ইংরেজ আমলে বিখ্যাত প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী এবং রেজাউল করিমের লেখাগুলো পড়তাম। অসাধারণ পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও ধর্মনিরপেক্ষ ছিল লেখাগুলো। রেজাউল করিম দারাশিকো বইটি লিখে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন আকবরের এক জাতিতত্ত্ব অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমান এক জাতি অবস্থান নয়। আকবরের এক জাতি অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম এক জাতি এই তত্ত্ব বাস্তব। ধর্মের নামে তাকে হত্যা করে ঔরঙ্গজেব শুধু মোগল সাম্রাজ্য ভাঙেননি, ভারতে এক জাতিতত্ত্বের অগ্রগতিও বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি হিন্দু-মুসলমানের ধমীর্য় ভেদ লুপ্ত করে এক জাতি তৈরি করতে চান কীভাবে? তিনি বলেছিলেন, কেন আমার ডাকে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টাননির্বিশেষে সব বাঙালি সাড়া দেয়নি? আমি বলেছিলাম, তখন তারা সাড়া দিয়েছে একটি সংগ্রামের ডাকে। কিন্তু জাতি গঠনের ডাকে তারা সাড়া দেবে কি? বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তিতে বাংলাদেশে বাঙালি নামক এক জাতি গড়ে তুলব।’ বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন সার্থক হয়নি। বর্ণবাদীরা তাকে দারাশিকোর মতো হত্যা করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশেও মুসলমানরা মুসলমানই রয়ে গেছে, হিন্দুরা হিন্দুই রয়ে গেছে, আদিবাসীরা আদিবাসীই রয়ে গেছে। এক বাঙালি জাতি গঠন সম্ভব হয়নি। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ দাঙ্গা অব্যাহত রয়েছে। আওয়ামী লীগ শাসনেও সেই দাঙ্গা মাঝেমধ্যে মাথা চাড়া দেয়। রোগ শঘ্যায় শুয়ে আমার ইচ্ছা হলো, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থান একটু খতিয়ে দেখি। এজন্য ঢাকা শহরের চার জন বিশিষ্ট হিন্দু এবং ব্রাহ্মবাড়িয়া, কক্সবাজার এবং আরো দু-এক জেলার একান্তই সাধারণ হিন্দু ও বৌদ্ধকে বেছে নিয়েছিলাম। ঢাকায় যাদের বেছে নিয়েছিলাম তারা হলেন, এক জন শীর্ষ অভিনেতা এবং বর্তমানে বেতার পরিচালক, একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, এক জন প্রবীণ সাংবাদিক এবং চতুর্থ জন এক জন তরুণ সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। গত মঙ্গলবার এদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি, প্রথমেই প্রবীণ অভিনেতাকে জিজ্ঞেস করলাম আমার প্রশ্নটি, ‘দেশের অবস্থা কী? সংখ্যালঘুদের অবস্থা কী? তিনি প্রথমে মৌনব্রত রইলেন। এর পর বললেন, এসব প্রশ্নের জবাব টেলিফোনে দেওয়া যায় না। কারণ বাংলাদেশে এখন টেলিফোনে আড়িপাতা শুরু হয়েছে। তিনি আমার প্রশ্নগুলো এবং কথাগুলো ধীরভাবে শুনলেন, শেষে বললেন, ‘গাফফার ভাই একটা সত্য হলো এই যে, শেখ হাসিনা ছাড়া আমরা এদেশে থাকতে পারতাম না। তিনি আছেন বলেই আমরা আছি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে একই প্রশ্ন করেছি, একই কথা বলেছি। তিনি অবশ্য এ ব্যাপারে মৌন রইলেন না। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থা খারাপ বলে স্বীকার করলেন না। পৃথিবীর সব দেশেই এখন মৌলবাদ মাথাচাড়া দিয়েছে বলে তিনি দেখালেন। তার তুলনায় বাংলাদেশের হিন্দুরা খারাপ নেই। দীর্ঘ বিবৃতির পর তিনি বললেন, ‘গাফফার ভাই জেনে রাখেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা ক্ষমতায় আছেন বলে আমরা বেঁচে আছি। নইলে এতদিনে আমাদের কল্লা কাটা যেত।’ প্রবীণ সংবাদিককে প্রশ্নগুলো করলাম, তিনি একই জবাব দিলেন।
একমাত্র তরুণ সাংবাদিক ও সাহিত্যিক যার কথায় বুদ্ধির দীপ্তি ছিল, তিনি দেশের অবস্থার একটা বাস্তব চিত্র তুলে ধরলেন। কিন্তু তিনিও শেষ পর্যায়ে বললেন, শেখ হাসিনা ছাড়া সংখ্যালঘুদের বাঁচার পথ নেই।
