নারীর প্রতি শুধু দয়া-দাক্ষিণ্য করে কল্যাণের জায়গায় রাখলে হবে না। তাদের জন্য কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের চিন্তা বাদ দিয়ে অধিকারভিত্তিক সমতা সৃষ্টি করতে হবে। এ বিষয়ে নারীকে সচেতন ও সংগঠিত করার লক্ষ্যে যাত্রা করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।
যেখানেই নারীর অধিকার হরণ হয়েছে, সেখানেই মহিলা পরিষদ সোচ্চার হয়েছে। মাঠে-ময়দানে, রাজপথে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে রোদে পুড়েছেন, বৃষ্টিতে ভিজেছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। স্বাধীনতা আন্দোলনে সংগঠনটি রেখেছে সক্রিয় ভূমিকা। স্বাধীনতার পরে নারীর অধিকার আদায়ে ম্যান্ডেট নিয়ে এগিয়ে চলেছে তার নিজস্ব গতিতে। এরই ধারাবাহিকতায় হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দুই দিনব্যাপী ত্রয়োদশ জাতীয় সম্মেলন। আজ শুরু হবে এই সম্মেলন। এ বছর সম্মেলনের স্লোগান করা হয়েছে ‘পরিবার, সমাজও রাষ্ট্রে নারীর সম-অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে’।
‘১৯৭০ সালের ৪ এপ্রিল মহিলা পরিষদ নারী সমতা আদায়ের দাবি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। খালাম্মা প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কবি সুফিয় কামাল অনুভব করেন—অনেক সংগঠন আছে, অনেক মানুষ আছে, তাদের জন্য কাজও আছে। শুধু নারীর জন্য নারীর অধিকার আদায়ে নারীর আলাদা কোনো সংগঠন নেই। নারীদের একটা সংগঠন করো। ’ এমন করেই শুরুর কথা বলেছেন বর্তমান সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। তখন চারদিকে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বাতাস বইছে। তারই মধ্যে আত্মপ্রকাশ করা মহিলা পরিষদের ম্যান্ডেট ছিল ‘সচেতন হও, নিজের অধিকার বুঝে নাও; সংগঠিত হও, আন্দোলন গড়ে তোলো। ’ ঢাকায় সংগঠন হওয়ার পর নারীর সমান অধিকার, মুক্ত মানুষের সমান অধিকার গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুফিয়া কামাল আর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মালেকা বেগম চট্টগ্রামে চলে যান চট্টগ্রামে স্থানীয় মহিলা পরিষদ সংগঠিত করতে। এভাবে নারীসমাজের প্রতি এই অধিকার আদায়ে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে মহিলা পরিষদ। বর্তমানে সংগঠন বিস্তৃতি লাভ করেছে ৫৯টি জেলায়। রয়েছে ২ হাজার ৩২৫টি তৃণমূল শাখা। স্বেচ্ছাসেবী সদস্যের সংখ্যা দেড় লাখ। এ প্রসঙ্গে মালেকা বেগম বলেন, ‘১৯৯৪ সাল পর্যন্ত আমি সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। তারপর ভাইস প্রেসিডেন্ট হলাম। আমরা যে প্রত্যাশা নিয়ে শুরু করেছিলাম, সেই প্রত্যাশা ক্রমেই পূরণ হচ্ছে। সব তো এক দিনে পূরণ হয়ে যাবে না। তবে সেই পথ ধরেই আমরা এগিয়ে চলেছি। স্বাধীনতাযুদ্ধে আমরা সংগঠিতভাবে কাজ করতে পারিনি। তবে স্বতন্ত্রভাবে সবাই কাজ করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাই। তখন শুরু হয় আমাদের বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের পুনর্বাসনের কাজ। এই দীর্ঘ ৫১ বছরে আমাদের অর্জনও কম নয়। আজ সব ক্ষেত্রে বাবার নামের পাশে মায়ের নাম লেখা হয়। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে বিবাহিত শিক্ষার্থীর সিট বাতিলের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছাত্রী অংশগ্রহণ—সবই নারী আন্দোলনের ফসল। ’
‘বর্তমান সমাজের সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান। নারী নিজস্ব যোগ্যতা দিয়ে সমাজে স্থান করে নেওয়ার পথে এগিয়ে এসেছে। নানা প্রতিকূলতা, চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে চলছে নারীর অগ্রযাত্রা। তার এই সম্ভাবনাময় পথ সুসংহত করতে আজকের নারী আন্দোলন ভূমিকা রাখছে। ’ এমনটি বলেন দেশের জাতীয় দৈনিকের প্রথম নারী সম্পাদক তাসমিমা হোসেন। তিনি বলেন, ‘দেড়-দুই শ বছর আগে থেকে নারীর মধ্যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনের তাগিদে নারী আন্দোলনের রূপ বদল হয়েছে। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, কবি সুফিয়া কামাল, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, ইলা মিত্র, লিলা নাগ—এঁরা সবাই ব্রিটিশ আন্দেলনে, স্বাধীনতা আন্দোলনে ধারাবাহিকভাবে ভূমিকা রেখেছেন। আন্দোলন চলছে, আমি আমার পরিবারের অনেককে দেখেছি, যারা নারী ক্ষমতায়নে ভূমিকা রেখেছেন। তবে সবাই রাস্তায় এসে আন্দোলন করেননি। আমি একজন সাধারণ নারী থেকে পাক্ষিক অনন্যা, নারীর জন্য একটি প্ল্যাটফরম করেছি। প্রতি বছর সমাজে ভূমিকা রাখার জন্য ১০ জন নারী সম্মাননা পাচ্ছেন। সরকারিভাবে প্রধানমন্ত্রী নারীর ক্ষমতায়নে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়িয়েছেন। সংসদে নারীর কোটা বাড়িয়েছেন, মন্ত্রী করেছেন। আন্তর্জাতিকভাবেও বেইজিং প্ল্যাটফরম হয়েছে। বিশ্বনেতার কাতারে ক্ষমতাধর নারীর নাম যুক্ত হয়েছে। সব দিক থেকে নারীর গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। গণমাধ্যম তথ্য-উপাত্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। তার পরও কষ্ট হালো, পুরুষতান্ত্রিকতা আছে, মৌলবাদী প্রভাব আছে। এত কিছুর মধ্যে দিনের শেষে নারী আজ সম্পদে পরিণত হয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। আর এই অগ্রগতি সঠিক পথে ধাবিত করতে নারী আন্দোলন কাজ করছে। এখন বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন বেড়েছে। ’
মহিলা পরিষদের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে নারীর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ব্যানবেইসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরে ৫০ শতাংশ ছাত্রী, মাধ্যমিক পর্যায়ে তা ৫৩ শতাংশ। কিন্তু আমরা জানি, উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে আসতে আসতে অনেক মেয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। তার মতে, অংশগ্রহণ বাড়লেও অংশীদারিত্ব পায়নি নারী। নারী আন্দোলনের কাজ সেখানেই। ’ রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে দিনমজুর, শ্রমিক, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর মতো চ্যালেঞ্জিং পেশা, শান্তি মিশন থেকে হিমালয়ের চূড়ায় নারী পদচিহ্ন রাখছেন। বিশ্ব শ্রম সংস্থার মতে, গত কয়েক দশকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে কয়েক গুণ। তবে সব ক্ষেত্রে যোগ্যতা প্রদর্শন এবং স্থান করে নেওয়ার জন্য নারীকে পাহাড় সমান প্রতিবন্ধকতা, চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নিজেকে প্রমাণ করে এগিয়ে আসতে হয়—এভাবেই বলেছেন মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মালেকা বানু।