এক লাখ বিশ হাজার টাকা বাকিতে ধর্ষণের রফাদফা 

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নে এক প্রতিবন্ধীর নারীকে ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে ধর্ষককে এক লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানার মাধ্যমে রফাদফা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যেখানে জরিমানার টাকা বাকি রাখা হয়েছে। 

জানা যায়, উপজেলার ৬নং দৌলতপুর ইউনিয়নের কুশলপুর গ্রামের মুরগি খামারী আনোয়ার হোসেন তার খামারের কর্মচারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে গত শনিবার (২৫ ডিসেম্বর) রাত ৯টার দিকে গ্রামের এক অনুষ্ঠানে নিয়ে যান। এরই এক পর্যায়ে আনোয়ার হোসেন কৌশলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে সেখানে রেখে উধাও হন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অনুষ্ঠানে আনোয়ার হোসেনকে না পেয়ে নিজ বাড়ীতে চলে আসেন। নিজ ঘরে ঢুকতেই তার স্ত্রীর সঙ্গে আনোয়ার হোসেনকে অনৈতিক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকা অবস্থায় ধরে ফেলেন। 

এ সময় স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে আসলে আনোয়ার পালিয়ে যান। ওই রাতেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বাড়ী থেকে বের করে দেন। পরদিন সকাল থেকে ওই গৃহবধূ আনোয়ারের বাড়ীর সামনে অবস্থান নেন। বিষয়টি নবনির্বাচিত দৌলতপুর ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামসহ স্থানীয় লোকজন ওই গৃহবধূকে সেখান থেকে সরিয়ে গ্রামের আবু বক্করের বাড়ীতে থাকার ব্যবস্থা করেন।

এদিকে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের শুরু হয় বিভিন্ন ধরনের অপতৎপরতা। ওই গৃহবধূর পিতা ও মাতা মেয়েকে নিজ হেফাজতে নেওয়ার জন্য কুশলপুর গ্রামে গেলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ওই গৃহবধূকে তার পিতা ও মাতার কাছে যেতে না দিয়ে নিজেদের হেফাজতে রেখে দেন। 

অপরদিকে বিষয়টি নিয়ে গত রবিবার (২৬ ডিসেম্বর) রাতে নবনির্বাচিত দৌলতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামের বাড়ীতে বসে রফা বৈঠক। সেখানে চেয়ারম্যানের ভাই মোতালেব হোসেন, রুহুল আমিন, আমিনুল ইসলামসহ গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। শুধু ছিলেন না ওই গৃহবধূর পিতা-মাতা কিংবা তার পরিবারের কোনো লোকজন। দীর্ঘ সময় বৈঠক চলার পর রাত ৩টায় ধর্ষক আনোয়ার হোসেনকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে ঘটনাটি রফা করা হয়। সেই জরিমানার টাকাও আবার বাকিতে। বৈঠক শেষে ওই ভোর রাতেই আবু বক্করের বাড়ী থেকে লাঞ্ছিতা গৃহবধূকে তার প্রতিবন্ধী স্বামীর বাড়ীতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

সরেজমিনে সোমবার সকালে ওই গৃহবধূর বাড়ীতে গিয়ে বাড়ীতে কাউকেই পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শালিস বৈঠকে উপস্থিত থাকা এক ব্যক্তি বলেন, ঘটনাটি এক লাখ ২০ টাকায় আপস করা হয়েছে। তবে ওই টাকার মধ্যে কিছু খরচ হবে বিভিন্ন জনকে মেনেজ করতে।

ঐ গৃহবধূর পিতা বলেন, গত রবিবার (২৬ ডিসেম্বর) পাতিয়ার রহমান ইউপি সদস্যকে নিয়ে থানায় অভিযোগ দিতে যান। কিন্তু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেয়েকে ছাড়া অভিযোগ নেওয়া যাবে না বলে জানান। ফলে বাড়ী ফিরে গেছেন। পরে শুনেছেন ইউপি চেয়ারম্যান তার বাড়ীতে বসে এক লাখ ২০ হাজার টাকায় আপস করে দিয়ে মেয়েকে স্বামীর বাড়ীতে তুলে দিয়েছেন। সেটাও নাকী বাকীতে করা হয়েছে। টাকাটা আমার মেয়ে আদৌ পাবে কীনা সেটি সন্দেহ।
 
অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেনকে তার মুঠোফোন ফোন করা হলে ফোন ধরলেও সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার সাথে সাথে ফোন কেটে দিয়ে ফোনের সুইচ অফ করে দেন। ফলে তার কোনো মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

নবনির্বাচিত দৌলতপুর ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির স্ত্রীর বিষয়টি নিয়ে গত রবিবার (২৬ ডিসেম্বর) রাতে নিজ বাড়ীতে গ্রামের মণ্ডলদের নিয়ে বৈঠক করে এক লাখ ২০ হাজার টাকায় রাত ৩টার দিকে রফা করে দিয়েছেন। ওই রাতে গৃহবধূকে তার বাড়ীতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তারা এখন আগের মতোই ঘর-সংসার করছে। জরিমানার টাকা বুধবার (২৯ ডিসেম্বর) আনোয়ার হোসেন দিয়ে দেবেন। টাকা পেলেই ওই গৃহবধূর হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

ফুলবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আশ্রাফুল ইসলাম বলেন, ওই গৃহবধূর বাবা এসেছিলেন অভিযোগ দিতে। তাকে ওই গৃহবধূকে থানায় নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। গৃহবধূর কাছে শুনে অভিযোগ নেওয়া যেতো। কিন্তু এখন পর্যন্ত আর কেউ আসেনি।