খুলনা সদর আসনের সাবেক দুই সংসদ সদস্য নিজ দলেই অবহেলিত!

ঘরে-বাইরে বিপুল জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনের সাবেক দুই জন সংসদ সদস্য নিজ দলের মধ্যেই অবহেলিত। একসময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ পদে থাকা এ দুই নেতা নিয়ন্ত্রণ করেছেন খুলনার রাজনীতি। তাদের হাতে গড়ে উঠেছে তৃণমূলের অসংখ্য রাজনৈতিক নেতাকর্মী। 

খুলনার এ দুই রাজনীতিক হলেন বিএনপির সদ্য সাবেক বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও মহানগর সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান। দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে তাদের রয়েছে বিপুল জনপ্রিয়তা। রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরেও এই দুজনের রয়েছে সামাজিক, উন্নয়নমূলক ও ধর্মীয় সংগঠনসমূহের সঙ্গে নিবিড় সম্পৃক্ততা। এ দুই নেতা নিজ দলে অবহেলার শিকার হওয়ায় তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমার্থকদের মধ্যে রয়েছে চাপা ক্ষোভ।

মহানগর বিএনপির সভাপতি পদের পর সর্বশেষ গত ২৫ ডিসেম্বর দুপুরে খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক পদ থেকেও নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। দলটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এর মাধ্যমে দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় পর খুলনা বিএনপি থেকে বাদ পড়লেন মঞ্জু। দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন শেষে তার এমন পরিণতি মানতে পারছেন না বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। খুলনার অন্যান্য রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠনের নেতারাও বিএনপির এই সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

বিএনপির তৃণমূল কর্মীদের মন্তব্য, নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও খুলনা বিএনপি একে অপরের পরিপূরক। তাদের দাবি, তোষামোদকারীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাইকমান্ড। এর মধ্য দিয়ে ব্যক্তির বিরোধিতা করতে গিয়ে খুলনা বিএনপিকেই হুমকির মুখে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

গত ৯ ডিসেম্বর হঠাত্ করে কেন্দ্র থেকে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপির তিন সদস্যের পৃথক দুটি আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে বাদ পড়েন নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও তার অনুসারীরা। দলের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে ১২ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। এটা ভালোভাবে নেয়নি হাইকমান্ড। 

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ ডিসেম্বর তিন দিনের সময় দিয়ে শোকজ করা হয় মঞ্জুকে। ১৬ ডিসেম্বর শোকজের জবাবের সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে মৌখিক শুনানির আবেদন জানান তিনি। কিন্তু তা না করেই গত শনিবার তাকে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৯ সালে ছাত্রদল থেকে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এর পর থেকে গত ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ ৪২ বছর মঞ্জু ছিলেন বিএনপির রাজপথের সৈনিক। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তার ছিল অগ্রণী ভূমিকা। এই দীর্ঘ সময়ে মঞ্জু হয়ে উঠেছিলেন বিএনপির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

গত মাসেও তিনি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং তাকে বিদেশে পাঠিয়ে চিকিত্সার দাবিতে মিছিল করতে গিয়ে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরেও সারা বছর বিভিন্ন সামাজিক কাজে সক্রিয় দেখা যায় তাকে। ফলে অন্যান্য রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, সামাজিক ও সংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কাছেও নজরুল ইসলাম মঞ্জুর গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক। সেই মঞ্জু দল থেকে বাদ পড়ায় অবাক হয়েছেন খুলনার সব শ্রেণির মানুষ।

এদিকে, তিন বছর আগেও মিজানুর রহমান মিজান ছিলেন খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। নগরীর সাত রাস্তা মোড় এলাকায় মিজানের ব্যক্তিগত কার্যালয়। মাত্র কয়েক বছর আগেও ঐ কার্যালয় ও তার আশপাশে নেতাকর্মীদের ভিড় লেগেই থাকত।

তিনি কোনো অনুষ্ঠানে গেলে সঙ্গে থাকতেন অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী। তার কার্যালয় ঘিরে এখন আর সেই ভিড় নেই। কালেভদ্রেও দেখা মেলে না নেতাকর্মীদের। ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে তাকে আর কোনো অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবেও দেখা যায় না। যদিও দীর্ঘ বিরতির পর সম্প্রতি দলীয় ও সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একসময় খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ ছিল মহানগর সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেকের হাতে। ২০০৮ সালে কেসিসির মেয়র নির্বাচি হওয়ার পর তার আধিপত্য আরো বেড়ে যায়। ২০১৩ সালের সিটি নির্বাচনে হেরে যান খালেক। অন্যদিকে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মহানগর সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান।

এরপর মিজানের অনুসারী বৃদ্ধির পাশাপাশি দলের মধ্যে আধিপত্য বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন সংগঠনও নিয়ন্ত্রণে ছিল তার। এরপরই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উঠতে থাকে। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের জবাবদিহির সম্মুখীনও হতে হয় তাকে। 

এ রকম পরিস্হিতিতে ২০১৮ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে উঠে আসে সেখ সালাহউদ্দিন জুয়েলের নাম। ঐ বছরের ২৫ অক্টোবর খুলনায় আসেন সেখ সালাহউদ্দিন। ঐ দিন বর্ধিত সভায় তাকে খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। 

এরপর ২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর খুলনা জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে মহানগর আওয়ামী লীগে তালুকদার আব্দুল খালেককে পুনরায় সভাপতি এবং এম ডি এ বাবুল রানাকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এখান থেকেই রাজনীতিতে পিছিয়ে পড়েন মিজান। সম্মেলনের প্রায় ১৩ মাস পর গত বছরের ৩ জানুয়ারি খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের ৭৪ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির ৫ নম্বরে স্থান হয় তার। যদিও এসব নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ দেখাননি মিজানুর রহমান মিজান।

মিজানুর রহমান মিজান বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পৈতৃক সূত্রেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করি। দল যখন যাকে যেখানে প্রয়োজন দায়িত্ব দিতে পারে। তবে আমি তো আওয়ামী লীগের সঙ্গেই আছি। নেতাকর্মীদের মাঝেই থাকি। বাকিটা জীবন আওয়ামী লীগ আর খুলনাবাসীর সঙ্গেই থাকতে চাই।’