উন্নয়ন আর সমৃদ্ধির পাল্লায় ২০২১ সাল 

দরজায় কড়া নাড়ছে ২০২২ সাল। ২০২১ সালের একেবারে শেষে এসে পেছনে তাকালে মনে হয় করোনাকালীন প্রতিকূল পরিস্হিতিতে যেটুকু উন্নয়ন বাংলাদেশে হয়েছে, তা আশা জাগানিয়া। নানা কারণে ২০২১ সালটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ বছরে উল্লেখযোগ্য ছিল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, মুক্তিযুদ্ধ ৫০তম বছরে পদার্পণ, বর্তমান সরকারের এক যুগপূর্তি এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ঘোষণা। করোনা মহামারিতে জীবন স্তব্ধকারী ২০২০ সাল থেকে নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০২১ সাল যাত্রা শুরু করেছিল। শিক্ষার কার্যক্রম সীমিত আকারে শুরু, বন্ধ হওয়া ব্যবসায় স্বাস্হ্যবিধি মেনে চালু, মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট দমনে ব্যবস্হা নেওয়া, সরকারি ক্রয় ও সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ এবং করোনার হাত থেকে মানুষকে নিরাপদ রাখার পদক্ষেপ গ্রহণ করে সরকার ২০২১ সালের অর্থনীতিকে গতিশীল করার পরিকল্পনা নিয়েছিল বলা যায়।

করোনায় ধাক্কায় ২০২০ সালে কমে যায় প্রবাসে কর্মী পাঠানো। ২০২১ সালে আগের বছরের তুলনায় কর্মী পাঠানো বেড়েছে। অবশ্য একই সময়ে প্রবাসী আয় কমেছে। এর মধ্যে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাস পুরোপুরি বন্ধ ছিল বিদেশে যাওয়া। ২০২১ সালের শুরু থেকে বাড়তে থাকলেও মাঝে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে এপ্রিল-মে ও জুলাই-আগস্টে কমে যায় প্রবাসে কর্মী যাওয়া। ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে গেছেন ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৮৯৩ জন কর্মী।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, মহামারি করোনার কারণে ২০২০ সালে যে ধাক্কা লেগেছিল রফতানি খাতে, ২০২১ সালে সেই ধাক্কা অনেকটা কেটে গেছে। প্রবাসী আয় কমলেও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আরেক বড় খাত পণ্য রপ্তানি এ বছরে বেড়েছে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বরে) ১ হাজার ৯৭৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা দেশীয় মুদ্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২১৫ কোটি টাকার সমান। রপ্তানি উন্নয়ন বু্যরো (ইপিবি) বলছে, বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ৩ হাজার ৮৭৬ কোটি ডলারের পণ্য। তবে এর মধ্যে শনাক্ত হয়েছে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন, যার নাম ‘অমিক্রন’। এ কারণে সম্প্রতি রপ্তানিকারকেরা কিছুটা শঙ্কায় রয়েছেন। কারণ, ইতিমধ্যে ইউরোপের কয়েকটি দেশে এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে আংশিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যদিও এর কোনো প্রভাব এখন পর্যন্ত রপ্তানি ক্রয়াদেশে পড়েনি।

রপ্তানি উন্নয়ন বু্যরো সম্প্রতি যে তথ্য প্রকাশ করছে তা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২১ সালে তৈরি পোশাক ছাড়াও কৃষি প্রক্রিয়াজাত, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশল পণ্য ও হস্তশিল্প রপ্তানি ২০২০ সালের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ফলে সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি ইতিবাচক।

২০২১ সালের পুরো বছর ব্যাংক এবং শেয়ার বাজার নিয়ে আলোচনা ছিল। দীর্ঘ দিনের মন্দাভাব কাটিয়ে মাঝেমধ্যে চাঙ্গাভাব ফিরলেও পুঁজিবাজার নিয়ে ভয় আবারও ধরতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞসহ অনেক বিনিয়োগকারী। ২০২১ সালে আগের মতোই কারসাজিকারীরা সক্রিয় হয়ে উঠছে বিভিন্ন সময়। নিয়ন্ত্রক সংস্হার নানা কঠোরতার মধ্যেও কারসাজিকারী চক্রটির তত্পরতা ছিল পুরো বছর জুড়ে। আর করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সালে কোনো টাকা পরিশোধ না করলেও সেই গ্রাহককে খেলাপি করতে পারেনি ব্যাংকগুলো। ২০২১ সালে নতুন সুযোগ-সুবিধা দিতে হয়েছে গ্রাহকদের। অন্য দিকে তলবি ঋণ চলতি বছরের মার্চ থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আটটি কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর পরও ২০২১ সালে নতুন করে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১২ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালে ব্যাংকগুলোর আয় বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে মুনাফাও। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন সেই তথ্যই দিচ্ছে। ২০২১ সালে ৩২টি ব্যাংকের মধ্যে ২৬টি ব্যাংক আগের বছরের তুলনায় বেশি মুনাফা করেছে। কেবলমাত্র ছয়টি ব্যাংকের মুনাফায় ভাটা দেখা গেছে। তবে ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, করোনাপরবর্তী ব্যাংকিং খাত বেশ চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে চলছে। সব ধরনের সুদের হারের সীমারেখা বেঁধে দেওয়ার ফলে ভোক্তা-ঋণ ও অন্যান্য রিটেইল ব্যবসায় ব্যাংকগুলো আগ্রহী ছিল না। অবশ্য বিশাল জনগোষ্ঠীকে নানাভাবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে ২০২১ সালে বাংলাদেশের সফলতা ছিল উল্লেখ করার মতো। ব্যাংকিং সেবার পরিধি শহরাঞ্চল ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলসহ প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকাতেও বিস্তৃত হয়েছে। এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আর্থিক সেবা চলে গেছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায়, যা ২০২১ সালে ব্যাপকতা লাভ করেছে।

