ডাকোটা প্লেন ক্র্যাশের দুঃখজনক স্মৃতি

এই লেখাটি লেখা আমার জন্য মোটেই সুখকর নয়। লেখাটি লিখতে গিয়ে একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা এবং আমার আপনজন সম্পর্কে বেশ কিছু অপ্রিয় সত্য কথা লিখতে হবে। ইতিহাস অপ্রিয় হলেও হতে হবে সত্যাশ্রয়ী। ১৯৭২ সালের ১৬ জানুয়ারি ক্যাপ্টেন শাহাবউদ্দিন (বীর উত্তম) এবং আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশ বিমানের যাত্রীবাহী ফ্লাইট শুরু করার জন্য বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একমাত্র ডাকোটা এরোপ্লেনখানা আনার ব্যবস্হা করেছিলাম।

ডাকোটা প্লেনখানা ছিল যোধপুরের মহারাজার। মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্যাপ্টেন খালেক, মুকিত, শাহাব এবং আমি ঐ প্লেনখানা চালিয়েছি।

বাংলাদেশ বিমান ডাকোটা প্লেনখানা দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করলেও ওটার যাত্রী বহনের ক্ষমতা ছিল খুব সীমিত। প্লেনের দুটি অংশ ছিল। কেবিনের সামনের অংশে মহারাজা এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বসার জন্য সুদৃশ্য ছয়টি সোফাসেটের আসন ছিল। তারপর ছিল পার্টিশন। পার্টিশনের সঙ্গে লাগোয়া ছিল ভিআইপিদের ব্যবহারের জন্য একটি টয়লেট। এরপর পেছনের দিকে প্লেনের দুপাশে পাঁচ-ছয় জন কর্মচারীর বসার জন্য ছিল দুটি কাঠের বেঞ্চ। একদম পেছনের দিকে কর্মচারীদের জন্য একটি টয়লেট।

বিমান বাহিনীর কাছ থেকে বাংলাদেশ বিমান প্লেনখানা পেল জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে। ততদিনে বঙ্গবন্ধু কর্নেল ওসমানীকে সরাসরি জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে অবসরে পাঠালেন। একই সঙ্গে তাকে বাংলাদেশ বিমানের মন্ত্রিত্বের দায়িত্বভারও দিলেন। ক্যাপ্টেন খালেক ও ওসমানী সাহেব মানসিকভাবে ছিলেন ভারতবিদ্বেষে জর্জরিত।

ডাকোটা প্লেনখানা বাংলাদেশ বিমানে আনার পর শুরু হলো ক্যাপ্টেন খালেকের ক্ষমতা প্রদর্শনের কুত্সিত প্রদর্শনী। তার নির্দেশে প্লেনের পেছনের বেঞ্চগুলো অনেক দীর্ঘ করা হলো, যাতে অনেক বেশি যাত্রী বহন করা যায়। ফলে প্লেনের উড্ডয়নকালীন ভারসাম্য নষ্ট করা হয়েছিল এবং উদ্বোধনী ফ্লাইটের মাত্র ছয় দিনের মাথায় ডাকোটা প্লেনখানা বিধ্বস্ত হয়। ট্রেনিং ফ্লাইটের পাঁচ জন পাইলটের সবাই মৃতু্যবরণ করেন।

মানুষকে ক্ষমতা প্রদর্শন করা এবং ব্যক্তিগত প্রোফাইলকে এনলার্জ করে দেখানোর প্রচেষ্টা থেকে বিরত রাখা খুব কঠিন কাজ।

কি কুক্ষণেই না ক্যাপ্টেন শাহাবউদ্দিন এবং আমি বঙ্গবন্ধুকে বলে প্লেনখানা বাংলাদেশ বিমানে আনার ব্যবস্হা করেছিলাম, তা চিন্তা করলে আজও মনে মনে কষ্ট পাই।

ভারতীয় ডাকোটা প্লেনগুলো ছিল খুবই পুরোনো, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ের। উন্নতমানের রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ভারতীয় বিমান বাহিনীর পাইলটরা বেশ নিরাপদেই ঐ প্লেনগুলো চালাচ্ছিলেন।

পুরোনো এরোপ্লেন এবং পুরোনো ইঞ্জিন ছিল বলে ঐ প্লেনগুলোতে উড্ডয়নের সময় কখনো ইঞ্জিনের পুরো শক্তি প্রয়োগ করা হতো না। এছাড়া ইঞ্জিনের আরপিএম (জঙঞঅঞওঙঘ চঊজ গওঘট১৬) এবং ইঞ্জিনের মেনিফোল্ড প্রেশারের একটি সংখ্যানুপাত বজায় রাখতে হতো। ক্যাপ্টেন মুকিত, শাহাব এবং আমি ইনস্ট্রাকটর সঞ্চয় কুমার চৌধুরীর সব নির্দেশ পালন করতাম। ক্যাপ্টেন খালেক তা করতেন না।

মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের স্বাধীনতা লাভের ব্যাপারে খালেক সাহেব ছিলেন সন্দিহান। তিনি ছিলেন সমাজতন্ত্রী ও চৈনিকপম্হি। যুদ্ধকালীন তার চোখের দৃষ্টি ছিল বেশ নিষ্প্রভ। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে আমাদের বিজয় যখন সুনিশ্চিত, তখন তার আসল রূপ প্রকাশিত হলো। ভারত ও হিন্দুবিদ্বেষের কথা তার মুখে খইয়ের মতো ফুটতে শুরু করল। এখানে প্রশ্ন করা যেতে পারে, এতটা ভারতবিদ্বেষী হওয়া সত্ত্বেও তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন কেন? যোগ দিয়েছিলেন, কারণ ভারতবিদ্বেষের চেয়ে তার পাকিস্তানবিদ্বেষ ছিল আরো বেশি। সেখানেও ঐ একই কারণ। প্রতিটা এরোপ্লেনের ক্যাপ্টেন হতে গিয়ে তিনি বারবার অকৃতকার্য হয়েছিলেন।

একাত্তর সালে পিআইএর প্রায় সব বাঙালি পাইলট ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক। কিন্তু কয়েক জন বাঙালি পাইলট পাকিস্তানিদের সহযোগীও ছিলেন। স্বাধীনতা লাভের কয়েক দিন পর একদিন ক্যাপ্টেন খালেককে প্রশ্ন করলাম, তিনি কেন পাকিস্তানের দালালি করেছেন? উত্তরে তিনি বললেন, দেশ এখন স্বাধীন হয়েছে। এখন সব ভেদাভেদ আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত।

(দুই)

ইতিমধ্যে বিমানের বিভিন্ন পদে নিয়োগের সাকু‌র্লার বেরিয়েছিল। ঐ সাকু‌র্লারে ক্যাপ্টেন খালেককে পাইলটদের ট্রেনিং চিফ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। বিষয়টা ছিল একপ্রকার রসিকতা। যিনি ডিমাপুরে ট্রেনিংয়ের সময় ডাকোটা প্লেনের ক্যাপ্টেন হওয়ার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেননি, তিনি হবেন পাইলটদের ট্রেনিং প্রধান!

মুক্তিযুদ্ধের সময় কর্নেল ওসমানীকে নিয়ে আমরা কয়েকটি ফ্লাইট অপারেট করেছিলাম। ঐ সব ফ্লাইটে ক্যাপ্টেন খালেকের ককপিটে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা ছিল। ক্যাপ্টেন মুকিত ও আমিই ফ্লাই করেছি। আমাদের সঙ্গে ছিলেন ভারতীয় বিমান বাহিনীর ইনস্ট্রাক্টর পাইলট ফ্লা. লে. সিনহা। কোনো জরুরি অবস্হার সৃষ্টি হলে তিনি তো ছিলেনই।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের ডাকোটা প্লেনের ট্রেনিং যুদ্ধের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য উপযুক্ত হলেও এয়ারলাইনস ফ্লাইটের জন্য বিস্তারিত ছিল না। প্লেন দিয়ে টেক অফ ও ল্যান্ডিং করতে পারলেই চলে না। ইনস্ট্রাক্টরের তত্ত্বাবধানে অনেক ধরনের ইমার্জেন্সি ট্যাকল করার কৌশলাদিও রপ্ত করতে হয়। এ কথা চিন্তা করেই এভিএম এ কে খন্দকার আমাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের জন্য মুক্তিযুদ্ধকালীন আমাদের ইনস্ট্রাক্টর ভারতীয় বিমানবাহিনীর স্কো. লী. সঞ্জয় কুমার চৌধুরীকে ঢাকায় আনিয়েছিলেন।

তিনি ঢাকায় এসেছিলেন ফেব্র‚য়ারি মাসের ৫ অথবা ৬ তারিখে। তিনি ছিলেন পাবনার ছেলে এবং তার স্ত্রীর আদিনিবাস ছিল ফরিদপুর। এ দেশের প্রতি আমাদের চেয়ে তার এবং তার স্ত্রীর ভালোবাসা কম ছিল না। এমন একজন বাংলাদেশপ্রেমিক মানুষকে সবার সামনে অপদস্ত করে ক্যাপ্টেন খালেক কী প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন জানি না। ফেব্র‚য়ারির ৮ তারিখ ডাকোটা প্লেন নিয়ে ফ্লাইট করতে গিয়ে দেখলাম প্লেনের রেডিও টেলিফোন ব্যবস্হা কাজ করছে না। ইঞ্জিন থেকে ছোট ছোট ফোঁটায় হাইড্রলিক চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। ক্যাপ্টেন খালেককে বললাম, আমাদের ফ্লাইট দু-এক দিনের জন্য বন্ধ রেখে প্লেন নিয়ে কলকাতায় যাওয়া উচিত যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত করার জন্য। এছাড়া প্লেনের সেন্টার অব গ্রাবিটিও নির্ধারণ করে আনা যাবে।

