নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেও কোনোভাবে শৃঙ্খলা আনা যাচ্ছে না গণপরিবহনে। রাজধানীর লোকাল বাসগুলোর মালিকরা দৈনিক টার্গেট দেন চালকদের। যা অনেকটা দৈনিক ইজারা দেওয়ার মতো। দিন শেষে বাসমালিকের হাতে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা তুলে দিতে হবে। মালিকের হাতে টার্গেটের অর্থ তুলে দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা ভাগ করে নেন চালক ও হেলপার।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সড়কে বিশৃঙ্খলার একটা বড় কারণ এই দৈনিক ইজারা ব্যবস্থা। কারণ দৈনিক টার্গেট পূরণ করতে রাস্তায় চালকেরা কে কার আগে যাবে সেই প্রতিযোগিতায় নামে। সে জন্য দুর্ঘটনা বেশি হয়। সম্প্রতি রাজধানীর রামপুরায় দুই বাসের প্রতিযোগিতার কারণে একজন শিক্ষার্থীর নিহত হয়। এদিকে বাস পরিচালনায় বিআরটিএ শুধু ভাড়াই নির্ধারণ করে দেয়। আর মালিকরা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী চলেন, তেমনি চলে চালক-হেলপার-কন্ডাক্টরদের স্বেচ্ছাচারিতা।
একাধিক লোকাল বাসের মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রুট ভেদে দৈনিক ইজারার পরিমাণ ভিন্ন হয়, যা চালকদের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক চালক বলেন, রুট ভেদে ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত মালিকরা টার্গেট বেঁধে দেন। এর মধ্যে তেল খরচ চালকের আর বাস মেরামত ও মামলার দায়িত্ব থাকে মালিকের ওপর। দিন শেষে মালিকের টার্গেট যেভাবেই হোক পূরণ করতে হয়। অনেক সময় ট্রিপ দিয়ে টার্গেটের টাকা না উঠলে চালক-হেলপারদের পকেট থেকে টাকা দিতে হয়।
চালকদের কাছে এভাবে দৈনিক ইজারা দেন এমন একজন মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমার বাস গাবতলী থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত যায়। এটি লোকাল বাস। তাই ওয়ে বিলের সিস্টেম নাই। সে জন্য আমার মনিটর করার সুযোগ নাই, কতজন যাত্রী হলো। বাসের চালক-হেলপার যা দেবে, তা নিয়েই আমার চুপ থাকতে হয়। ওরা ঠিকমতো টাকা দেয় না। তাই বাধ্য হয়ে টার্গেট দিয়ে দিয়েছি, প্রতিদিন ওরা যা-ই ইনকাম করুক, আমাকে ১ হাজার ৫০০ টাকা দেবে। সকালে আমি তেলের ট্যাংক ফুল করে দেই, রাতে গাড়ি জমা দেওয়ার সময় তারাও পুরো তেল ভর্তি করে দেয়। আর রাস্তার ট্রাফিক মামলা, গাড়ির কাজ আমাকে করাতে হয়।’
‘শিকড় ট্রান্সপোর্ট’ ও ‘আকীক পরিবহনের’ সাবেক এমডি মাহমুদ হোসেন জানান, তার দুটি কোম্পানিতে ১২টি বাস ছিল। করোনা মহামারির কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা সামাল দিতে ১০টি বাস বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি। এখন দুটি বাস মাসিক ৩৫ হাজার টাকা চুক্তিতে চালক-হেলপারদের ভাড়া বা ইজারা দিয়ে রেখেছেন। মাহমুদ হোসেন আগে যখন সরাসরি এই পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তখন চালক-হেলপারদের ট্রিপ হিসেবে দৈনিক বেতন দিতেন। দিন শেষে কত পেতেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা নির্ভর করত যাত্রীর চাপের ওপর। যাত্রী বেশি হলে ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকাও পাওয়া যেত, আবার কোনো দিন যাত্রী কম থাকলে ড্রাইভার-হেলপারকে নিজের পকেট থেকে দেওয়া লাগত।
এদিকে মিরপুর এলাকা থেকে মাওয়া ঘাট পর্যন্ত চলাচল করে স্বাধীন পরিবহন। প্রতিষ্ঠানটির এমডি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা ট্রিপ হিসেবে ড্রাইভার-হেলপারদের বেতন দিই। মাওয়া থেকে মিরপুর এলে ড্রাইভার পান ৪০০ টাকা আর হেলপার পান ৩০০ টাকা। এভাবে দিনে সর্বোচ্চ চারটা ট্রিপ হয়। ২ থেকে ৩ হাজার টাকা প্রতিদিন থাকে। যাত্রী না থাকলে কোনো কোনো দিন কিছুই থাকে না।
রাজধানীর ভেতরে বাস চালানোয় মালিকদের মিশ্র নিয়ম থাকলেও দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে ইজারা ব্যবস্থা নেই। সেখানে প্রতি ট্রিপ হিসেবে টাকা পান চালক-হেলপার-সুপারভাইজার। ঢাকা-কুমিল্লাগামী তিশা এন্টারপ্রাইজে প্রতি ট্রিপে চালক পান ৫০০ টাকা, হেলপার আর ?সুপারভাইজার পান ৩০০ টাকা করে মোট ৬০০ টাকা। ঢাকা থেকে কুমিল্লা গেলে এক ট্রিপ হিসাব করা হয়।
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বাসমালিকদের দাবির মুখে ভাড়া বাড়িয়েছে বিআরটিএ। সেই সঙ্গে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে সিটিং সার্ভিস ও ওয়ে বিলের নামে মালিকদের বাড়তি ভাড়া আদায় করার কৌশল। এ নিয়ে নিয়মিত চলছে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত। এমন পরিস্থিতিতে চালক-হেলপারদের বেতন দিয়ে বাস চালানো সম্ভব না বলে মনে করছেন বাসমালিকরা।