খুলনা অঞ্চলের বন্ধ ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে গত আঠারো মাসে বেতন ও বিদ্যুত্ বিল বাবদ প্রায় ৮২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এছাড়া সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ৯টি পাটকলের প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা মূল্যের ৫ হাজার ৮৩টি তাঁত নষ্ট হতে বসেছে।
এদিকে, খুলনা অঞ্চলের বন্ধ হওয়া ৯টি জুটমিলের মধ্যে ক্রিসেন্ট জুট মিল বেসরকারি খাতে চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাকি আটটি জুট মিল চালুর ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। শ্রমিক নেতৃবৃন্দ বলছেন, যেভাবে সরকার ক্রিসেন্টসহ রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি জুট মিল চালু করতে চাইছেন তা তারা মানবেন না।
ক্রমাগত লোকসানের কারণে ২০২০ সালের ২৫ জুন খুলনা অঞ্চলের ৯টিসহ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর পর ঐ বছরের দুই জুলাই পাটকল বন্ধসহ গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায় শ্রমিকদের অবসায়নের প্রজ্ঞাপন প্রতিটি মিলের নোটিস বোর্ডে টানিয়ে দেওয়া হয়। সেই থেকে গত ১৮ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকল।
বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশন (বিজেএমসি) সূত্র জানায়, বন্ধ হওয়া খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি জুট মিলে বর্তমানে ১ হাজার ৪৩জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে আলীম জুট মিলে ৪৪জন, কার্পেটিং জুট মিলে ৬৬ জন, ক্রিসেন্ট জুট মিলে ১৮৯ জন, দৌলতপুর জুট মিলে ৯৬ জন, ইস্টার্ন জুট মিলে ৮৩ জন, জেজেআই জুট মিলে ১০৭ জন, খালিশপুর জুট মিলে ১৬৮ জন, প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে ১৬৮ জন ও স্টার জুট মিলে ১২২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন।
মিলগুলো বন্ধ হওয়ার পর গত ১৮ মাসে উক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছে ৬৫ কোটি ৮৩ লাখ ৩২ হাজার টাকা। এছাড়া উক্ত সময়ে মিলগুলোর বিদ্যুত্ বিল বাবদ ব্যয় হয়েছে ১৬ কোটি ৮লাখ ৬৬ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে গত ১৮ মাসে সরকারের ৯টি জুট মিলে ব্যয় হয়েছে ৮১ কোটি ৯১ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। এদিকে, খুলনা অঞ্চলের বন্ধ হওয়া ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে ৫ হাজার ৮৩টি তাঁত রয়েছে। তাঁতগুলো প্রতিটিই ব্যবহার উপযোগী। তবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার না হওয়ায় এবং সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তাঁতগুলো নষ্ট হতে বসেছে। বিজেএমসির সূত্রমতে, ৫ হাজার ৮৩টি তাঁতের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহবায়ক ও ক্রিসেন্ট জুট মিলের সাবেক শ্রমিক মুরাদ হোসেন বলেন, শুধু ক্রিসেন্ট জুট মিল নয়, আমরা চাই খুলনা অঞ্চলের ৯টি জুট মিলই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় চালু করা হোক। তিনি বলেন, এখনো অর্ধেক শ্রমিকই তাদের টাকা পায়নি। তারা বর্তমানে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে।প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি শাহানা শারমিন বলেন, মিল বন্ধের আগে বলা হয়েছিল, তিন মাসের মধ্যে মিলগুলো সংস্কার করে পুনরায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় চালু করা হবে। শ্রমিক নেতৃবৃন্দসহ শ্রমিকদের দাবি অতি তাড়াতাড়ি সরকারি ব্যবস্থাপনায় মিলগুলো চালু করা হোক। সরকার যেভাবে পাঁচটি মিল চালু করতে চাইছেন, তা আমরা মানব না।
পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদ খুলনার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই খুদা বলেন, আমরা বরাবরই বলে আসছি, রাষ্ট্রায়ত্ত জুট মিল রাষ্ট্রীয়ভাবেই চালু করতে হবে। ক্রিসেন্ট জুট মিল বেসরকারি খাতে চালু করা হচ্ছে শুধু লোক দেখানোর জন্য। প্রকৃতপক্ষে এটি চালু হবে না।
বিজেএমসির ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক সমন্বয়কারী (লিয়াজোঁ কর্মকর্তা) মো. গোলাম রব্বানী বলেন, ইতিমধ্যে ক্রিসেন্ট জুট মিল বেসরকারি উদ্যোগে চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাকিগুলো কবে নাগাদ চালু হবে তা দেখভাল করছে মন্ত্রণালয়। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে বন্ধ মিলগুলোর ১৪ হাজার ২৭১জন শ্রমিকের বকেয়া পাওনা ৭৩৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমানে ৭১৬ জন শ্রমিকের মাত্র ৩০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। নামের ভুল ও মামলাসংক্রান্ত কারণে এই টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। তবে নামের ভুল সংশোধন ও মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে ৭১৬ জন শ্রমিকের টাকা পরিশোধের চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে বিজেএমসির কোনো গাফিলতি নেই।