তখন পর্যন্ত আমাদের ডাকোটা প্লেনের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করত ব্যারাকপুরের হিন্দুস্তান অ্যারোমেটিক্যাল লিমিটেড (ঐঅখ)। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তারা আমাদের কাছ থেকে অর্থকড়ি গ্রহণ করত না। এমনকি প্লেনখানা নিয়মিত বা অনিয়মিত মেইন্টেন্যান্সের জন্য নিয়ে গেলে ব্যারাকপুর বিমানঘাঁটির ভিআইপি রুমে আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্হা করত।

এরোপ্লেনের যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত করতে কলকাতায় যাওয়ার প্রস্তাব খালেক সাহেব উপেক্ষা করে বললেন, আরো দু-চার দিন পর কলকাতায় যাওয়া যাবে। এ নিয়ে তার সঙ্গে আমার ঝগড়া হলো। তাকে বললাম, আমি আর আপনার সঙ্গে ফ্লাই করব না। বিমান অফিসে লিখিতভাবে তা জানিয়েও দিলাম।

১০ ফেব্র‚য়ারি আমরা বিমানের পাইলটরা মগবাজারে একটা চৈনিক রেস্তোরাঁয় নৈশভোজের আয়োজন করেছিলাম। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা উত্তীর্ণ হয়ে গেল। আমি বিমানের ফ্লাইট অপারেশন বিভাগে টেলিফোন করলাম। জানতে পারলাম, ডাকোটা প্লেনখানা ট্রেনিং ফ্লাইট করতে গিয়ে টেক অফ করার একটু সময় পরেই বিধ্বস্ত হয়েছে। আরোহী ক্যাপ্টেন নাসির হায়দার, ক্যাপ্টেন খালেক এবং তিন জন ক্যাডেট পাইলট শরফুদ্দিন, মোয়াজ্জম, মোস্তফা সবাই নিহত হয়েছেন।

নিহত পাঁচ জন পাইলটই আমার ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ক্যাপ্টেন নাসির হায়দার ছিলেন পিআইএর বাঙালি পাইলটদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সিনিয়র পাইলট।

নিহত পাঁচ জন পাইলটই আমার অতিশয় ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও ক্যাপ্টেন খালেক ও শরফুদ্দিনের মৃতু্যতেই যেন একটু বেশি ব্যথিত হয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা একসঙ্গে ছিলাম। শরফুদ্দিন সাহসিকতার জন্য বীর উত্তম পদকে ভূষিত। খালেক সাহেব বীর প্রতীক।

যে ভারত আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে অপরিসীম সাহাঘ্য করেছে, সেই ভারতের প্রতি অহেতুক কটূক্তি করার কারণে এবং সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা বলার কারণে খালেক সাহেবের প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধে চিড় ধরেছিল। সিনিয়র হিসেবে সব সিদ্ধান্ত অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা এবং পাইলটদের যে দু-চার জন পাকিস্তানপম্হি ছিলেন, তাদের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠতা—এসব আমার মনে তার প্রতি যথেষ্ট ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।

খালেক সাহেবের থ্যাঁতলানো মৃতদেহ দেখে আমার মনের সব ক্ষোভ এক মুহূর্তে উবে গেল। বরং দেখা দিল ভিন্ন একপ্রকারের ক্ষোভ। দুই দিন আগে যখন তাকে প্লেনের যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত করার জন্য কলকাতায় যাওয়ার কথা বলেছিলাম, তখন তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন কেন? অবিবেচকের মতো এরোপ্লেনের ভারসাম্যের কথা না ভেবে যাত্রী ও মালামাল বহনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন কেন?

ক্যাপ্টেন খালেক তার একগুঁয়েমীপনা এবং অন্যদের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারতেন, তার সঙ্গে আর এক উগ্র ভারতবিদ্বেষী জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে।

জেনারেল ওসমানীর বাসায় বসে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের আমাদের প্রধান সেনাপতি ও ক্যাপ্টেন খালেক একে অপরের ব্রেইন ওয়াশ করতেন। জেনারেল ওসমানীর ব্রেইন ওয়াশ কতটা হয়েছিল, তা পরিমাপ করা যায়, যখন দেখি তিনি খুনি মোশতাকের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হয়েছিলেন। মুশতাকের উপদেষ্টা হওয়ার কি তার কোনো প্রয়োজন ছিল? মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা এবং মানুষের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। আর তিনিই হলেন কিনা মুশতাকের উপদেষ্টা!

ক্যাপ্টেন খালেক ও শরফুদ্দিনের মৃতু্যর পর বাংলাদেশ বিমান বাহিনী তাদের মৃতদেহকে গার্ড অব অনার দিয়েছিল কিলো ফ্লাইটের সদস্য হিসেবে।

গার্ড অব অনার শেষে শরফুদ্দিনের মৃতদেহ বাংলাদেশের পতাকায় আচ্ছাদিত কফিন বাক্স বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারে তোলা হলো তার দেশের বাড়ি কুষ্টিয়ায় পৌঁছে দিতে। হেলিকাপ্টারখানা টেক অফ করে পশ্চিম দিকে চলতে শুরু করল।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও বৈমানিক