আমি গত এক দশক ধরে ইত্তেফাকে লেখালেখির সঙ্গে জড়িত। সম্পাদকীয় ও ধর্মীয় পাতায় সময় ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু লেখার চেষ্টা করি। তবে ইত্তেফাকের সঙ্গে আমার পরিচয় লেখালেখি দিয়ে নয়, এই পরিচয় শৈশবকাল থেকে পাঠক হিসেবে। বাংলা ও বাঙালির সংগ্রামী ইতিহাসের পরতে পরতে মিশে আছে এই পত্রিকা।
কিংবদন্তি রাজনীতিবিদ ও জাতীয় ব্যক্তিত্ব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে ইত্তেফাকের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বলা যায়, আওয়ামী লীগের মুখপত্র হিসেবে এই পত্রিকার আবির্ভাব। ছাত্রজীবন থেকেই আমি ইত্তেফাকের অনুরক্ত।
পত্রিকাটি এ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করেছে। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ছত্রে ছত্রে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন সংকটে ও সময়ের প্রয়োজনে মানিক ভাইয়ের কথা উল্লেখ করেছেন এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে পরামর্শ, উত্সাহ ও সহযোগিতা নিয়েছেন। ইত্তেফাকও আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও চিন্তাধারাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। এক কথায়, দৈনিক ইত্তেফাককে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের দৈনন্দিন ইতিহাস বললে অত্যুক্তি হবে না। পত্রিকাটি বাঙালির অনেক অর্জনের সঙ্গে বঙ্গীয় সাংবাদিকতায় এনেছে নতুনত্ব ও নান্দনিকতা, যা এখনো বাংলাদেশের সাংবাদিকতার দিশারি হিসেবে কাজ করছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকাগুলোর মধ্যে ইত্তেফাকই প্রথম ‘ধর্মচিন্তা’ নামে একটি সাপ্তাহিক পাতার আয়োজন করে। বাংলার মানুষকে সঠিক ধর্মীয় চিন্তা-চেতনায় জাগ্রত করার সাধনায় এই ধর্মচিন্তা পাতা পাঠকের কাছে অমৃত সুধার মতো। উগ্রতাকে পাশ কাটিয়ে ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের যে ধারা ইত্তেফাকের মাধ্যমে চালু হয়েছে, তা আজ অনেক পত্রিকাকে প্রভাবিত করছে। বলা বাহুল্য, ইত্তেফাকের ধর্মীয় পাতায় যারা লেখালেখি করেছেন, তাদের সবাই এ দেশে প্রখ্যাত ইসলামিক পণ্ডিত ও লেখক হিসেবে সম্মানের অধিকারী হয়েছেন।
আমরা জানি, ইসলামের বিভিন্ন ব্যাখ্যা, মতামত, ফিরকায় ও মতদৈততায় বাঙালি মুসলমানের মধ্যে চিন্তার ভিন্নতা আছে। এর মধ্যে পত্রিকাটি সঠিক ধারায় মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে সবাইকে ইসলামের সঠিক চিত্র তুলে ধরার প্রাণান্তকর চেষ্টা অতীতের ন্যায় এখনো অব্যাহত রেখেছে। পত্রিকাটির ৬৯তম বর্ষেও এর সম্পাদকীয় ও বিভিন্ন লেখনি বাংলাদেশের মানুষকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় যারা শ্রম দিয়েছেনে, তাদের আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। আর যারা এখনো এই যাত্রার অগ্রসেনানী, তথা সাংবাদিকবৃন্দ ও মালিকদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। আমার বিশ্বাস, বাঙালির মননের দৈনিক ইত্তেফাক অবশ্যই শত শত বছর বেঁচে থাকবে।
লেখক: অধ্যাপক, আদ-দাওয়া অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও ইন্টারফেথ বিশেষজ্ঞ