মানুষ ‘আশরাফুল মাখলুকাত’, সৃষ্টির সেরা জীব। আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন স্বাধীন করে, স্বাধীনতা হচ্ছে তার জন্মগত অধিকার। মানুষকে তিনি দিয়েছেন বিশ্বাসের স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা। তবে এই স্বাধীনতার প্রয়োগ হতে হবে মহান রাব্বুল আলামিনের নির্দেশিত পথে। বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রসরমূলক সৎ মুক্তচিন্তাকে ইসলাম সাধুবাদ জানায়। ইসলাম তার সূচনালগ্ন থেকেই সমগ্র বিশ্বজগত্ সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করার জন্য মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ ফরমান—‘(হে রাসুল!) আপনি বলে দিন, আসমান ও যমিনে যা কিছু আছে তা যেন তারা চোখ মেলে দেখে।’ সুরা ইউনুস, আয়াত ১০১
যারা আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করে, গবেষণা করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে ভাবতে চায় না, তার মহাকুদরত সম্পর্কে জানতে চায় না, তাদের তিনি ভর্ত্সনা করেন। আল-কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে—‘আমি জাহান্নামের জন্য বহু জিন ও মানব সৃষ্টি করেছি। তাদের অন্তর আছে (কিন্তু) তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চোখ আছে (অথচ) তা দিয়ে তারা দেখে না।’ সুরা আরাফ, আয়াত ১৭৯
আল্লাহর উপরোক্ত বাণীগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি, আল্লাহ আমাদের যে চিন্তাশক্তি, বোধশক্তি দান করেছেন, তা অলস ফেলে রাখার জন্য নয়। অন্য সৃষ্টিকে তিনি জ্ঞানদান করেননি, কেবল মানুষকেই তিনি জ্ঞান দিয়েছেন ভালো-মন্দ বিবেচনার জন্য। মানুষ জ্ঞান খাটিয়ে, তার মেধাশক্তি কাজে লাগিয়ে পৃথিবীকে আবাদ করবে, সত্য ও ন্যায়ের পথে নিজেকে পরিচালিত করবে, স্রষ্টার পরিচয় লাভ করে তার আনুগত্য করবে—এটাই হচ্ছে তার প্রধান কাজ। আল্লাহ অন্য প্রাণীকুলকে জ্ঞানদান না করার কারণে পরকালে তাদের কঠোর বিচারের সম্মুখীন হতে হবে না। পক্ষান্তরে আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান ও বিবেচনাশক্তি দিয়েছেন বলে তার থেকে হাসরের মাঠে পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেবেন।
ইসলাম বিবেকের সুরক্ষায় অত্যন্ত যত্নশীল। ইসলাম মানবজীবনে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে পাঁচটি বিষয়কে। সেই পাঁচটি বিষয় হচ্ছে—ধর্ম, আত্মা, বিবেক, সম্মান ও সম্পদের সংরক্ষণ। বিবেকের গুরুত্ব এ জন্য যে, বিবেকহারা হলেই মানুষ পশুত্বের কাতারে নেমে যায়।
বিবেকের হেফাজত দুইভাবে হতে পারে। প্রথমত, ইসলাম বিবেককে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি সম্পর্কে গভীর চিন্তাভাবনা করে আল্লাহর ওপর অবিচল আস্হা ও বিশ্বাস স্হাপনে উদ্বুদ্ধ করেছে। দ্বিতীয়ত, অন্ধ অনুকরণ থেকে বিবেককে মুক্ত রাখার নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে মুশরিক ও কাফেরদের তাদের পূর্বপুরুষের অন্ধ অনুকরণের কারণে নিন্দা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যখন তাদের বলা হয়, তোমরা অনুসরণ করো, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন। তখন তারা বলে, বরং আমরা অনুসরণ করব আমাদের পূর্বপুরুষদের, যার ওপর আমরা তাদের পেয়েছি। যদি তাদের পূর্বপুরুষেরা কিছু না বোঝে এবং হেদায়াতপ্রাপ্ত না হয়, তার পরও কি তোমরা তাদের অনুসরণ করবে?’ সুরা বাকারা, আয়াত ১৭০
একদিকে ইসলাম বিবেককে অন্ধ অনুকরণ থেকে মুক্ত রাখার কথা বলেছে, অন্যদিকে বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন করতেও নিষেধ করেছে। আর এটাই বিবেককে কাজে লাগানোর উত্তম পম্হা। মানসিক প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং কল্পনাপ্রসূত মতবাদের অনুকরণ থেকে মানুষ মুক্ত হলেই কেবল তার প্রভুকে চিনতে পারবে এবং ইসলামকে জানতে পারবে। আল্লাহ আমাদের সহিহ্ বুঝ দান করুন। আমিন!
লেখক: এমফিল গবেষক, খতিব, মনিপুর বাইতুল আশ্রাফ (মাইকওয়ালা) জামে মসজিদ, মিরপুর, ঢাকা