বছরের শুরুতে সরকারের মেগা প্রকল্প নিয়ে ভয় ছিল। করোনা মহামারির কারণে এগুলোর কাজ কতদূর এগোয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ২০২১ সালে করোনা সংকট কাটিয়ে পুরোদমে বাস্তবায়ন হয়েছে প্রকল্পগুলো। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর কাজ প্রায় শেষ প্রান্েত। বহুল প্রতীক্ষিত মেট্রোরেলের কাজও এগিয়ে চলেছে দ্রুত গতিতে। সরকার আগামী বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেলের উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশের বাণিজ্যিক চলাচল শুরুর পরিকল্পনা করেছে। পুরোদমে চলছে রূপপুর পারমাণবিক বিদু্যত্কেন্দÌ, মাতারবাড়ী প্রকল্পের কাজ। এমন আট মেগা প্রকল্প বিশ্ব কাতারে আরো এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশকে। সবগুলো সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প। রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সার্বক্ষণিক নিজস্ব তদারকি। দেশের উন্নয়নমূলক এসব প্রকল্পের সুফল প্রাপ্তির দ্বারপ্রান্েত বাংলাদেশ। সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে—পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, মেট্রোরেল প্রকল্প, পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্প, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হয়ে ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদু্যত্কেন্দÌ নির্মাণ প্রকল্প, মাতারবাড়ী কয়লা বিদু্যত্কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, কয়লাভিত্তিক রামপাল থার্মাল বিদু্যত্কেন্দÌ নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প ও সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প।

২০২১ সালে কৃষি, শিল্প এবং সেবা খাতের সম্প্রসারণ ঘটেছে। নতুন ভিত্তি বছর অনুযায়ী, জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান হিসাব করার সময় ১৪৪ ধরনের শস্যের তথ্য আমলে নেওয়া হয়েছে, যেটি আগের হিসেবে ১২৪ ছিল। বিবিএসের নথি অনুযায়ী, কৃষি খাতের মোট মূল্য সংযোজন (জিভিএ) বর্তমান মূল্যে বিগত অর্থবছরে ৪ হাজার ৬১ বিলিয়ন টাকা হয়েছে, যেটি আগের হিসাবে ৩ হাজার ৮৪৬ বিলিয়ন টাকা ছিল। শিল্প খাতে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, পল্লি বিদু্যত্ কোম্পানি, খাদ্য সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ, রাজশাহী ওয়াসা ও জাহাজ ভাঙা শিল্পের তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বর্তমান মূল্য বিবেচনায় ২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল্যমান ৩৪ হাজার ৮৪০ বিলিয়ন টাকা। এটি আগের ভিত্তি বছরের হিসাবে পাওয়া ৩০ হাজার ১১১ বিলিয়নের চেয়ে ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। বিবিএস-এর একটি নথি অনুযায়ী, স্হিরমূল্যে নতুন ভিত্তি বছর অনুযায়ী ২০২১ অর্থবছরে অর্থনীতির আকার ২৭ হাজার ৯৩৯ বিলিয়ন টাকা। আগের হিসাবে এই আকার ছিল ১২ হাজার ৭২ বিলিয়ন টাকা।

কনজারভেটিভ থিংক ট্যাংক দ্য হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে ৫৬.৫ স্কোর করে বাংলাদেশের অবস্হান ১২০তম। ভারতের অবস্হান ১২১তম। অন্য দিকে পাকিস্তানের অবস্হান ১৫২তম। করের বোঝা, ব্যবসার স্বাধীনতা ও শ্রম স্বাধীনতায় আগের চেয়ে স্কোর বৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশের। গত বছর বাংলাদেশের অবস্হান এক ধাপ নিচে ছিল। এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এবারের স্কোরে বাংলাদেশ ৪০ দেশের মধ্যে ২৫ নম্বরে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে কেবল ভুটান। দেশটির স্কোর ৫৮.৩ ও অবস্হান ১০৯তম। বাংলাদেশের ওপরে অবস্হান হলেও ভুটানের এ বছর অগ্রগতি কমেছে এবং বাংলাদেশের বেড়েছে। দ্য হেরিটেজ ফাউন্ডেশন জানায়, এ বছরের সূচকে বাংলাদেশ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় সব দেশেরই স্কোর কমেছে।

সর্বশেষ চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। করোনা সত্ত্বেও এ বছর প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। মহামারির মধ্যেও রফতানি আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্হা সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর)-এর একটি প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বিকাশ অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশটি হবে বিশ্বের ২৫তম বৃহত্ অর্থনীতির দেশ। এই রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৩৫ সাল নাগাদ ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্হান বহু ধাপ ওপরে উঠে পৌঁছে যাবে ২৫ নম্বরে। বাংলাদেশ যেহেতু করোনাভাইরাসের মধ্যেও কিছুটা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে, তাই সামনের বছরগুলোতে বাংলাদেশে ধারাবাহিক ও জোরালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আশা করছে সিইবিআর।

লেখক: গবেষক