নতুন বছরে শিক্ষাঙ্গনে তৈরি হোক অনুকূল পরিবেশ

মেরুদণ্ডহীন জাতি অনেকটাই বোঝার মতো। তাই জাতিকে মেরুদণ্ডসম্পন্ন করে তুলতে প্রয়োজনে শিক্ষা। আর এর জন্য দুটি বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। প্রথমত পরিবার, দ্বিতীয়ত শিক্ষাঙ্গন। পরিবার হলো শিশুর প্রাথমিক ও প্রধান শিক্ষালয়। শিশুর মানসিক বিকাশ ও নৈতিক শিক্ষা পরিবারেই ঘটে থাকে। অন্যদিকে তাকে যোগ্য ও দক্ষ মানবসন্তান হিসেবে গড়ে তুলতে এই দুয়ের মিশ্রণ থাকা চাই। দিনের প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা শিক্ষার্থীরা স্কুলেই থাকে। স্কুলের আঙিনায় সঙ্গে পরিচয় ঘটে বিভিন্ন পরিবার থেকে আসা শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ  স্কুল-সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গেই। এই কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বড়দের কাছে যা দেখে, তাই রপ্ত করার চেষ্টা করে। এ কারণে  জাতির উন্নয়নে তাদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনের বিকল্প নেই।

 

শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ
শিক্ষার জন্য সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে, শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ। পারিপার্শ্বিক অবস্থা যেকোনো জিনিসকে সুগঠিত করে দিতে পারে। আবার বিফলও করতে পারে। শিক্ষাকে সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করতে হলে ক্যাম্পাসের পরিবেশের প্রতি প্রথমেই দৃষ্টি রাখতে হবে। শিক্ষাঙ্গন যদি পরিচ্ছন্ন ও শিক্ষার্থীবান্ধব হয় তবে ছাত্র-ছাত্রীরা স্বাভাবিকভাবেই স্কুলের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে। আনন্দহীন শিক্ষা কোনো শিক্ষা নয়। শিক্ষার উপাদান শ্রেণীকক্ষ ও শিক্ষাঙ্গনের প্রতিটি ইটেই বিরাজমান থাকে।  এ কারণে শিক্ষাঙ্গনকে শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত করে তোলা জরুরি। কিছু বিষয় এক্ষেত্রে মাথায় রাখতেই হবে। আনন্দের সঙ্গে মানুষ যা শেখে, তা-ই দীর্ঘস্থায়ী হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের মেধা ও সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানোর জন্য  আনন্দঘন  পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।


সন্ত্রাস মুক্ত ক্যাম্পাস
শিক্ষার্থীরা আগামী দিনে জাতি গড়ার কারিগর। তাই যে করখানায় তারা গড়ে ওঠে, সেগুলো যদি পঙ্কিলতামুক্ত থাকে, তবে তারা যোগ্য হয়ে উঠবে। এ কারণেই শিক্ষাঙ্গনকে হতে হবে সন্ত্রাসমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, ভয়মুক্ত। প্রতিকূল পরিবেশ, নিয়ন্ত্রণ, কঠোর শাসন, শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বাইরে  থাকে, তবে  শিক্ষার্থীদের পরিপূর্ণ বিকাশও সুনিশ্চিত।


ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক
শ্রেণীকক্ষে ছাত্র-শিক্ষক মিথষ্ক্রিয়া শিক্ষার জন্য খুবই জরুরি। শিক্ষকের বক্তব্য ছাত্র-ছাত্রীর আচরণ সৃষ্টি করার পরিপ্রেক্ষিত বা পটভূমি তৈরি করে। তাই সেদিকেও মনোযোগ বাড়াতে হবে। শ্রেণীকক্ষের পাঠদানমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিক্রিয়া বা সাড়া দিতে উদ্বুদ্ধ করেন। এ কারণে শিক্ষার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষককে সচেতন হতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রতি সমান দৃষ্টি রাখার পাশাপাশি পাঠকেও শতভাগ কার্যকর করতে শ্রেণী ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে।


