ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণে উদ্যোগ নেই

চট্টগ্রামে অধিকাংশ ভবনই হয়েছে নকশা না মেনে

চট্টগ্রাম নগরীতে শতাধিক ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করলেও তা অপসারণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না| চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) হিসাব অনুযায়ী বন্দরনগরীতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় আড়াই লাখ ভবন রয়েছে যার অধিকাংশ রয়েছে ঝুঁকিতে| সিডিএর অনুমোদন ছাড়া কিংবা অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে অধিকাংশ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে|

এ কারণে ভূমিকম্প, সুনামি, টানা বর্ষণসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে চট্টগ্রামে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় হতে পারে| চান্দগাঁও, গোয়ালপাড়া ও চকবাজারসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এ বছরই হেলে পড়েছে অন্তত ১০টি ভবন| সর্বশেষ গত সোমবার মাঝিরঘাট এলাকায় খালের পাড়ে গড়েওঠা একটি তিনতলা ভবন ও মন্দিরসহ তিনটি ভবন হেলে পড়েছে| এ কারণে আশপাশের ভবনগুলোও ঝুঁকিতে পড়েছে| নগরীর কোর্ট হিলে আইনজীবীদের পাঁচটি ভবন নিয়ে সম্প্রতি জেলা প্রশাসন ও আইনজীবী সমিতির মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে| ভবনগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে তা অপসারণের জন্য সিডিএকে নির্দেশ দিয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়|

সিডিএ সূত্র বলছে, নগরীর ৯০ শতাংশ ভবনই সিডিএ থেকে অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে| এছাড়া নালা বা খাল দখল করেও অনেক প্রভাবশালীরা বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন| ভবন মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে| পর্যাপ্ত জনবল বা আনুষঙ্গিক সুযোগসুবিধা না থাকায় বিশাল নগরীতে প্রতিটি ভবন নির্মাণকাজের ওপর নজরদারি করা যাচ্ছে না| এদিকে, ভবন মালিকদের অভিযোগ, ভবন নির্মাণের সময় সিডিএ কোনো উদ্যোগ নেয় না| পরবর্তী সময়ে কোনো সমস্যা দেখা দিলে পুরো দোষ চাপানো হয় ভবন মালিকের ওপর|

সিডিএর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহিনুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি ভবন ধরে ধরে ব্যবস্থা নিতে গেলে আমাদের ১০০ বছর লেগে যাবে| আমাদের একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়| লোকবল সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে আমাদের| এছাড়া এমন অনেক জায়গা আছে যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে|

এক গবেষণায় দেখা যায়, চট্টগ্রাম নগরীতে ১ লাখ ৪২ হাজার ভবনই ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে| এসব ভবনের মধ্যে ৭৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছোট-বড় বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে| আবাসিক ভবনকে পরিবর্তন করে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও ক্লিনিক নির্মাণ করার ফলে শিক্ষার্থী ও রোগীদের জীবন ঝুঁকিতে রয়েছে| রিখটার স্কেলে ৭.৫ বা তার চেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে চট্টগ্রাম শহরে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে| চট্টগ্রাম বন্দর, শাহ আমানত বিমানবন্দর, ইস্টার্ন রিফাইনারিসহ কর্ণফুলী নদীর পশ্চিম তীরসংলগ্ন অধিকাংশ বৃহদাকার স্থাপনাই বেলে মাটির ওপর নির্মিত| এ কারণে ভূমিকম্পের সময় সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে| কোনো পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে| কর্ণফুলী ও হালদা নদীর ওপর ঝুঁকিপূর্ণ তিনটি সেতু ভেঙে পড়লে নগরীর সঙ্গে বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে|

ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগাং (ইউএসটিসি) এর উপাচার্য প্রফেসর ড. ইঞ্জিনিয়ার মো. জাহাঙ্গীর আলম ইত্তেফাককে বলেন, ঝুঁকিতে থাকা ভবনসমূহের শক্তি বাড়ানোর জন্য নিয়মিত অ্যাসেসমেন্ট করতে হবে| ভবনের নকশা অনুমোদন থেকে নির্মাণকাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত তদারকি করতে হবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে| সাম্প্রতিক সময়ে বিম ছাড়া কলাম ও স্লাব বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে| নিচের তলাগুলোতে বাণিজ্যিক ও ওপরের দিকে আবাসিক সুবিধা রেখে নির্মিত ভবনগুলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ| বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড-১৯৯৩ অনুসরণ করে ভবন নির্মাণের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ভূমিকম্প প্রতিরোধী নিয়মাবলী প্রয়োগ করলে ভবন নির্মাণ খরচ মাত্র দুই থেকে তিন শতাংশ বৃদ্ধি পায়|