সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও বাংলাদেশকে সুখী-সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলা যায়নি। বরং দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে শ্রমবাজার কেন্দ্রিক অসমতা যেন একটি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে অসমতা ও অন্যায় বেড়েই চলেছে। আমাদের দেশের শ্রমবাজার অনেক সস্তা তবে শ্রমিক আন্দোলন অনেক দুর্বল। শিক্ষায় ব্যক্তিগতকরণের ফলে শিক্ষার মান কমে গেছে।
রবিবার (১৯ ডিসেম্বর) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনের সেমিনার কক্ষে ‘৫০ বছরে বাংলাদেশ: আকাঙ্ক্ষা, অর্জন ও প্রতিবন্ধকতা’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের প্রথম দিনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরে অর্জনের পাশাপাশি ভূমি এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার অসম চিত্র তুলে ধরেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে।
এদিন সকাল সাড়ে নয়টার সম্মেলনের উদ্বোধন করা হয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল বায়েস বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে আমরা সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পারিনি। তবে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন। ঢাকাকে যেন একটা উপাসনালয় বানিয়ে ফেলেছি আমরা। বাংলাদেশ ডিজিটালি উন্নত হয়েছে, কিন্তু এর সাথে ডিজিটাল বৈষম্যও বেড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, দেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে সকল নাগরিকের এটা পর্যালোচনা করা দরকার যে, আমাদের আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা ও অর্জন কতটুকু। পাশাপাশি আমাদের প্রতিবন্ধকতাগুলো কী কী? এটা শুধু অর্থনীতির ক্ষেত্রে নয়, অন্যান্য সবক্ষেত্রে এ পর্যালোচনা জরুরী।
এদিন মোট পাঁচটি অধিবেশনে সামষ্টিক অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি ও প্রবৃদ্ধি, কৃষি, খাদ্য ও বন, বাংলাদেশের অর্থনীতির ৫০ বছর এবং উন্নয়ন ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সম্মেলনে উন্নয়ন ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা নিয়ে আলোচনায় বিশেষ বক্তব্য দেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, দার্শনিক অ্যান্টনিও গ্রামসির মতে, রাজনৈতিক সমাজ রাষ্ট্র ক্ষমতার সাথে যুক্ত থাকে কিন্তু সুশীল সমাজ সরকারি সুবিধার বাইরে থাকবে। সুশীল সমাজের কর্মীদের রাজনৈতিক মূল্যবোধ থাকবে তবে সে কখনো পার্টিজান (দলীয় মদদপুষ্ট) হবেনা।
বাংলাদেশের সুশীল সমাজের বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের সুশীল সমাজ স্থিমিত হয়ে গেছে। সুশীল সমাজের বড় একটা অংশ দমনপীড়নের ভয়ে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পরে সুশীল সমাজের সাথে সরকারের দূরত্ব আরো বেড়ে গেছে। এক্ষেত্রে সুশীল সমাজের বিকল্প হিসেবে দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করছে তরুন সমাজ। কোটা আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে তরুনরাই কার্যকরি ভূমিকা পালন করেছে।
অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক নুরুল হকের সভাপতিত্বে সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে দেন অর্থনীতি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক শওকত আলী। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন অষ্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনিসুজ্জামান চৌধুরী।
এছাড়া সম্মেলনের আলোচনায় অংশ নেন নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক ইসমাঈল হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক শরমিন্দ নীলোর্মি, লেখক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মী মাহা মির্জা, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সভাপতি তাজুল ইসলাম, বাংলাদেশ উন্নয়ন অধ্যয়ন কেন্দ্রের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মিনহাজ মাহমুদ ও বাংলাদেশ পরিবেশবাদী আইনজীবী সমিতির প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান প্রমুখ।