তিন যুগের ক্যারিয়ারে অসংখ্য জনপ্রিয় গান শ্রোতাদের উপহার দিয়েছেন সংগীতশিল্পী শাহনাজ বেলী। নিজের কণ্ঠ জাদুতে ফোকগানের দ্যুতি ছড়াচ্ছেন দেশ-বিদেশে। জনপ্রিয় এই শিল্পী ক্যারিয়ারের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, ফোকগান ও ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে কথা বললেন ইত্তেফাকের সঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এ এম রুবেল
আপনার নতুন বছরের ব্যস্ততা প্রসঙ্গে জানতে চাই—
করোনার কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আবারো কনসার্ট শুরু হয়েছে। এরইমধ্যে বেশ কয়েকটি কনসার্টে অংশ নিয়েছি, সামনে আরো কিছু শো করব। পাশাপাশি নিয়মিত টেলিভিশন অনুষ্ঠানে গান করছি। এছাড়া রাধারমণ ও শাহ আলমের কিছু গান তৈরি করেছি, যেগুলো আমার ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ পাবে। এর বাইরে নতুন বছরে লালনের গান নিয়ে আরো কিছু কাজ করার ইচ্ছে আছে।
করোনার সময় অনেক শিল্পীই মানবেতন জীবনযাপন করেছেন। সেই দিনগুলোতে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
করোনার সময় তো আমরা সবাই বেকার হয়ে পড়েছিলাম। অনেকেই সংগীত ছেড়ে জীবন চালাতে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছিলেন। করোনা শুধু সংগীত অঙ্গন নয়, সব সেক্টরে যে সংকট তৈরি করেছে, তা কতদিনে স্বাভাবিক হবে কেউ বলতে পারি না। তবে আবার যেহেতু সবকিছু নতুন করে শুরু হচ্ছে সেহেতু সুদিন আশা করতেই পারি।
ইদানিং শিল্পীরা এককভাবে নিজের চ্যানেলে গান রিলিজ দিচ্ছেন। আপনিও সেই পথে হাঁটছেন। এর কারণ কী?
দেখুন, এখন কিন্তু আর অডিও ক্যাসেটের যুগ নেই। তাছাড়া গান মানুষ শোনার পাশাপাশি দেখতেও পছন্দ করছেন। তারা এখন ইউটিউবেই বেশি দেখছেন বা শুনছেন গানগুলো। নিজের চ্যানেলে গান রিলিজ দিলে খুব বেশি যে লাভ হচ্ছে, তা আমি মনে করি না। তবে শিল্পীরা সেখান থেকে কিছু আর্থিক নিশ্চয়তা পাচ্ছে, এটা সত্য। পাশাপাশি নিজের সৃষ্টিকর্মটি নিজের কাছেই সংরক্ষিত থাকছে। এটা খুবই ভালো একটি দিক ।
অনেকেই বলেন ফোকগানের জনপ্রিয়তা কমে যাচ্ছে। আপনার দৃষ্টিতে ফোকগানের অবস্থা কেমন দেখছেন?
ফোকগানের জনপ্রিয়তা কমছে, এটা আমি মানতে পারলাম না। বরং এই গানের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। লোকগান হচ্ছে আমাদের মাটির গান, শেকড়ের গান। ফোকগানের জনপ্রিয়তা কখনো কমবে না। আমি যখন দেশের আনাচে-কানাচে শো করতে যাই তখন লোকগানের প্রতি মানুষের ভালোবাসা সরাসরি দেখতে পাই। শুধু তাই নয়, দেশের বাইরেও বাংলা লোকগানের চাহিদা অনেক। আমি লোকসংগীতশিল্পী হিসেবে গর্ববোধ করি।
মমতাজ ও আপনি সমসাময়িক সময়ে সংগীত যাত্রা শুরু করেছেন। সেই জায়গা থেকে ক্যারিয়ারে একটু পিছিয়ে আছেন মনে করছেন না?
মমতাজ আপার সঙ্গে আমি অনেক স্টেজে গান করেছি। অনেক শোতে এমনও হয় মমতাজ আপাকে ডাকলে আমাকে ডাকে না। আবার আমাকে ডাকলে মমতাজ আপাকে ডাকে না। কারণ তারা মনে করেন আমরা একই ধাঁচের গান করি। এর বাইরে অনেকগুলো অ্যালবাম, জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছি। এছাড়া রাধারমণ, লালনের অসংখ্য গান গেয়েছি। পাশাপাশি শাহ আব্দুল করিমের গান প্রচারের ক্ষেত্রেও কিন্তু আমার অবদান অনেক রয়েছে। তারপরও কেন আমাকে সামনে আনা হয় না বা প্রচার-প্রসারে আমি থাকি না, সেটা বুঝতে পারি না।
আপনাদের সময়ের মতো এখনকার ফোকগান শ্রোতার হূদয়ে স্থান করে নিতে পারছে না কেন?
আমরা কিন্তু ফোকগান শিখে যাত্রা শুরু করেছি। তাছাড়া সে সময় ফোকগানের শিল্পী সংখ্যাও কম ছিল। ফলে আমাদের গান মানুষ শুনতো। কিন্তু এখন কাজের পরিধি এবং শিল্পী সংখ্যা বাড়লেও তারা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না নিয়েই ফোকগান করছেন। ফলে তাদের গানের কথা-সুরে অসংখ্য ভুল থেকে যাচ্ছে। যে কারণে তারা সাময়িক জনপ্রিয়তা পেলেও যখন মানুষ বুঝতে পারছে তখন সেই জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ছে। আপনি আধুনিক গানের শিল্পী হয়ে তো আর ফোকগান করতে পারবেন না। তবে আমি বলছি না, ভালো শিল্পী তৈরি হচ্ছে না।
সংগীতের সোনালি যুগ থেকে কাজ করছেন। সেই সময়ের আলোকে সংগীতের বর্তমান প্রেক্ষাপট কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আগে তো অডিও লেভেল কোম্পানি থেকে আমরা গান করতাম, তারা আমাদের সম্মানী দিতো। এখন তো সংগীত অঙ্গন পুরো বাণিজ্যিক হয়ে গেছে। তবে সংগীত জগতের প্রসার হলেও কাজের মান অনেক কমে গেছে। এখন তো অনেকেই রাতারাতি জনপ্রিয়তা পেতে চায়। ফলে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে।