বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছর পার করেছে। এই সময় একটি দেশের সামগ্রিক উন্নতির ক্ষেত্রে খুব বেশি সময় বলা যাবে না। তবু অনেক বাধা অতিক্রম করে বাংলাদেশের অর্জনও কম নয়। বাংলাদেশের যেসব অর্জন আন্তর্জাতিক বিশ্বে সম্মান বাড়িয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো নারীর ক্ষমতায়ন। বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বের কাছে রোল মডেল। ডব্লিউইএফের মতে, নারী উন্নয়নে সার্বিক সূচকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, শীর্ষে শুধু অস্ট্রেলিয়া।
নারীর অগ্রযাত্রার পথে কাঁটা হয়ে হুল ফুটিয়েছে চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন। অবাক করার মতো খবর হলো, এই ইউনিয়নের মেয়েরা ৫০ বছর ধরে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন না। রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের মোট ভোটার ২৪ হাজার ৪৫৪ জন। তাদের মধ্যে নারী ভোটার রয়েছেন ১২ হাজার ১১৪ জন। তাদের সবার ছবিসহ ভোটার তালিকায় নাম আছে, নিয়েছেন জাতীয় পরিচয়পত্রও। গ্রামের নারীরা শুধু ভোট দেন না, এছাড়া ঘর থেকে বের হয়ে দৈনন্দিন সব কাজকর্ম করেন। ব্যতিক্রম শুধু ভোটের দিন, সেদিন কেউ ঘর থেকে বের হন না।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর। তখন এলাকায় কলেরা দেখা দিলে একজন পির মেয়েদের ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে ফতোয়া জারি করে বলেন, মেয়েদের ভোট দেওয়া নাজায়েজ কাজ। দেশ স্বাধীনের পর থেকে এ পর্যন্ত ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও এই ইউনিয়নের নারীরা ভোট দেননি। মজার বিষয় হলো, স্থানীয় সরকার পরিষদে সংরক্ষিত নারী প্রতিনিধিরাও শুধু পুরুষদের ভোটে নির্বাচিত হন। অনেক সময় সংরক্ষিত আসনের নারী প্রার্থী নিজেও ভোটদানে বিরত থাকেন।
নারীরা সর্বপ্রথম ভোটাধিকার পান ইউরোপের ফিনল্যান্ডে। সে সময় এই দেশ রুশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল এবং ১৯০৭ সালের নির্বাচনে ফিনল্যান্ডের নারীরা প্রথমবারের মতো সংসদে নির্বাচিত হন। ১৯১৩ সালে নরওয়ে দ্বিতীয় দেশ হিসেবে নারীদের পূর্ণ ভোটাধিকার দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নারীদের ব্যাপক অবদানের পরে পশ্চিমা দেশগুলোতে নারীদের সম্বন্ধে জনমতে পরিবর্তন আসে। এরপর কানাডা ১৯১৭ সালে, যুক্তরাজ্য ১৯১৮ সালে এবং যুক্তরাষ্ট্র ১৯২০ সালে নারীদের ভোটের অধিকার দেয়। সর্বশেষ সৌদি আরবে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে নারীরা প্রথমবারের মতো পৌরসভা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। আমাদের এই অঞ্চলে ১৯৪৭ সাল থেকেই নারীরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করে আসছেন।
বাংলাদেশের ৫০ বছরে নারীরা অনেকাংশেই নিজেকে সমাজের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নারীদের আজ আর কেউ অবলার তকমা দিতে পারবে না। তারা আপন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্ষমতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের নারীরা সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিকসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঈর্ষণীয় সাফল্য লাভ করছে। ১৯৯১ সাল থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার নারী—পৃথিবীতে এমন উদাহরণ দ্বিতীয়টি নেই।
ক্ষমতায়ন আসলে একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া? যে প্রক্রিয়ায় নারী তার নিজের জীবনের শিক্ষা-স্বাস্হ্য-পেশা নির্বাচনসহ সব ক্ষেত্রে পরিকল্পনা করা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পান ? বাংলাদেশে স্বাস্হ্যসেবাকর্মীদের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী এবং তারা মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামনের সারিতে কাজ করছেন। তৈরি পোশাককর্মীদের ৮০ শতাংশের বেশি নারী, তারা দেশের অর্থনীতিতে রেখে যাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের নারীরা রাজনীতিতে ভালো অবস্থানে আছেন? জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৫০-এ উন্নীত করা হয়েছে? বর্তমানে সংরক্ষিত আসন ও নির্বাচিত ২২ জনসহ মোট ৭২ জন নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন? স্থানীয় পর্যায়ে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিও আছেন ১২ হাজার জনেরও বেশি। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে।
শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে নারীর ব্যাপক ক্ষমতায়ন হয়েছে। এজন্য বৈশ্বিক স্বীকৃতিও পেয়েছে বাংলাদেশ। নারী শিক্ষার উন্নয়ন এবং ব্যাবসায়িক উদ্যোগের জন্য ‘গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ’ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। এছাড়া তিনি পেয়েছেন জাতিসংঘের ‘প্লানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ ও ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ’ অ্যাওয়ার্ড। বর্তমান সরকারের আমলে সহস্রাধিক নারী সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তা জাতিসংঘ শান্িতরক্ষা কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করেছেন? নারীরা বিচারপতি, সচিব, ডেপুটি গভর্নর, রাষ্ট্রদূত, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন? নিজেদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে এই নারীরা তাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন? সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন?
বাংলাদেশে নারীর ব্যাপক ক্ষমতায়ন হলেও এখনো একশ্রেণির মানুষ নারীকে আবদ্ধ করে রাখতে চায়। এই মৌলবাদী গোষ্ঠীটি সংখ্যায় নগণ্য হলেও তারা সমাজ, এমনকি রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। কয়েক দিন আগে কক্সবাজারের একটি গণধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নারীদের নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টের বিজিবির উর্মি গেস্টহাউজ থেকে সীগাল পয়েন্ট পর্যন্ত ১৫০ ফুট এলাকা নিয়ে ‘বিশেষ জোন’ ঘোষণা করে স্থানীয় প্রশাসন। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতে এ ধরনের আলাদা জোন হতে পারে না। দূর থেকে আসা পর্যটকেরা একে অপর থেকে আলাদা হয়ে কিংবা স্বামী থেকে স্ত্রী আলাদা হয়ে সমুদ্রস্নান করবে, এতে নিরাপত্তার চেয়ে অনিরাপত্তা ও ঝুঁকির আশঙ্কা বেশি হতো। এই সিদ্ধান্েত দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনায় পড়ে সরকার। পরিস্হিতি বিবেচনায় ১০ ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করা হলেও এ ঘটনায় প্রশাসনের মধ্যে একশ্রেণির কর্মকর্তাদের মৌলবাদী চরিত্র ফুটে উঠেছে।
আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের যুগেও কীভাবে মৌলবাদীরা নারীদের তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে, তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ চাঁদপুরের রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন। এটি নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে আলোর নিচে অন্ধকারের প্রতিচ্ছবি।
ভোট দেওয়া হলো একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নারী-পুরুষ সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকার ভোগ করবে। কোনো ফতোয়ার জুজু দেখিয়ে রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীদের ভোটাধিকার হরণ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই সভ্য যুগে এ ধরনের ফতোয়া চলতে পারে না। নারীদের কূপমণ্ডূকতার শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে। নিজেদের অধিকার আদায় করে নিতে হবে। নারীবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘জাগো নারী জাগো বহ্নি-শিখা/ জাগো স্বাহা সীমান্তে রক্ত-টীকা।
লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা