বছর কিন্তু আবার ঘুরল। বসন্তের কিংশুকের রঙ পাল্টাতে পাল্টাতে যূথিকার গন্ধ পেরিয়ে কবে পদ্ম ভরা শরৎ এলো, মনখারাপের বিষণ্ণ বিকেল নিয়ে হেমন্ত গেল, শীত এলো। অথচ অবাক করা ব্যাপার, আমরা থমকে রইলাম সেই একই জায়গায়।
ব্যস্ততা নামক দৈত্য আমাদের জীবনকে গ্রাস করল আর রোমান্টিকতাও ধীরে ধীরে বিলীন হলো উচ্চাকাঙ্খার গর্ভে! অন্যের চকচকে জীবনের দিকে আড়চোখে চেয়ে আঙুর ফল টক বলে জিভে-টাগরায় আওয়াজ করে নিজেরটাকে ঘষে মেজে কারিকুরি করে বিক্রির জন্য পসার সাজিয়ে আমরা বসে রইলাম সেই আগের জায়গাতেই।
অথচ সভ্যতাকে থামিয়ে দেওয়া একটা জীবাণু যেদিন আমাদের গৃহবন্দি করেছিল, সেই অভিশপ্ত অন্ধকারে ভয় পেয়ে যে আমরা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, জীবনটাকে বুঝে খরচা করব, নিজের সুখ নয়, অন্যের আনন্দের সন্ধানে যাব। সেই আমরাই ছোট ছোট ব্যাপারে ঝগড়া শুরু করছি। মানুষকে অবিশ্বাস করছি তুচ্ছ কারণে, দু’পয়সা কাউকে না দিয়ে নিজের কাছে লুকিয়ে রাখা যায়, তাই নিয়ে চুলচেরা অঙ্ক কষছি। সন্দেহ করছি, হিংসে করছি আবার, আবারও।
যা কিছু বিদায় দিয়েছি ভেবে মনে মনে শান্তি পেয়েছিলাম, সেই তাকে আবার আহ্বান করে এনেছি অকারণ জমায়েত হওয়া ভিড়ে। সেই ভিড়ে আবার নতুন করে খুঁজতে শুরু করা আমাদের আমিটাকেও হারিয়ে ফেলছি কারণে অকারণে। আমরা মূলত যে যেখানে ছিলাম, সেখানেই ফিরেছি। মুক্তির আশায় যে প্রাণ একদিন আকুলি বিকুলি করেছে, ভেবেছে যেদিন দরজা খুলবে, সেদিন বুঝি অনেক আলো এক ঝলকে মনের ভেতরটাকে ধুইয়ে নিয়ে যাবে, সব খুব সুন্দর হবে, শান্ত হবে। কিন্তু আলোকের সে উৎসার আজও উন্মুক্ত হয়নি। এদিকে বছর তার শেষ দিনগুলো গুনছে এখন।
২০২১-এমন একটা বছর, যা একই সঙ্গে হতাশা আবার আশাবাদেরও। করোনা মহামারির ভয়াবহতা দিয়ে শুরু হয়েছিল বছর। সারা বছরজুড়েই করোনার ভয় থেকেই গিয়েছে। আবার খানিকটা আতঙ্ক কাটিয়েও ওঠা গেছে। আর সেইসঙ্গে এই একটা বছর আমাদের জীবনধারাকে বদলে দিয়েছে অনেকখানি। ব্যক্তিগত পৃথিবীটা এতখানি ছোট হয়ে এসেছে গত ১২ মাসে, যা আগে কখনও ভাবা যায়নি। ২০২১-এর শেষলগ্নে দাঁড়িয়ে পিছু ফিরে দেখলে তাই আজ মনে হয়, সত্যিই ২০২১ আমাদের একই সঙ্গে একটা
ছোট পৃথিবীর ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে, আবার খুলে দিয়েছে অনেকগুলো দরজাও। এমন একটা মিশ্র অনুভবের বছর সচরাচর আসে না।
ঘটনাবহুল বছর যে ক্যালেন্ডারে থাকে না, তা তো নয়। বছর শেষের সালতামামি করতে বসে দেখা যায়, এক একটা বছরের দস্তানায় থাকে ঘটনার ঘনঘটা। তাহলে কোথায় ২০২১ আলাদা? বছরটার শুরু হয়েছিল ভয়-ভয় আবহে। করোনার আতঙ্ক তখন কুরে কুরে খাচ্ছে মানবসভ্যতাকে।
বছরটা যখন শেষ হতে চলেছে, তখন নতুন করে শঙ্কা জাগাচ্ছে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট। করোনাই যে শুধু রূপ বদলেছে তা নয়, বদলে দিয়েছে আমাদেরও। এই বছরের গোড়া থেকেই তো আমাদের জীবনে ‘নিউ নর্মাল’ আর বিচ্ছিন্ন নতুন কোনও শব্দ নয়। বরং তাই-ই হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক। বাড়ি থেকে কাজ করা, বাড়ি বসে পঠনপাঠনের যে অভ্যাস শুরু হয়েছিল তা ক্রমশ সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
অনলাইনে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া, কাজের খাতে বা কাজের বাইরে দুই ক্ষেত্রেই আর বাধ্যবাধকতা শুধু নয়। তা ঢুকে পড়েছে মানুষের দৈনন্দিনে। রুটিন গিয়েছে বদলে। ব্যক্তিগত দেখাসাক্ষাতের পরিধি গিয়েছে ছোট হয়ে। সামগ্রিক এই পরিবর্তনে পৃথিবীটা অনেক একলা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু শুধু কি তাই? বরং এই একলার পৃথিবীই আমাদের এই উপলব্ধিতে টেনে এনেছে যে, আমাদের আরও বেঁধে বেঁধে থাকার প্রয়োজন। এমন এমন বিপর্যয়ের মুখোমুখি আমাদের দাঁড়াতে হচ্ছে, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক বন্ধন অটুট থাকা খুব জরুরি।
২০২১-এ প্রাকৃতিক বিপর্যয় বারবার আমাদের বিধ্বস্ত করেছে। একদিকে করোনা আতঙ্ক, অন্যদিকে এই ধরনের বিপর্যয় আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে একক মানুষ কত সামান্য এবং অসহায়। আত্মকেন্দ্রিকতার দায়ে অভিযুক্ত মানুষ বুঝেছে, নিজের গণ্ডি ভেঙে বেরনো কত জরুরি। আর সেইসঙ্গে এও শিখেছে, প্রকৃতির যত্ন নিতে হবে। যে প্রকৃতি আমাদের লালন করে চলে, প্রগতির দোহাই দিয়ে তাকে যদি ক্রমাগত ধ্বংস করতে থাকি তবে একদিন আমরাই অস্তিত্বের সংকটে পড়ব। নীতিকথার মতো এই সত্যি আমরা বহুবার বলেছি বটে কিন্তু ২০২১ আমাদের সেই সত্যির একেবারে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
ভ্যাকসিনের বরাভয় এসেছে এই ২০২১-এ। বদ্ধজীবন খানিকটা মুক্তির শ্বাস নিতে পেরেছে। তবে এর ভেতর বেশ কিছু বদলও আছে। একটা বড় পরিবর্তন এসেছে খাওয়া-দাওয়ায়। বাহারি লোভনীয় মুখরোচক খাবার থেকে বেশ খানিকটা দূরে সরে গিয়েছে মানুষ। জোর দিয়েছে ঘরোয়া খাবারের ওপর। ঘরোয়া পদ্ধতিতে ঘরোয়া উপকরণে বানানো খাবার কেনার দিকে ঝোঁক বেড়েছে। এই যে পরিবর্তন, তা কি আমাদের আরেকটু ঐতিহ্যের প্রতি সচেতন করে তুলল? সম্ভবত তাই-ই।
এই প্রবণতারই প্রতিফলন দেখা যায়, যখন চোখে পড়ে ছোট ছোট একক উদ্যোগে শুরু হওয়া ব্যবসাগুলির দিকে ক্রমশ নজর দিচ্ছেন ভোক্তারা। নিজের ব্যবহার্য জিনিস কেনাকাটার করতে গিয়ে যদি পাশের আরেকজনের খানিক উপকার হয়, তবে মন্দ কী! এই সেদিনও হয়তো এতটা ভাবনা ছিল না মানুষের। ঝোঁক ছিল বড় বড় ব্র্যান্ডের প্রতি। ২০২১ আমাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই বদলে দিয়েছে।
এক বছরের বিদায়, আরেক বছরের আসার মাঝের সময়টুকুর ফারাক কতটা থাকে, কে বলতে পারে। ব্যবধানের অতি সূক্ষ্ণ সীমারেখার অর্থ একটাই, ফেলে আসা দিনগুলোকে একবার ঘুরে দেখা, মেপে নেওয়া। যদি তাই হয় রাত বারোটার এপার-ওপার হওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণের মাহাত্ম্য, যদি সত্যিই উল্লাসভরা মুহূর্ত গোনার মধ্যে গভীর কিছু থাকে, তাহলে ২০২১ সাল আমাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার কথা স্মরণ করায়।
সে পরীক্ষায় বাইরের দিকে যদিও বা টেনেটুনে পাশ করেছি, অন্তরের পরীক্ষায় তো প্রশ্নপত্রের সঠিক মানেটাও বুঝতে পারিনি। লকডাউনের দিনগুলোতে আমরা যে মানুষের সান্নিধ্য পাবার জন্য আকুল হয়ে উঠতাম, সে মানুষ কিন্তু বিশ্বজোড়া মানুষের বোধের মাঝে থাকে। সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে যতই আমরা আড়ম্বরে মাতি না কেন, তাতে আর যাই হোক, নতুন বছরের আহ্বান না, প্রকৃত দরজাটা খোলে না। গৃহবাসীকে খোল দ্বার খোল বলতে গেলে নিজের মনের বাইরের দোরের আগল সবার আগে খুলতে হয় যে।
তাই নতুন বছরে দরজা খুলুক, চৌকাঠ পেরিয়ে মুক্ত বাতাস আসুক, মেঘ সরিয়ে আলো আসুক, বছর আসুক নতুন করে, তবে পুরনোকে ভুলিয়ে নয় তাকে আরও বেশি করে মনে রেখে।