নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে প্রতিষ্ঠার দশ বছরে পদার্পণ করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ। দশক পূর্তির মাইলফলক স্পর্শ করে জাবির সাংবাদিকতা বিভাগ প্রমাণ করেছে দশ বছরে দশ দিকে ছড়িয়ে পড়ার সফলতা। শুধু তাই নয় এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকতা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সফলতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন অনবরত।
সাংবাদিকতা একটি মহৎ পেশা। বিভিন্ন ঘটনাবলী, বিষয়, ধারণা, মানুষ, প্রকৃতি, পরিবেশ, সমাজ, রাষ্ট্র সম্পর্কিত প্রতিবেদন তৈরি ও সাধারণ জনগণের মাঝে তা উপস্থাপন করাই এই পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাজ। যারা এ কাজ করেন, তাদেরকে বলা হয় সাংবাদিক।
আদর্শ সাংবাদিক ও বস্তনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রচার ও প্রসার বাড়াতে ২০১১ সালে যাত্রা শুরু করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ। বিভাগটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের অন্তর্ভুক্ত। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির নতুন কলা ভবনের চতুর্থ তলায় সাংবাদিকতা বিভাগের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে বিভাগের ছিল না কোন প্রাতিষ্ঠানিক চিত্র। নতুন কলা ভবনের নিচতলায় দর্শন বিভাগের ছোট্ট একটা করিডোরে ক্লাস করতো বিভাগের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। কখনো বা ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের ভাষা শিক্ষা কেন্দ্রে চলেছে একাডেমিক কার্যক্রম। বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক অসিত বরণ পাল। এই বিভাগটি যখন যাত্রা শুরু করে তখন দেশে মাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগ চালু ছিল। দেশের মানুষকে সাংবাদিকতা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব অনুধাবন করাতেই অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জাবিতেও এর কার্যক্রম শুরু করা হয়।
২০১১ সালে ৪ জন শিক্ষক, ৪ জন কর্মচারী ও সীমিত সংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ। ছিল না ক্লাসরুম, ছিল না ল্যাব। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আজ এটি একটি আধুনিক বিভাগে রুপান্তরিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষম প্রচেষ্টায় পরিপূর্ণ বিভাগের স্বীকৃতি পেয়েছে এটি।
এখন নতুন নতুন মাল্টিমিডিয়া ভিত্তিক ক্লাসরুম, ল্যাব, সেমিনার, ক্লাব সব যেন বিভাগের উন্নয়নের মাত্রাকেই ইঙ্গিত করছে। সাংবাদিকতার একাডেমিক শিক্ষায় এ যেন নতুন মাত্রা বয়ে এনেছে। সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন এই নামটির যৌক্তিকতা রক্ষা ও বজায় রেখেই সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিষয়ে সমান্তরালে পাঠদান করানো হয়। সমসাময়িক চাহিদা ও উপযোগের কথা মাথায় রেখেই বিভাগের কোর্স গুলো সাজানো হয়েছে। যেন শিক্ষার্থীরা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে এবং শিখতে পারে।
বর্তমানে বিভাগের শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে গড়ে তুলতে বিভাগে রয়েছেন ১৫ জন শিক্ষক, যাদের সাংবাদিকতা ও সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার রয়েছে অভিজ্ঞতা। দেশ ও দেশের বাইরে উচ্চতর ডিগ্রির পাশাপাশি তাদের রয়েছে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা।
শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দক্ষতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন বিভাগের শিক্ষকরা। বর্তমানে এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা কৃতিত্বের সাথে অ্যাকাডেমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও পত্রিকায় সম্মান ও গৌরবের সাথে সাংবাদিকতা করে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, একাডেমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে শিক্ষকতা পেশায়ও নিয়োজিত হচ্ছে।
বিভাগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতিবারের ন্যায় এবারও নতুন রূপে সেজেছে বিভাগটি। বাহারি দেয়ালচিত্রের পাশাপাশি রংবেরঙের বেলুন ও ফুলে সাজিয়ে তুলেছে বিভাগের শিক্ষার্থীরা। সাদা রঙের টিশার্ট পরে শোভাযাত্রা করেছে শিক্ষার্থীরা। ব্যান্ডপার্টির উলুধ্বনিতে শিক্ষার্থীরা মেতে ওঠে এক অপার আনন্দোৎসবে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নতুন করে জেগে ওঠার উদ্দিপনা শক্তিও পেয়েছে। এ দিন সাংবাদিকতা বিষয়ক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এতে উপস্থিত হন দেশ বরেণ্য সাংবাদিক জনাব আবেদ খান ও সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নী। যেখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয়ে জানার সুযোগ পেয়েছে।
ক্যারিয়ার: সময়ের সাথে সাথে গণমাধ্যমেও এসেছে নতুন ধারা। এখন শুধু গণমাধ্যম বলতে সংবাদপত্রকেই বোঝায় না। যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাংবাদিকতাও আধুনিক হয়েছে। নতুন নতুন টেলিভিশন, সংবাদপত্র, নিউজ পোর্টাল সাংবাদিকতা খাতকে করেছে আরো সমৃদ্ধ। গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। তবে গণমাধ্যমের সুষ্ঠু ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল। যে জনবল সৃষ্টিতে সাংবাদিকতা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। এজন্য সাংবাদিকতায় পড়াশোনা করলে দক্ষ গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে গড়ে ওঠা ও সাংবাদিকতা পেশায় অন্তর্ভুক্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
কাজের সুযোগ: বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতা পেশা একটি সম্ভবনাময় ক্ষেত্র। অসংখ্য তরুণ এখন এই পেশার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এর ফলে সাংবাদিকতা শিক্ষার প্রয়োজন ও চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এজন্য বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যে সাংবাদিকতা পাঠ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সাংবাদিকতায় পড়াশোনা করে এখন শিক্ষার্থীরা শুধু সাংবাদিকতাই করবে তা নয়, গণসংযোগ, বিজ্ঞাপন এজেন্সি, ফিল্ম মেকিং, ব্যাংকিং ও শিক্ষকতার মতো বিভিন্ন পেশায় ক্যারিয়ার গড়ারও সুযোগ পাচ্ছে। সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করার পাশাপাশি ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা ও ফিচার সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করার সুযোগ পায়। বর্তমান এই কর্পোরেট দুনিয়ায় সাংবাদিকতার রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। বর্তমানে সাংবাদিকতা বিষয়ের উপর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করারও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
লেখক: শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়