। তবে, এ বদলটা শহর এলাকায় যতটা প্রকট ততটা মফস্সল বা গ্রামে নয়। কেননা, গ্রামে এখনো বাঙালির পুরোনো ঐতিহ্য টিকে রয়েছে। কিন্তু সেখানেও শহুরে হাওয়ায় রেস্টুরেন্ট কালচার শুরু হয়ে গেছে। তাই, সেদিন খুব দূরে নয় যখন গ্রামেও শহুরে অভ্যাস ঢুকে যাবে। মানুষ ডেকে দাওয়াত খাওয়ানোতেও স্হান করে নিয়েছে ক্যাটারার। কী কী খাওয়াতে চাও, মেনু্য বলে দাও চলে আসবে খাবার। কিন্তু এতে রসনার স্বাদ হয়তো কিছুটা মেলে কিন্তু মানুষে মানুষে বন্ধন, একটা জাতির দীর্ঘ সময়ের যে ঐতিহ্য, ট্র্যাডিশন সেটা হারিয়ে যাচ্ছে। এখন এত আয়োজন করে রান্নার মানুষগুলোই তো আর নেই। সেই দাদি-নানিদের যুগ গেছে। এখন ঘরে নারী-পুরুষ দুজনেই কাজে ব্যস্ত। এখন এত ‘সময় কোথায়, সময় নষ্ট করবার’। ‘বিশ্বায়ন’, ‘যুগের হাওয়া’ বলে তাকে যতই উড়িয়ে দিতে চাই না কেন বাঙালি যে যান্ত্রিক হয়ে উঠছে, তার আড্ডাবাজ চরিত্র হারাচ্ছে — সেটা মেনে নিতেই হবে। রেস্টুরেন্ট সংস্কৃতি ইংরেজ ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে আঠারো শতক থেকে বাংলায় প্রথম বারের মতো রেস্টুরেন্ট খোলা হয়। ইংরেজ আমলের অনেক নিষিদ্ধ খাবার এবং পরিবারের ভেতরে অনেক অপ্রচলিত খাবারই তরুণেরা রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেতেন।

১৮৪০ এর দশকে রাজনারায়ণ বসু গরুর মাংসের কাবাব এবং মাইকেল মধুসূদন দত্ত মাংস, প্যাটিস আর বিস্কিট কিনে খাবার কথা তাদের নিজেদের লেখার ভেতরেই উল্লেখ করেছেন। এভাবেই বাঙালি সমাজে একটা রেস্টুরেন্ট কালচারের সূচনা হয়ে যায়। প্রথম দিকে এসব রেস্টুরেন্টে ইংরেজ বাবুর্চিরা হেঁশেল সামলালেও, পরে মুসলিম বাবুর্চিরা যুক্ত হন। এদের মধ্যেই কেউ কেউ যখন নিজেদের রেস্টুরেন্ট খোলেন তখন সেখানে ইংরেজ খাবারের বদলে মোগলাই খাবার চালু করেন। তবে দেশ বিভাগের আগে কলকাতায় এবং পরে বাংলার অন্যত্র চীনা রেস্টুরেন্ট চালু হয়েছিল। এসব চীনা রেস্টুরেন্টের খাবারের স্বাদ চীনা হোক বা না হোক, বিভিন্ন উপলক্ষ্যে সেখানে খেতে বা খাওয়াতে পারাটা এক রকম গর্বের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল বাঙালিদের কাছে। এসব চাইনিজ রেস্টুরেন্টকে কেন্দ্র করেই চীনা ও থাই খাবার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বাঙালিদের মধ্যে। এছাড়া দক্ষিণ চীনা ও ম্যাকাও রন্ধনশৈলী যেমন বেকিং, গ্রিলিং ও রোস্টিংও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বাঙালিদের মধ্যে।