বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাস এবং দৈনিক ইত্তেফাকের পথচলা একই সূত্রে গাঁথা; একই সুর, অভিন্ন আবেদন। ইত্তেফাক একটি আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ হলো ঐক্য বা একত্রে বা মিলেমিশে কাজ করা। কালের আবহে বারবারই প্রমাণিত হয়েছে নামকরণের যথার্থতা। জনগণের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে বস্ত্তনিষ্ঠ, সত্য, ন্যায় ও সুন্দরের প্রকাশে দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সেই সৃষ্টি লগ্ন থেকে। কঠিনতম সময়কে জয় করে, শত কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে অসংখ্য চড়াই-উতরাই শেষে এখনো সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আজকের দৈনিক ইত্তেফাক।
পাকিস্তানের ২৪ বছরের ইতিহাসে শাসন-শোষণ-নিপীড়ন-নির্যাতন অসহ্য অসহনীয় হয়ে উঠলে ফুঁসে ওঠে বাঙালি। তখন অস্ত্রের মুখে স্বাধিকারের ডাকে প্রকম্পিত করে তোলে আকাশ-বাতাস। আর সেই রণধ্বনির প্রকম্পনকে স্ফুলিঙ্গের মতো প্রজ্বলিত করেছিল দৈনিক ইত্তেফাক। পাকিস্তানি শাসনামলে সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের সাথী ছিল ইত্তেফাক। জনমত সৃষ্টিতে এবং আন্দোলন-সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জোগাতে ইত্তেফাকের ভূমিকা ছিল বলিষ্ঠ। দেশের বাইরে ও পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন-সংগ্রামে ইত্তেফাক জুগিয়েছে অকুণ্ঠ সমর্থন। বস্ত্ততপক্ষে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তি আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের বিকাশে দৈনিক ইত্তেফাকের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
পঞ্চাশের দশকের প্রথমার্ধে, ১৯৫৩ সালে ইত্তেফাক পত্রিকার প্রকাশনা শুরু হয়, প্রথমে সাপ্তাহিক হিসেবে, পরে দৈনিক পত্রিকা হিসেবে। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও ইয়ার মোহাম্মদ খানের চেষ্টায় ও তত্ত্বাবধানে যাত্রা শুরু হয়েছিল ইত্তেফাকের। এর অল্প কিছু দিন পরেই সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া; তার গতিশীল নেতৃত্বে বাড়তে থাকে ইত্তেফাকের প্রচার-প্রসর। ১৯৬৬ সালের ৬ নভেম্বর যখন ৬ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি করা হয় তখন দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক মর্নিং নিউজ ও দৈনিক আজাদ ৬ দফার বিরোধিতা করে। কিন্তু ৬ দফার পক্ষে অবস্হান নেন দৈনিক ইত্তেফাক। শুধু তা-ই নয়, অন্যতম প্রচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ফলে ১৯৬৬ সালের ১৭ জুন ইত্তেফাক পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। গ্রেফতার করা হয় সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকেও। সে সময়ে তত্কালীন পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আপস করলে হয়তো মানিক মিয়া ইত্তেফাক প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন নীতির কাছে অনড়। গ্রেফতার হওয়ার প্রায় ১০ মাস পর ১৯৬৭ সালের ২৯ মার্চ মানিক মিয়া মুক্তি পান। মুক্তি লাভের পর তাকে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে দৈনিক ইত্তেফাক প্রকাশ করার জন্য ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সাফ জানিয়ে দেন, ইত্তেফাক যদি তার ঐতিহ্য অনুসরণ করে প্রকাশিত না হতে পারে, তাহলে তিনি সেই পত্রিকা প্রকাশে আগ্রহী নন। এভাবেই দৈনিক ইত্তেফাক দেশের সংকটময় মুহূর্তে অকুতোভয় দুঃসাহসী সৈনিকের কাজ করে গেছে।
