এক বছরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ

গত বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে সারা দেশে ২২ হাজার ২২২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যা ২০২০ সালের দুর্ঘটনার চেয়ে ১ হাজার ৪৯টি বেশি। এক বছরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেড়েছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। গত এক বছরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মোট ৩৩০ কোটি ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ১৯০ টাকার অধিক ক্ষতি হয়েছে। এসব অগ্নিকাণ্ডের ফলে ২ হাজার ৫৮০ জন নিহত হন। আহত হয় ১১ হাজার ৯৯৯ জন। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সদর দপ্তর থেকে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। 

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের গত পাঁচ বছরে তথ্য পর্যবেক্ষণ মতে, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে কম অগ্নিকাণ্ড ঘটে বরিশাল বিভাগে। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনের মতে, অসচেতনতাই অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ। তাছাড়া শহরগুলো দ্রুত নগরায়ণ হলেও সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে না নগরের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের বিষয়। দিন দিন সুউচ্চ ভবনে শহর ভরলেও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা উপেক্ষিত। পরিবারের চুলা আর শর্ট সার্কিটের আগুনের বিষয় সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দেন তারা। তারা বলেন, এসব ক্ষেত্রে একটু সচেতন হলেই মূল্যবান জীবনের সঙ্গে অর্থসম্পদ রক্ষা করা সম্ভব। 

গত বছরের কয়েকটি ঘটনা : বছরের শেষে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ঢাকা-বরগুনা লঞ্চে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় ৪৫ জন নিহত হয়। ১৮ ডিসেম্বর নাজিরাবাজার জুতার ফ্যাক্টরিতে আগুন, ১২ ডিসেম্বর সুরিটোলায় জুতার গোডাউনে, ১১ ডিসেম্বর বাংলামোটর আর কে ভবনে আগুন, ৫ ডিসেম্বর রায়েরবাগ মশার কয়েল ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগে। গত বছরের এপ্রিলে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৮৬১টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ঐ সময় ১৫০ জন নিহত হয়। আহত হয় ১ হাজারের বেশি মানুষ। ঢাকা বিভাগে শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেশি থাকা এবং আবাসিক এলাকায় কারখানা স্হাপন এবং দাহ্যপদার্থ রাখায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেশি ঘটে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 

গত পাঁচ বছরে অগ্নিকাণ্ডের কিছু তথ্য : ২০১৭ সালে মোট ১৮ হাজার ১০৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২৫৭ কোটি ২৪ লাখ ৮৪ হাজার ৪৮৬ টাকা ক্ষতি হয়। এসব অগ্নিকাণ্ডে ২৬৯ জন আহত ও ৪৫ জন নিহত হন। ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ৫১টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ২০২১ সালে ২২ হাজার ২২২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মোট ৩৩০ কোটি ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ১৯০ টাকার অধিক ক্ষতি হয়। পাঁচ বছরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বাড়ে ৪১১৭টি বা ২২ শতাংশ। এ সময় ক্ষতির পরিমাণ বাড়ে ৭৩ কোটি ৯ লাখ ৫১ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। ২০১৭ সাল থেকে ২০২১ সাল এই পাঁচ বছরে অগ্নিকাণ্ডের কারণে মোট ৩ হাজার ৯৩ জন নিহত এবং ১৩ হাজার ৮৬৩ জন আহত হয়। 

কেন আগুন লাগে : বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্সের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের আধুনিক নগরায়ণ যত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে, তত দ্রুততার সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়গুলো বাড়ছে না। দিনের পর দিন সুউচ্চ ভবনগুলো গড়ে উঠছে ইমারত নির্মাণবিধিকে উপেক্ষা করে। এ বিষয়গুলো মনিটরিং করা হচ্ছে না। আবার যারা ইমারত নির্মাণ করছেন তারা কিছু টাকা আর জায়গা বাঁচাতে গিয়ে নিজেরাই আগুনজনিত দুর্ঘটনায় নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করেন। ফলে গায়ে গায়ে লেগে থাকা ইমারতের একটিতে আগুন লাগলে তা ছড়িয়ে যাচ্ছে আশপাশে। অগ্নিকাণ্ড এড়াতে তিনি বেশ কিছু সুপারিশ 
করেন। 
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স থেকে জানা যায়, ছোটদের আগুন নিয়ে খেলা, যন্ত্রাংশের সংঘর্ষ, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র, সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরো, খোলা বাতির ব্যবহার, চুলার আগুন, মিস ফায়ার, চিমনি, রাসায়নিক বিক্রিয়া, বাজি পোড়ানো ইত্যাদি কারণে আগুন লাগে। প্রায় প্রতি মাসে একাধিক আগুন লাগে। বিশালসংখ্যক অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে শহরে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ (এসি, ফ্রিজ),গ্যাসের চুলাসহ আবাসিক এলাকায় দাহ্যপদার্থ রাখা, কারখানা স্হাপন প্রভৃতি কারণের কথা উল্লেখ করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্সের সাবেক সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ আকতার মাহমুদ। 

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক (অপারেশনস) আবদুল হালিম জানান, ‘সারা দেশে আমাদের ৪৫৭টি ফায়ার স্টেশন আছে। নতুন ৪০টি উদ্বোধনের অপেক্ষায়। ঢাকা শহরে ১৪টি ফায়ার স্টেশনের পাশাপাশি মন্ত্রীপাড়াসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পাঁচটি টহল ডিউটি আছে। প্রশিক্ষিত দক্ষবাহিনী কাজ করছে।’