ভারতে ঊর্ধ্বমুখী করোনা সংক্রমণ। গতকাল বুধবার ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত আট দিনে দেশটিতে সংক্রমণ বেড়েছে ৬ দশমিক ৩ গুণ। ভারত সরকারের হিসাব অনুযায়ী সর্বাধিক আক্রান্ত হয়েছে মহারাষ্ট্রে, দ্বিতীয় স্থানে আছে পশ্চিমবঙ্গ।
এদিকে বাংলাদেশেও করোনা সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী। সংক্রমণ বৃদ্ধির ধারায় দেশে গত এক দিনে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৯০০র কাছাকাছি পৌঁছে গেছে; নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে দৈনিক শনাক্তের হার আবারও ৪ শতাংশ ছাড়িয়েছে। কোনো পরিবারের এক জন আক্রান্ত হলে পুরো পরিবার এবং এক পরিবার থেকে আরেক পরিবারে দ্রুত ছড়াচ্ছে। এছাড়া চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ হচ্ছে দ্রুত।
আমেরিকান শীর্ষ সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যান্থনি ফাউসি আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন, ওমিক্রনে ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা বেশি আক্রান্ত হবে। তার এই সতর্ক বার্তা আমেরিকার পাশাপাশি বাংলাদেশেও সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশে এখনো ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের সংক্রমিত হওয়ার মাত্রা স্থিতিশীল রয়েছে। তবে ব্যাপক হারে সংক্রমণ শুরু হলে দেশে করোনা রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে বড় ধরনের সংকট দেখা দেবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, যারা রোগীদের সেবা দেবেন, তারাই যদি আক্রান্ত হন, তাহলে চিকিৎসাসেবা দেবে কারা? তাই এখন থেকে সতর্ক থাকতে হবে। জনসচেতনতা সৃষ্টি, জেল-জরিমানা—যেভাবেই হোক সবার মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে তা অব্যাহত থাকলে দেশে ভয়াবহ বিপদ আসন্ন।
অন্যদিকে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চের (আইসিএমআর) এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, কোভিডের বর্তমান ভয়াবহতা তিন মাসের মধ্যেই কমতে শুরু করবে। আইসিএমআরের এপিডেমিওলজি অ্যান্ড কমিউনিকেবল ডিজিজেসের প্রধান চিকিৎসক সমীরণ পাণ্ডা বলেন, কম উপসর্গযুক্ত ওমিক্রনের সংক্রমণ করোনা মহামারি শেষ করতে সাহায্য করতে পারে। ওমিক্রন নিজেই কোভিডের টিকা হিসেবে কাজ করতে পারে।
বাংলাদেশেও সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, দেশে করোনা সংক্রমণ এখন ঊর্ধ্বমুখী। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অবস্থা খুবই খারাপ। এ কারণে আমরাও চরম ঝুঁকিতে আছি। যে কোনো মুহূর্তে দেশে ব্যাপক হারে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরাও ব্যাপক হারে আক্রান্ত হতে পারে। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানা বাধ্যতামূলক। স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে হেলাফেলা করলে চিকিৎসা করার মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ও সোসাইটি অব মেডিসিনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, দেশে করোনা সংক্রমণ প্রতিদিনই বাড়ছে। আমেরিকান শীর্ষ সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যান্থনি ফাউসি সতর্ক বার্তা অনুযায়ী যদি দেশে ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা ব্যাপক হারে সংক্রমিত হয়, তাহলে চিকিৎসাসেবা প্রদানে সংকট সৃষ্টি হবে। বর্তমানে যে হারে ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছে তা অনেকটা স্থিতিশীল পর্যায়ে আছে। তবে নিরাপদ নয়। ব্যাপক হারে সংক্রমণ শুরুর আগেই সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তাহলে বড় বিপর্যয় থেকে দেশ রক্ষা পাবে।
স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ বলেন, করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনের উপসর্গ মৃদু। তবে এই ভ্যারিয়েন্টটি দ্রুত ছড়ায় এবং ভাইরাসের আশপাশে যারা থাকে সবাইকে সংক্রমিত করে। দেশে আগামী এক মাসের মধ্যে সংক্রমণ ব্যাপক হারে বাড়ার আশঙ্কা আছে। যারা আক্রান্ত হয়, তাদের হার্ড ইমিউনিটিও হয়।
তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের দেশগুলোতে বেশি লোক টিকা নেয় না। এ কারণে এসব দেশে ওমিক্রন ব্যাপক হারে দেখা দিয়েছে। যেসব দেশ করোনা টিকা বেশি দিয়েছে সেসব দেশে সংক্রমণের হার কম। আমাদের দেশে প্রচুর টিকা এসেছে। তাই মহাবিপদ আসার আগেই সবাইকে টিকা দিতে হবে। একই সঙ্গে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ বলেন, বিজ্ঞানীরা আশার বাণী শুনিয়েছেন যে, করোনা ভাইরাস বিভিন্ন রূপ বদলে যেভাবে সংক্রমিত হচ্ছে, তাতে এটি ২০২২ সালে দুর্বল হয়ে যাবে। ভাইরাসের ধরন এমনই। দ্রুত রূপ বদলে দুর্বল হয়ে যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ৮৯২ জনের মধ্যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে, মৃত্যু হয়েছে তিন জনের। এর চেয়ে বেশি রোগী এক দিনে শনাক্ত হয়েছিল সর্বশেষ ২৯ সেপ্টেম্বর, সেদিন ১ হাজার ১৭৮ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ার খবর এসেছিল। নতুন রোগীদের নিয়ে দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৮৮ হাজার ৮০৭ জনে। এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৮ হাজার ৯০ জন।
মঙ্গলবার নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ছিল ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ; গতকাল বুধবার তা বেড়ে ৪ দশমিক ২০ শতাংশ হয়েছে। এর বেশি শনাক্তের হার সর্বশেষ ছিল গত ২৮ সেপ্টেম্বর; সেদিন প্রতি ১০০ পরীক্ষায় ৪ দশমিক ৪৮ জনের কোভিড পজিটিভ এসেছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা থেকে সেরে উঠেছেন ২১২ জন। তাদের নিয়ে মোট ১৫ লাখ ৫০ হাজার ১৬৮ জন এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে উঠলেন। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ৭৭৫ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ার তথ্য এসেছিল, মৃত্যু হয়েছিল ছয় জনের। সেই হিসেবে তার পরের ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী বেড়েছে ১১৭ জন। গত এক দিনে শনাক্ত নতুন রোগীদের মধ্যে ৭৩৯ জনই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা, যা মোট আক্রান্তের ৮২ শতাংশের বেশি। দেশের ২৯টি জেলায় এক দিনে কারো করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়নি। গত এক দিনে মারা যাওয়া ষাটোর্ধ তিন নারীর মধ্যে দুজন ঢাকা বিভাগের এবং এক জন রাজশাহী বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন। তাদের সবাই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত এক দিনে সারা দেশে মোট ২১ হাজার ২৫১টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এ পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ ৮৮ হাজার ৮০৭টি নমুনা। এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা অনুযায়ী শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
ইউরোপের দেশে দেশে সংক্রমণের রেকর্ড
করোনা সংক্রমণে বিপর্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড সাড়ে ১০ লাখের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হওয়ার এক দিন পর মঙ্গলবার ইউরোপের চার দেশে রেকর্ড সংক্রমণ হয়েছে। করোনা সংক্রমণ বেড়েছে ভারতেও।
ফ্রান্স টোয়েন্টিফোর ডটকমের এক খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ইউরোপের দেশগুলোয় করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ১১ লাখ। আর মৃত্যু হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজারের। ইউরোপে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৯ কোটি ৮ লাখের বেশি মানুষ। এর মধ্যে মঙ্গলবারই আক্রান্ত হয়েছেন ১০ লাখ ৯২ হাজার।
মঙ্গলবার ইউরোপে দুটি দেশে সংক্রমণ ২ লাখের ওপরে ছিল। যুক্তরাজ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ২ লাখ ১৮ হাজার মানুষ। ফ্রান্সে সংক্রমিত হয়েছে ২ লাখ ৭১ হাজারের বেশি। দ্য গার্ডিয়ানের এক খবরে বলা হয়েছে, সরকারিভাবে যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, যুক্তরাজ্যে প্রকৃত রোগীর সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি হবে।
সংক্রমণের নতুন রেকর্ড হয়েছে ইতালিতেও। দেশটিতে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ। শনাক্তের দিকে থেকে এরপরই রয়েছে গ্রিস। দেশটিতে আক্রান্ত হয়েছেন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। এছাড়া জার্মানিতে সংক্রমিত হয়েছেন ৪৩ হাজার মানুষ।