কক্সবাজারের একজন সাধারণ হিন্দু এবং সাধারণ বৌদ্ধ তাদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরলেন। সরকার তাদের ক্ষতিপূরণ দেন বটে, কিন্তু তারা শারীরিক নির্যাতনের ভীতি থেকে মুক্ত নন। তবে, শেখ হাসিনা যতদিন ক্ষমতায় আছেন, ততদিন তারা দেশত্যাগের কথা ভাবছেন না বলে জানালেন।
একজন বৌদ্ধ তরুণীকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের যুবকেরা বারবার ধর্ষণের চেষ্টা করেছে। তাতেও তিনি দেশ ত্যাগ করবেন না। কারণ মাথার ওপরে শেখ হাসিনা আছেন।
একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, প্রতিষ্ঠিত এবং সাধারণ হিন্দু উভয়েই দেশের অবস্থা সম্পর্কে কথা বলতে নারাজ। টেলিফোনে আড়িপাতা হয়, এই ভয় সর্বত্র বিস্তার লাভ করেছে। আমার মুসলমান বন্ধুরাও দেশের অবস্থা বলতে ভয় পান।
এই ভয় বিএনপি আমলে দেখিনি। অতি সামান্য কয়েকজন হিন্দু এবং বৌদ্ধ নাগরিকের জবানবন্দি নিয়ে আমার ধারণা হয়েছে বাংলাদেশে কোনো স্তরের সংখ্যালঘুর মনেই নিরাপত্তা বোধ নেই। সবাই শেখ হাসিনার ক্ষমতায় থাকার ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে তাদের জন্ম এবং ভিটেমাটি রয়েছে। জন্মগতভাবেই তাদের নাগরিক অধিকার রয়েছে। তারা কেন কেবল একজন নেত্রীর ওপর নির্ভর করে দেশে থাকতে চান? কোনো মুসলমানতো বলবে না শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে আমরা দেশে থাকব না। পার্থক্যটা এখানেই। একজন প্রতিষ্ঠিত হিন্দু এবং সাধারণ হিন্দু উভয়েই মনে করেন শেখ হাসিনাই তাদের শেষ ভরসা। তারা যে জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক এবং তাদের এই অধিকার কেউ কেড়ে নিতে গেলে সংগ্রাম ও আন্দোলন করে সে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে এই বোধ কারো মধ্যে নেই। এটা একটা সাংঘাতিক পরিস্হিতি। এর ফলে সংখ্যালঘুদের মনে স্বাজাত্যবোধ তৈরি হচ্ছে না। শেখ হাসিনার যদি কিছু হয়, তাহলে সক্ষম সংখ্যালঘুরা মনে মনে ভারতে প্রস্থানের জন্য তৈরি আছেন। ভারতের সাম্প্রদায়িক দল বিজেপি ক্ষমতায় থাকায় এবং হিন্দুদের জন্য ভারতে চলে যাওয়াটা উন্মুক্ত করে দেওয়ায় এখন সম্ভবত বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের মনে ভারতনির্ভরতা বেড়েছে। বাংলাদেশের পাবর্ত্য উপজাতিদের কথা এখানে আমি তুলছি না। মনে যদি, স্বাজাত্যবোধ তৈরি করা না যায়, তাহলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
বিএনপি জামাতের আমলে দেশে সংখ্যালঘুরা নির্মমভাবে নিপীড়িত হয়েছেন। নির্বাচন এলেই আওয়ামী সমর্থক আখ্যা দিয়ে হিন্দুদের ওপর নিষ্ঠুর অত্যাচার চলত। পালাক্রমে নারী ধর্ষণ তাদের একটি মহোৎসব ছিল। পূর্ণিমা শীল তার একটিমাত্র প্রমাণ। আগামী নির্বাচনেও সংখ্যালঘুদের নির্যাতিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। ড. বিজয়া চক্রবতীর্ নড়াইলের একজন ডাক্তার। এখন কোথায় আছেন জানি না। তাকে যারা ধর্ষণের চেষ্টা করেছিল তারা সবাই আওয়ামী সমর্থক যুবক। হিন্দু নারী নির্যাতন এবং তাদের সম্পত্তি লুটের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির রেকর্ড প্রায় একই। এই অবস্থার ভালো দিক হলো, সংখ্যালঘুরা সরকারি চাকরিতে ভালো স্থান করে নিয়েছে। সরকারি দফতরে সচিব পদেও অনেক হিন্দু আছেন। পুলিশ বিভাগে প্রচুর সংখ্যালঘুকে স্থান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যা হয়নি তা হলো সংখ্যালঘুদের মনে কোনো পর্যায়েই বাংলাদেশে থাকার স্থায়ী নিরাপত্তা বোধ তৈরি করা যায়নি। এবং নিজেদের ভিটেমাটি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করার আন্দোলন করার স্পৃহা তাদের মনে নেই। অনুরূপভাবে পশ্চিমবঙ্গেও একটি নকল বাঙালি সমাজ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের তাড়া খেয়ে যেসব বিহারি ও জামাতি পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিল তারা সিপিএম সরকারের আমলে রেশন কার্ড পেয়ে পশ্চিমবঙ্গে স্থায়ী হয়ে যায়। সিপিএম তাদের ভোট বাড়াবার কাজে এদের ব্যবহার করেছে। সারা বহরমপুর ও মুর্শিদাবাদ জেলা জুড়ে এদের রাজত্ব। এই বাঙালি জামাতিরা সিপিএম পরবতীর্কালে মমতা ব্যানাজীর্র কৃপায় পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক হয়ে গেছে। শিল্প বাণিজ্যে এরা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের প্রকৃত মুসলমানরা পিছিয়ে আছে। এরা এখন সবাই বাঙালি সেজেছে। কথাবার্তায় এবং আচার-আচরণে এরা একেবারেই বাঙালি। যদিও তারা নকল বাঙালি। এই বাঙালিত্বের জোরে তারা মমতা ব্যানার্জির মন্ত্রিসভায় একসময় ছয়টি আসন দখল করেছিল। কলকাতার মেয়র পদ দখল করেছিল। মমতা ব্যানাজীর্ যখন প্রথম পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন তখন হাসিনাকে দিদি ডেকে তার দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিছু দিনের মধ্যেই তার এই নীতির পরিবর্তন ঘটে এবং তিনি বাংলাদেশবিরোধী নীতি গ্রহণ করেন। তাও এই বিহারি ও তথাকথিত বাঙালিদের চাপে। তিস্তা নদীর জল নিয়ে যে বিরোধ তা নিরসনে ভারতের দুই প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও পরবতীর্কালে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু মমতা ব্যানার্জীর বাধায় এই বিরোধের এখনো সমাধা হয়নি। পেছন থেকে মমতা ব্যানাজীর্কে উস্কানি দিচ্ছে বিহারীরা এবং বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া জামাতিরা।
নেহরু ও ইন্দিরা গণতান্ত্রিক ভারতের জন্য গণতান্ত্রিক জাতীয়তার যে ভিত্তি তৈরি করে গেছেন নরেন্দ্র মোদী সেই ভিত্তিতে প্রচণ্ড আঘাত হানছেন। আমার ধারণা ঔরঙ্গজেবের ধর্মান্ধতা যেমন মোগল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়েছিল তেমনই নরেন্দ্র মোদীর ধর্মান্ধতা গণতান্ত্রিক ভারতের অবস্থান ক্ষুণ্ন করবে। আজ ভারতকে মার্কিন ও ইজরাইলের সঙ্গে হাত মেলাতে হয়েছে। এটা যেমন ভারতের জন্য, তেমনই বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়।
ভারতের মুসলমানদের মনে যেমন দেশপ্রেম জাগ্রত হয়নি, তারা সুযোগ পেলে অনেকেই পাকিস্তানে চলে যেতেন, তেমনই বাংলাদেশে হিন্দুরাও অনেকেই ভারতের দিকে শেষ আশ্রয়ের জন্য চেয়ে আছেন। এটা ভালো নয়। কেবল শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলেই আমরা বাংলাদেশে থাকতে পারব এই মনোভাবটি সংখ্যালঘুদের মন থেকে মুছে ফেলা দরকার। তাদের মনে এই চেতনা জাগ্রত করতে হবে তারা বাঙালি, বাংলাদেশের নাগরিকত্ব তাদের জন্মগত অধিকার। এই অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাদের লড়াই করতে হলে, লড়াই করতে হবে। লড়াই করে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মনে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য রাখতে হবে। ভারতীয় মুসলমানদের বেলাতেও একই অবস্থা। ভারতীয় মুসলামনদের ভারতীয় হিসেবেই তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তা যদি হয়, তাহলে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতীয় জাতীয়তা এবং বাঙালি জাতীয়তা গড়ে তোলা যাবে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের এ কথা ভাবতে হবে না যে, তারা বাংলাদেশে একজন মাত্র নেতার আশ্রয়ে আছে, তাদের এদেশে বসবাসের স্থায়ী অধিকার নেই। এই হলো সংক্ষেপে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সম্পর্কে আমার ধারণা। ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। কেউ ধরিয়ে দিলে বাধিত হবো। ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষ্যে আমি আমার পাঠকদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।
লন্ডন, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২১