সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ মেশিনে চলছে পাথর ভাঙা

‘স্টোন ক্রাশারের শব্দে শিক্ষার্থীদের পড়া-লেখায় যেমন সমস্যা হচ্ছে, ঠিক তেমনি ঘুমিয়ে থাকা শিশু ভয় পেয়ে ঘুম থেকে জেগে ওঠে কান্না শুরু করছে। প্রতিবাদ করলে বাড়িতেই থাকা যাবে না, তারা অনেক প্রভাবশালী।’ 

কথাগুলো বলছিলেন সুনামগঞ্জ শহরতলির সুরমা ইউনিয়নের আসকর আলী। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় শতশত ক্রাশার মেশিন চলে পরিবেশ অধিদপ্তর বা জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই। কে কোথায় ক্রাশার মেশিন চালায় প্রশাসন তা জানেও না। কেউ জানায়ও না।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালে সুনামগঞ্জে ১২০টি ক্রাশার মেশিন চলতো, ২০১৯ সালে চলেছে ১৮১টি এবং ২০২১ সালে চলছে ২৩৮টি। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা হাজার ছাড়াবে। যাদের কোনোটির পরিবেশ অধিদপ্তর বা জেলা প্রশাসনের ছাড়পত্র নেই। 

তবে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেছেন, জেলায় ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে স্টোন ক্রাশার মেশিনের সংখ্যা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মল্লিকপুর, অচিন্তপুর, অলির বাজার, মঈনপুর, চলতি নদীর দুই তীরে, তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদী, রক্তি ও বৌলাই নদীর দুই পাড়, লাউড়েরগড় ও আনোয়ারপুর বাজারের পাশে, সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের পাশে সুরমা নদীর তীরে, দুর্লভপুর, উজান লালপুর থেকে চাঁনপুর বাজার পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার জুড়ে চলছে এসব মেশিন। ছাতক উপজেলার শহরতলীর সুরমা নদীর তীর সংলগ্ন এলাকায় গ্রাম, বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে চলছে স্টোন ক্রাশার মেশিন।

ছাতকের নাগপাড়া-বাশপাড়ার রতন দেবনাথ বলেন, বাড়ির পাশে চলে তিনটি স্টোন ক্রাশার মেশিন। মেশিন চললে ঘরবাড়ি কাঁপতে থাকে। খাবারে পাথরের গুঁড়া এসে পড়ে। কাঁলাচান থলায় ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা যায় না ক্রাশারের শব্দে। প্রশাসন এই দিকে নজর দিলে আমরা রক্ষা পেতাম। 

শিক্ষার্থী আব্দল হক বলেন, অবৈধ ক্রাশার মেশিনের কারণে শব্দ দূষণের শিকার হয়ে পড়াশুনায় অমনোযোগী হয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। অতিরিক্ত শব্দের কারণে রাতেও পড়তে বসতে পারছে না তারা। জামালগঞ্জের সাংবাদিক অঞ্জন পুরকায়স্হ বলেন, জামালগঞ্জে ক্রাশার মেশিনের সংখ্যা ১০০টির বেশি। সরকারি হিসেবে কম দেখানো হয়েছে। ক্রাশার মেশিনের সঠিক হিসাব তৈরি এবং সেগুলো যাতে নিয়ম মেনে চলে সে ব্যবস্থা করার জন্য তিনি প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন।

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, স্টোন ক্রাশার মেশিন কেনার জন্য ব্যাংকগুলো ঋণ দিচ্ছে। অর্থাত্ পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হচ্ছে। তবে সবকিছুই আইন অনুযায়ী হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমরা সকলেই আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ করছি। স্টোন ক্রাশার মেশিন বিষয়ে রাজনীতিবিদদেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, স্টোন ক্রাশার মেশিন হঠাত্ করে বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট স্থানে অর্থাত্ একটি জোনেও আনা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে পর্যায়ক্রমে তা করতে হবে। সীমানা প্রাচীর দিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে পাথর ভাঙার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য সবাকে সচেতন করতে হবে। বর্তমানে যে পদ্ধতিতে পাথর ভাঙা হচ্ছে তার প্রতিবাদ করতে হবে। স্বাস্হ্যসম্মতভাবে পাথর ভাঙার জন্য জেলা প্রশাসন সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেবে। পরে মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করা হবে।