এখন ১০ তলা পর্যন্ত বিল্ডিংগুলো বহুতল হিসেবে গণ্য হচ্ছে না। ফলে অভ্যন্তরীণ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থারও কোনো প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই ফায়ার সার্ভিসের কোনো অনুমোদনও। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)-২০২০-এর গেজেটে এমন কথাই বলা হয়েছে। ফলে এই ভবনগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা একেবারেই দুর্বল। অলি-গলিতে গড়ে উঠা এ ভবনগুলোতে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছতে পারে না। যদিও বিএনবিসির এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ৬ তলা পর্যন্ত করার সুপারিশ করেছে ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু তাদের সে সুপারিশ ফাইলবন্দি হয়েই পড়ে আছে।
এদিকে সদ্য নির্মিত অত্যাধুনিক সুউচ্চ ভবনগুলোতে কেন আগুন লাগছে? ভবনের ঘাটতি কোথায়? জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন ইত্তেফাককে বলেন, ‘রাজউক থেকে অনুমোদন নেওয়ার পর এই ভবনগুলো নির্মিত হচ্ছে। কিন্তু অগ্নিনির্বাপণ যে ব্যবস্থা থাকা দরকার সেগুলো এসব ভবনে থাকছে না। আর ভবনে যে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম লাগানো হচ্ছে, সেটাও দেখার কোনো কর্তৃপক্ষ নেই।’ ১০ তলা পর্যন্ত বহুতল ভবন নয়, বিএনবিসির এই গেজেটকে আপনারা কীভাবে দেখছেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা পরিবর্তন করে ১০ তলা কমিয়ে ৬ তলা করার জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেছি। এখন বাস্তবায়ন হয়নি। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরেও আনা হয়েছে। তিনি এটা সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও এটা সংশোধন হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না সেটা আমরা জানি না।’
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ ভবনে আগুন লাগছে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে। কিন্তু ভবন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভবনে কী ধরনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছে সেটা দেখার কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে ছাড়পত্র নেওয়ারও কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে নির্মাতারা নিজেদের ইচ্ছেমতো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন, যা অনেক ক্ষেত্রেই নিম্নমানের। যেখানে থেকে আগুনের সূত্রপাত হচ্ছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ ৬ জানুয়ারি রাজধানীর বাংলামোটরের রাহাত টাওয়ারে আগুন লাগে। এটা নতুন নির্মিত একটি অত্যাধুনিক ভবন। ১১ তলা এই ভবনের সবচেয়ে ওপরের তলায় এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। কী কারণে সেখানে আগুন লেগেছে সেটার তদন্ত করছে ফায়ার সার্ভিস। তবে প্রাথমিক ধারণা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেই আগুন লেগেছে।
এর আগে গত ১১ ডিসেম্বর বাংলামোটরে আর কে টাওয়ার নামে একটি ১০ তলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তিন জন দগ্ধ হন। এই ভবনটির সপ্তম তলায় ‘রাবেয়া এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটে বলে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার আমিনুর রহমান পলাশ তখন বলেছিলেন, ‘একটি সুইচ অন করতে গিয়ে স্পার্ক হয় এবং দ্রুত শর্টসার্কিট হয়ে বৈদ্যুতিক তারে আগুন লাগে।’ ঐ সময় অফিসে যারা ছিলেন, তারা সবাই নামতে পারলেও তিন জন দগ্ধ হন বলে জানান তিনি।
ঢাকা শহরের বিল্ডিংগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ঠিকমতো আছে কি-নেই এটা দেখার দায়িত্ব কার? জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহম্মেদ খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘এটা দেখার দায়িত্ব ফায়ার সার্ভিসের। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে আপনাকে এটাও স্বীকার করতে হবে, ফায়ার সার্ভিসের এই জনবল দিয়ে সবগুলো ভবন দেখা সম্ভব নয়। এজন্য আমি যখন মহাপরিচালক ছিলাম তখনই ২০১৮ সালে প্রস্তাব দিয়েছিলাম, এগুলো দেখার দায়িত্ব তৃতীয় কোনো প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার জন্য। যারা রিপোর্ট করবে ফায়ার সার্ভিসের কাছে। বাইরের দেশগুলোতে এভাবেই হয়। আবার নতুন যে বিল্ডিং কোড হলো, সেখানে একটা গলির মধ্যে ১০ তলা ভবন উঠে যাবে ফায়ার সার্ভিস জানবেও না। পরে বিপদ হলে দেখা যাবে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকারই কোনো পথ ছাড়াই ভবনটি নির্মিত হয়েছে।’
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের সবমিলিয়ে ১৬৮ জন পরিদর্শক আছেন। এরা সবাই যদি অন্য সব কাজ বাদ দিয়ে শুধু ভবনগুলো পরিদর্শন শুরু করে এবং বছরে ৩৬৫ দিনই এই কাজ করে তাহলেও ঢাকা শহরের সব বিল্ডিং পরিদর্শনে তিন বছর লাগবে। ফলে আমরা নিজেরা সচেতন না হলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। তারপরও বড় ভবনগুলো পর্যায়ক্রমে নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়। সেই সব জায়গায় ফায়ার মহড়াও মাঝে মধ্যে করা হচ্ছে।’