অকুতোভয় যে বাঙালি বুকের রক্ত ঢেলে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, তাকে মনেপ্রাণে সমর্থন করেছিল, তাকে সগৌরবে সফল করে তুলেছিল, তখনই তাদের অঙ্গীকার ছিল, নতুন বাংলাদেশ হবে উন্নত বাংলাদেশ। এ দেশ হবে শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত। সব মিছিলে-জনসভায়-সমাবেশে তেমন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ই ঘোষিত হয়েছিল ২৩টি বছরব্যাপী পাকিস্তান আমল জুড়ে। ঐ স্লোগান-সভা-সমাবেশ-হরতাল-মিছিল করতে গ্রাম-গ্রামান্তর বা শহরের আনাচ-আনাচ থেকে গাড়ি পাঠিয়ে বা গাড়িভাড়া ও খাবারের প্যাকেট দিতে হয়নি। আপন তাগিদে দেশমাতৃকাকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে মানুষ এগিয়ে আসত।
২৩ বছর পর, ১৯৭১ সালে বাঙালি তার দেশটাকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়তে হলে স্বাধীনতার বিকল্প নেই উপলব্ধি করে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল পাকিস্তানি সেনা শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য। আহ্বানটি ধ্বনিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ থেকে ৭ মার্চ, ১৯৭১ লাখো মানুষের প্রাণবন্ত সমাবেশে। সেদিনকার বজ্রকঠিন ঐতিহাসিক ভাষণ আজ সারা বিশ্বের স্বীকৃতপ্রাপ্ত শ্রেষ্ঠতম ভাষণ। বঙ্গবন্ধু জেনে যেতে পারেননি তার ঐ ভাষণটি বিশ্বস্বীকৃত শ্রেষ্ঠতম ভাষণ। কিন্তু দেশের মানুষ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির তোয়াক্কা না করেই প্রতি বছর ১৫ আগস্ট এলেই সর্বত্র ঐ ভাষণের রেকর্ড প্রায় ৫০ বছর ধরেই শুনে আসছেন, অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। ‘প্রায়’ বললাম এ কারণে যে, মাঝখানে সামরিক শাসনামলে ঐ রেকর্ডটি বাজানো কার্যত ছিল নিষিদ্ধ। বাঙালি জাতি সুদীর্ঘ ২৩ বছরের গণ-আন্দোলন ও ৯ মাসের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল নেতৃত্বের নানা অঙ্গীকারে আকৃষ্ট হয়ে। সেই অঙ্গীকারগুলি ষাটের দশকে ছয় দফা, ১১ দফা কর্মসূচিতে প্রতিফলিত হলেও মানুষ সাধারণভাবে যে স্লোগান-পোস্টারকে আঁকড়ে ধরেছিল—তা নিষিদ্ধ ছিল একটি প্রশ্নাকারে। প্রশ্নটি ছিল, ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ বস্ত্তত পাঞ্জাবি ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শোষকেরা সোনার বাংলাকে একটি শ্মশানে পরিণত করেছিল—যে কারণে কোটি কোটি বাঙালি দেশটাকে আবার ‘সোনার বাংলায়’ পরিণত করতে দৃঢ়তার সঙ্গে পথে নেমেছিল, লৌহদৃঢ় জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলেছিল এবং সাফল্যের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করে সেই দাবিকে আজও ধরে রেখেছে। নেতারা এখনো বক্তৃতা-ভাষণে বলেন, ‘বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করব’। কিন্তু কীভাবে? নিশ্চয়ই মুষ্টিমেয় কয়েক জনের ঘরে কোটি কোটি টাকা পৌঁছে দিয়ে বা ৯০-৯৫ ভাগ মানুষকে বঞ্চিত করে নয়। তাই একদিকে অবৈধ লুণ্ঠনকারীদের কাছে থেকে লুণ্ঠিত অর্থ পুনরুদ্ধার করে জাতীয় তহবিল সমৃদ্ধ করতে হবে। অন্যদিকে নিজস্ব সম্পদ আহরণ ও উদ্ধারের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে।
নিজস্ব সম্পদ কীভাবে বাড়ানো যেতে পারে? আমার মতে, এই মুহূর্তে দুটি উপায় আছে আমাদের। এক. বাংলাদেশের দক্ষিণে অবস্হিত বঙ্গোপসাগরে চর পড়ার মাধ্যমে বিপুল জমি জেগে উঠেছে, রিক্লামেশন ও বিজ্ঞানসম্মত পরিচর্যার মাধ্যমে সেই জমি কীভাবে অল্প সময়ে গৃহায়ন, বৃক্ষায়ণ ও চাষবাসের উপযুক্ত করে তোলা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। এ ব্যাপারে জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নিতে হবে। সেই জমি বাস ও চাষযোগ্য করে তুলতে পারলে সহজেই বিপুল জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। বৃক্ষায়ণের মাধ্যমে ফলমূল, শাকসবজি, তরিতরকারি ইত্যাদি উত্পাদনের মাধ্যমে আমাদের কৃষিকে ব্যাপকভাবে রপ্তানিযোগ্য খাতে পরিণত করতে হবে। এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারব আমরা। এর ফলে উল্লেখযোগ্য হারে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য দূরীকরণও সম্ভব হতে পারে।
দুই. গ্যাস ও তৈল আহরণের অবাধ অধিকার অর্জিত হয়েছে মাত্র বছরতিনেক আগে প্রাপ্ত আন্তর্জাতিক আদালতের এক রায়ের মাধ্যমে। প্রিয় পাঠক-পাঠিকাদের নিশ্চয়ই স্মরণে আছে যে, ঐ দুটি রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের বিশাল এলাকা ভারত ও মিয়ানমারের বেআইনি দখল থেকে বুঝে পেয়েছে। এর নিরঙ্কুশ মালিকানা বাংলাদেশের বলে যে রায় পাওয়া গেছে, তা যুগান্তকারী একটি সাফল্য। আরো মনে পড়ে, ঐ রায়ের পর সরকারিভাবে বলা হয়েছিল, বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে বিপুল পরিমাণ গ্যাস ও তেল আহরণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ঐ তেল-গ্যাস আহরিত হলে বাংলাদেশ তার নিজের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করার পরেও যথেষ্ট পরিমাণে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
সোনার বাংলা বিনির্মাণে এই দুটি বিষয়কে যদি এখন থেকে কার্যকর করার উদ্যোগ যথার্থভাবে গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় খনন কার্যাদি শুরু করা যায়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই আশা করা যায়, বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে। আগামী ১০ বছরের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে লুকিয়ে থাকা ঐ সম্পদ যদি উত্তোলন করা যায়, তাহলে তার মাধ্যমে দেশে নানা জাতীয় কলকারখানা গড়ে তোলা যাবে। এই উদ্যোগ স্বল্পতর ব্যয়ে বহুবিধ পণ্যাদি উত্পাদন, দেশের চাহিদা মেটানো এবং বেকারত্ব ও দারিদ্র্য দূরীকরণে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এর মাধ্যমে বহু আকাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলাও ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে।
পূর্ববর্ণিত বিপুল পরিমাণ জেগে ওঠা জমির উন্নয়ন, বাস ও বৃক্ষায়ণ উপযোগী করার বিষয়ে এবং ভারত ও মিয়ানমারের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে পাওয়া বঙ্গোপসাগরের বিপুল এলাকা থেকে তেল, গ্যাস এবং তার সঙ্গে মূল্যবান মত্স্য আহরণ সম্পর্কে কতৃর্পক্ষের মুখে আর কোনো কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছি না। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, অতীতে প্রদত্ত আশার বাণী কি ব্যর্থ পরিহাসে পর্যবসিত হতে চলেছে?
এ কথা অবশ্যই সত্য যে, এ দুটি কাজ অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ এবং এজন্য বহু বিজ্ঞানী ও যন্ত্রপাতির প্রয়োজন। বাংলাদেশের বহুসংখ্যক প্রকৌশলী দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে আছেন—যারা সরকারি আহ্বান পেলে ছুটে আসবেন দেশের উন্নয়নে। বিদেশি প্রকৌশলীরা যেসব কঠিন শর্তে এই কাজ করে থাকেন—দেশীয় প্রকৌশলীরা সেই একই কাজ বিনা শর্তে এবং স্বল্পতর বেতনে ও অধিকতর আন্তরিকতায় কাজটি সম্পাদন করতে প্রবৃত্ত হবেন উত্সাহের সঙ্গে। প্রয়োজনে অল্প কিছুসংখ্যক বিদেশি বিশেষজ্ঞও এনে কাজগুলি শুরু ও সমাধান করা দরকার।
তিন. এ কাজগুলি সম্পাদন করার মাধ্যমে সম্পদের সুষম বণ্টন করতে পারলেই একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বা সোনার বাংলা গড়ে উঠতে পারে। পদ্মা সেতু যেমন বিদেশি ঋণ বা অনুদানের তোয়াক্কা না করে নিজস্ব অর্থায়নে করা সম্ভব হলো, ঐ প্রকল্পগুলি পদ্মা সেতুর চাইতে অধিক ব্যয়সাধ্য বিধায় নিজস্ব সম্পদে যতটুকু সম্ভব সেটুকু ছাড়া অবশিষ্ট অর্থ বিদেশি অনুদান বা সহজ শর্তে ঋণ সংগ্রহ করে অবিলম্বে শুরু করা প্রয়োজন। প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়তে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি গার্মেন্টস, রেমিট্যান্স ইত্যাদি অর্থনৈতিক খাতের প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে। আমরা আশা করি, সরকার কালবিলম্ব না করে নিজস্ব সম্পদ আহরণে কার্যকরভাবে উদ্যোগী হবেন।
এ জাতীয় প্রকল্পগুলি বাস্তবায়নে যে সংখ্যক বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীর প্রয়োজন তার অনেকাংশই দেশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সরবরাহ করতে পারে। কিন্তু যতটুকু জানা যায়, দলীয় কোন্দল ও ব্যাপক দুর্নীতির কশাঘাতে এবং মৌলিক গবেষণার দিকে না এগোনোর ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলি দেশের উন্নয়নে বিশেষ একটা ভূমিকা রাখতে পারছে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির কাজের তদারকিও নেই। নেই গবেষণার পরিবেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গবেষণার প্রতি জোর দিচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে তার ইচ্ছার প্রতিফলন হচ্ছে না। তাই বছর বছর ডিগ্রিধারী বিজ্ঞানী বা প্রকৌশলী পাশ করে বেরিয়ে এলেও তাদের সৃজনশীল কোনো ভূমিকা দেশের উন্নয়নমূলক কাজে দেখতে পাওয়া যায় না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলির জন্য শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থাও গড়ে তোলা দরকার বলে আমরা মনে করি।
লেখক: একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রবীণ সাংবাদিক