পরীক্ষার প্রস্তুতি
শিক্ষা গ্রহণ ও কাক্ষিত ফল অর্জন  প্রত্যেকের কাম্য। পাঠদানের সঙ্গে পরীক্ষার বিষয়বস্তুর সংযোগ থাকতে হবে। মূল পরীক্ষায় কী ধরনের প্রশ্নপত্র থাকতে পারে,  কিভাবে পড়লে শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করতে পারবে, এ ব্যাপারে শ্রেণীকক্ষেই  ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। 


লাইব্রেরির গুরুত্ব
সিলেবাসভিত্তিক শিক্ষার মধ্যেই  শিক্ষার্থীদের  আবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাদের লাইব্রেরিমুখী করে তুলতে হবে। অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি মেধা বিকাশ ঘটাতে লাইব্রেরি ওয়ার্ক শিক্ষার্থীদের জন্য খুব জরুরি। শিক্ষাকে শুধু সার্টিফিকেটের আওতায় আবদ্ধ রাখা চলবে না। আজকাল শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য অনেকটা খসে পড়ছে। ভালো চাকরি পাওয়া যেন শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে। ফলে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য  ব্যাহত হচ্ছে।  আর শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ছাত্র-শিক্ষক উভয়কে মনোযোগ দিতে হবে। স্কুল-কলেজের চেয়ে লাইব্রেরির গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। তাই শিক্ষার্থীদের জন্য লাইব্রেরি নিশ্চিত করতে হবে। সেমিনার, বক্তৃতা, কবিতা, রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে।


খেলাধূলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
শিক্ষাঙ্গনে খেলাধূলার পর্যাপ্ত পরিবেশ রাখতে হবে। যেন শিক্ষার্থীদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। বিভিন্ন সময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এই ভবিষ্যৎ কর্ণধারদের গড়ে তুলতে এ সব কর্মকাণ্ড বিশেষ গুরুত্ববহ।


লিঙ্গ বৈষম্যদূরীকরণ
শিক্ষাক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।  এদিকেও শিক্ষকদের সচেতন দৃষ্টি রাখতে হবে। ছাত্র- ছাত্রীদের সমান দৃষ্টিতে দেখার শিক্ষা থেকেই শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতি সম্মান দেখানোর শিক্ষা নেবে। নিজের জীবনেও কাজে লাগাবে।


ছাত্রীদের নিরাপত্তা
কন্যা শিশু আজকাল একটা ভীতির নাম। বাড়ির বাইরে সব পরিবেশই তার জন্য অনিরাপদ। মেয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে। এজন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।


সুস্থ রাজনীতির চর্চা
সুস্থ রাজনীতির চর্চা থাকতে হবে। নাহলে সর্বদাই বিশৃঙ্খলা দেখে দেবে। রাজনীতির মুক্ত ক্যম্পাস গড়ার চেয়ে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যেটা প্রয়োজন, সেটা হলো শৃঙ্খলা মেনে চলা। দেশকে এগিয়ে নিতে অবশ্যই  বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে সুস্থ- স্বাভাবিক কল্যাণের পথে হাঁটতে হবে।  


যে কথা বলতে চাই
সামনের দিনগুলো শিক্ষার্থীরা কল্যাণের পথে হাঁটুক। নিজেরদের কাঁধে তুলে নিক দেশমাতৃকার ভার। করোনা মহামারীর কারণে প্রায় ষোল মাস স্কুল কলেজসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। এই সময়ের মধ্যে শিক্ষায় বড় গ্যাপ তৈরি হয়ে গেছে।  যদিও সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে তা পুষিয়ে দিতে চেষ্টা করছে। করোনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী পাঠদান-পরীক্ষা সম্পন্ন করতে পারলে বড় ক্ষতি থেকে শিক্ষার্থীরা রক্ষা পাবে। একদিন তারা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেই।