‘ইত্তেফাক প্রগতিশীলদের পত্রিকা’

আমাদের সময়টার শুরুতে তিনটি পত্রিকা বাজারে ছিল। ইত্তেফাক, আজাদ ও সংবাদ। তো ইত্তেফাককে বলা হতো প্রগতিশীলদের পত্রিকা। দাদা ভাইয়ের ‘কচিকাঁচার আসর’ এবং মেয়েদের পাতাটা বেশি জনপ্রিয় ছিল। 

মেয়েদের পাতাটা দেখত কামরুন্নাহার লাইলী। ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরেই আমার লেখা ছড়া ছাপা হতো। আর লাইলীর পাতায় আমার গল্প ছাপা হতো। উপন্যাসও ধারাবাহিকভাবে ছাপা হতো। তাই ইত্তেফাক আমার কাছে আমার সন্তানের মতোই। ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সবার প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন, ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন।

আমি দীর্ঘদিন যাবৎ মঞ্চ, বেতার, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করছি। এখনো টিভি নাটকে নিয়মিত অভিনয় করি। যখন অভিনয় শুরু করি, তখন বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল। প্রতিকূলতার সমস্ত বাধা পেরিয়ে আমি এগিয়ে গিয়েছি। আজকে সমাজে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে নারীদের জন্যে যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তাতে সামান্য হলেও আমার কিছুটা হলেও অবদান আছে। 

দৈনিক ইত্তেফাক। ছবি: আর্কাইভ

নারীমুক্তির পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার চেতনাকে ধারণ করে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় আমি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলাম। ছাত্র জীবনে আমি বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হই। পড়াশুনার পাঠ শেষ করে আমি অভিনয়ের পাশাপাশি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিই। নিভৃতচারী কথাশিল্পী হিসেবেও আমার একটা পরিচিতি আছে। রাষ্ট্র আমাকে একুশে পদক ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত করেছে। তবে আমার জীবনের বড় প্রাপ্তি সব বয়সি দর্শকের ভালোবাসা।

আমি নোয়াখালীর সন্তান। রক্ষণশীল পরিবারে আমার জন্ম। এমন একটি পরিবারে সেই সময়ে জন্ম নিয়ে অনেক যুদ্ধ করে আমাকে অভিনয় করতে হয়েছে। শিক্ষকতার পাশাপাশি আমাকে অভিনয় করতে হয়েছে। দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছি আমি সবসময়। এই ভালোবাসা নিয়েই আমি অভিনয়ের পথে এগিয়ে চলেছি। ১৯৯২ সালে আমি একুশে পদকে ভূষিত হই মুরাদ পারভেজ পরিচালিত ‘চন্দ্রগ্রহণ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য। ১৯৪৩ সালের ১৯ জুন আমার জন্ম। আমার লেখা প্রথম ১৯৫৬ সালে ‘ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরের পাতায় ছাপা হয়। সেটি ছিল ছোট্ট একটি আট লাইনের ছড়া। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম ‘দিলারা আহমেদ লিলি’ দেখে তখন আমার বেশ আনন্দ হয়েছিল। সেই থেকে আমার লেখালেখির অভ্যাসও রয়েছে।

১৯৫৭ সালে স্কুলে তিনি প্রথম নাটক করি মঞ্চে। শরত্চন্দ্রের ‘মামলার ফল’। ১৯৬৩ সালে তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ইউনিয়নের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলা একাডেমির উন্মুক্ত মঞ্চে একাঙ্কিকায় অভিনয় করি কাজী দিশু ও সাংবাদিক আ ন ম গোলাম মোস্তফার সঙ্গে। একই বছরে আমি আলাউদ্দীন আল আজাদ রচিত ডাকসুর নাটক ‘মায়াবি প্রহর’-এ অভিনয় করেছিলাম। এতে আমি আব্দুল্লাহ আল মামুনের স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

১৯৬৬ সালে প্রথম নাজমুল আলমের রচনায় ও আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় রেডিওতে প্রথম নাটক করেন। টেলিভিশনে আমি প্রথম নাটক করি ১৯৬৭ সালে খান জয়নুলের লেখা ‘পিনিস’ নাটকে। পরিচালক ছিলেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। হুমায়ূন আহমেদের নির্দেশনায় প্রথম ১৯৮৪ সালে ‘দিনের শেষে’ নাটকে অভিনয় করি। বিপরীতে ছিলেন গোলাম মুস্তাফা। এরপর হুমায়ূন আহমেদের ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘অয়োময়’ নাটকেও অভিনয় করি। আমার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘আগুনের পরশমণি’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘মেঘলা আকাশ’,‘মনপুরা’, ‘চন্দ্রগ্রহণ’, ‘অপেক্ষা’ এবং মুক্তি প্রতীক্ষিত ‘আলতাবানু’ ও ‘পোস্টমাস্টার ৭১’। 

দৈনিক ইত্তেফাক। ছবি: আর্কাইভ

বর্তমান সময়ের নাটকের গল্প এবং নিমা‌র্ণশৈলী নিয়ে আমি সবসময়ই আশাবাদী। তরুণরা এই সময়ে অনেক ভালো নাটক নির্মাণ করছে। অনেক তরুণ নির্মাতার সঙ্গেই আমি কাজ করেছি। তাদের মধ্যে কাজ শেখার আগ্রহ আমি লক্ষ্য করি সবসময়ই। তবে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ যে যিনিই নাটক নির্মাণ করুন না কেন, গল্পের প্রতি মনোযোগী হতে হবে। আমাদের দেশে অনেক প্রতিভাবান নাট্যকার আছেন। তাদেরকে কাজে লাগাতে হবে। নাটক রচনার ক্ষেত্রে নাট্যকারকে সময় দিতে হবে। তাতেই ভালো গল্পের নাটক বেরিয়ে আসবে।

লেখক: অভিনেত্রী

দিলারা জামান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালের ১৯ জুন বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় তার পরিবার চলে আসে বাংলাদেশের যশোর জেলায়। তিনি ইডেন কলেজে লেখাপড়া করেন। নাট্যজগতের এই খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রীর অভিনয় জীবন শুরু হয় ১৯৬৬ সালে ‘ত্রিধরা’ নাটকের মধ্য দিয়ে। পেশা হিসেবে শিক্ষক দিলারা জামান আগুনের পরশমণি, চন্দ্রগ্রহণসহ বেশ কয়েকটি কালজয়ী চলচ্চিত্র ও নাটকে অভিনয় করেছেন।