শুরু থেকেই দৈনিক ইত্তেফাকের চলার পথ মোটেই মসৃণ ছিল না। বস্ত্তনিষ্ঠ ও মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা বলতে গিয়ে মাঝেমধ্যে বড় বড় ধাক্কা খেতে হয়েছে। স্বাধীন ও অবাধ সাংবাদিকতা রুখতে তত্কালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জারি করে সামরিক আইন। সরকার আপত্তিকর সংবাদ পরিবেশনের দায়ে ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান করে। কিন্তু দৈনিক ইত্তেফাক তোয়াক্কা করেনি কোনো বাধা নিষেধ। সামরিক আইনের বিধান অগ্রাহ্য করেই সেই সময়কার অসহযোগ আন্দোলনের খবর নিয়মিতভাবে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে। শাসকগোষ্ঠী কোনোভাবেই ইত্তেফাককে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পেরে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে দৈনিক ইত্তেফাক ভবন পুড়িয়ে দেয়। তবুও দৈনিক ইত্তেফাক তাদের কাছে মাথা নোয়ায়নি। বাংলার মানুষের মুক্তির প্রশ্নে, স্বাধীনতার প্রশ্নে দৈনিক ইত্তেফাক ছিল আপসহীন। নিজের অস্তিত্ব বিলীনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি নিরবচ্ছিন্নভাবে সব সময় সমর্থন জুগিয়ে গেছে বরাবরই মতোই। তারই পথ ধরে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভু্যদয় ঘটে। এই উপমহাদেশের সংবাদপত্র জগতে ইত্তেফাক এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বস্ত্তনিষ্ঠ, সত্য সংবাদ প্রচারে তারা শীর্ষে।
ইত্তেফাক বাংলার কথা বলে, বাংলার মানুষের কথা বলে। বাংলার অবারিত মাঠ-ঘাট, শস্য শ্যামল ফসলের মাঠ কিংবা শহুরে নাগরিক জীবনের বাস্তবতা সুচারু রূপে ফুটে উঠে ইত্তেফাকে; স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের উন্নয়নের কথা উঠে আসে ইত্তেফাকে। তাই ইত্তেফাকের স্হান ১৮ কোটি বাঙালির হৃদয়ে। ইত্তেফাক এখনো এই নীতি ধরে রেখেছে। ইত্তেফাক কখনো বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বা কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে সংবাদ পরিবেশন করেনি; ইত্তেফাক কখনো রাগ-বিদ্বেষ চরিতার্থ করার জন্য সংবাদ পরিবেশন করে না। বাংলাদেশের মানুষের স্বাধিকার আন্দোলনের জন্য ইত্তেফাক সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ইত্তেফাক মানুষের কাছে সত্য নিয়ে হাজির হয়েছে। বিভিন্ন গোষ্ঠী অনেকবার ইত্তেফাকের পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ইত্তেফাকের ন্যায়-নিষ্ঠার কাছে তারা নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। এর একটি বড় কারণ ইত্তেফাক বাঙালির হৃত্স্পন্দন বোঝে। বাঙালি জন্মগতভাবে অসাম্প্রদায়িক। এদেশে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের কোনো জায়গা নেই। আর ইত্তেফাক বাঙালির এই মূল ধারাকেই ধারণ করে আসছে সৃষ্টি কাল থেকে। তাই শত চেষ্টা করেও ইত্তেফাকের উদ্যমকে দাবিয়ে রাখা যায়নি।
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পার হয়েছে। পরিবর্তন এসেছে নানা বিষয়ে। বিবর্তন ঘটছে গণমাধ্যমের ধরনের। বহুমুখী প্রতিযোগিতার সাথে তাল মেলাতে না পরে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক পত্রিকা। কিন্তু প্রতিযোগিতার এই জোয়ারেও দৈনিক ইত্তেফাক খানদানি পত্রিকা হিসেবে এখনো তার নিজেস্ব স্বকীয়তাকে ধরে সুনামের সঙ্গে টিকে আছে। গৌরবের ৬৮ বছর পেরিয়ে ইত্তেফাক পা রেখেছে ৬৯ এর কাতারে। এই শুভক্ষণে প্রত্যাশা থাকবে ইত্তেফাক তার অতীতের ঐতিহ্যকে ধারণ করে আগামীতেও এদেশের জনমানুষের মুক্তি ও কল্যাণে কাজ করে যাবে। আজকের এই দিনে ইত্তেফাকের সব লেখক, পাঠক, সম্পাদক ও প্রকাশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে হৃদয় নিংড়ানো শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
লেখক: শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।