নারী শ্রমশক্তি রফতানি সমস্যা ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নানামুখী কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জনশক্তি রফতানি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ। বাংলাদেশের অর্থনীতির যে কয়েকটি ভিতের উপর দাঁড়িয়ে তার অন্যতম হচ্ছে- রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত ১ কোটির বেশি প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের উপর ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে তাদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধিসহ নানা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ হয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রেমিট্যান্স প্রাপ্ত পরিবারগুলো আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা নতুন সম্পদ অর্জন ও স্বাধীনভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক কর্মে বিনিয়োগ করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে দেশের গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে রেমিট্যান্সের ভূমিকা অপরিসীম। বর্তমানে রেমেট্যান্স আমাদের মোট অভ্যন্তরীণ আয় বা জিডিপির ৩০ ভাগ। বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ দশ রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশের বাংলাদেশের অবস্থান নবম। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ১৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আহরণ করে।

১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশের পরুষের পাশাপাশি বৈশ্বিক শ্রমবাজারে নারীরা প্রবেশ করলেও সেটা ছিল একেবারেই সীমিত পরিসরে। প্রথম দিকে মূলত: দক্ষ নারীরাই বিদেশে কাজ করার সুযোগ লাভ করে। নানা অভিযোগ তুলে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধ করে দিয়েছিল সৌদি আরব। ২০১১ সালে বাংলাদেশ থেকে বিনা খরচে নারী কর্মী নেয়ার প্রস্তাব দেয় দেশটি। মাসিক মাত্র ৮০০ রিয়াল (১৬ হাজার টাকা) বেতনে গৃহকর্মী পাঠাতে ২০১৫ সালে রাজি হয় বাংলাদেশ। সৌদি আরব পুরুষ কর্মী নিয়োগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৭ লাখ বাংলাদেশী নারী কর্মরত আছে। এর মধ্যে ২ লাখ ৫৪ হাজার সৌদি আরব, ১ লাখ ২৭ হাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত, ৮ হাজার ৩ শত কুয়েত, ৭১ হাজার ৪ শত ওমান, ২৮ হাজার কাতার, ১ লাখ ৫ হাজার লেবানন, ১ লাখ ৩৫ হাজার জর্ডান এবং অন্যান্যরা বাহরাইন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, ইতালি, হংকং, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন । অর্থাত্ মোট অভিবাসীর প্রায় ৩০ শতাংশই সৌদি আরবে এর পরবর্তী অবস্থানে আছে জর্ডান।

মূলত ২০১৪ সাল থেকেই বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ নারী শ্রমিক গমন বাড়তে থাকে। ২০১৪ সালে ৭৬ হাজার ৭ জন নারী শ্রমিক বিদেশে যান। ওই বছর সৌদি আরবে যাওয়া নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩ জন। ২০১৫ সালে নারী শ্রমিক গমন বেড়ে হয় ১ লাখ ৩ হাজার ৭১৮ জন। এ ক্ষেত্রে ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে নারী শ্রমিক পাঠানোয় বৃদ্ধি হয় ৩৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এরপর ২০১৬ সালে বিদেশ যান ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৮ জন নারী শ্রমিক। এর মধ্যে সৌদি আরবে যান ২০ হাজার ৯৫২ জন। আগের বছরের তুলনায় ওই বছর নারী কর্মী গমন প্রবৃদ্ধি হয় ১৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ। কিন্তু সৌদি আরবে নারী কর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর গত বছর কমতে থাকে দেশটিতে নারী শ্রমিক গমনের হার।

বর্তমান সময়ে বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশী নারী শ্রমিকদের নির্যাতনের খবর ব্যাপকভাবে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে যেসব নারী শ্রমিক বিদেশে যাচ্ছেন তাদের অধিকাংশই দরিদ্র, অশিক্ষিত ও কোনো প্রশিক্ষণ নেই। এসব নারীরা গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। জানা যায়, প্রবাসে নারী শ্রমিকরা নানা ধরনের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। গৃহকর্মী হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার পর নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন বাংলাদেশের অনেক নারী কর্মী। নির্যাতনের অভিযোগ বেশি আসছে সৌদি আরবে যাওয়া নারী কর্মীদের কাছ থেকে। ফলে ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে বিদেশে নারী শ্রমিকের গমন। পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ১ লাখ ১ হাজার ৬৯৫ জন নারী শ্রমিক বিদেশে গেছেন অথচ ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ জন। সে হিসাবে এক বছরেই নারী শ্রমিকের বিদেশ গমন কমেছে ১৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গৃহকর্মী হিসেবে বিদেশে পাড়ি দেওয়া বাংলাদেশি নারীদের সবচেয়ে বড় অংশই যেতেন সৌদি আরবে। কিন্তু নির্যাতনের কারণে সম্প্রতি  দেশটিতে যেতে যাচ্ছেন না তারা। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে নারী শ্রমিক রফতানিতে। জনশক্তি রফতানি তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালে প্রতি মাসে গড়ে ১০ হাজার ১৬০ জন নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। পরের বছর অর্থাত্ ২০১৮ সালে এ সংখ্যা কমে হয়েছে ৮ হাজার ৪৭৪ জন। সে হিসাবে গত বছর প্রতি মাসে গড়ে ১ হাজার ৬৮৫ জন নারী শ্রমিক কম  পাঠানো হয়েছে। সৌদি আরবে নারী কর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর গত বছর কমতে থাকে দেশটিতে নারী শ্রমিক গমনের হার। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালেই প্রতি মাসে গড়ে ২০০ জন করে নারী শ্রমিক দেশে ফেরেছেন। একই সঙ্গে সৌদি আরবের রিয়াদ ও জেদ্দায় সেফ হোমগুলোয় গড়ে ২০০ জন করে নারী শ্রমিক আশ্রয় নিয়েছেন। আর গত দু-তিন বছরে অন্তত পাঁচ হাজার নারী সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এসেছেন।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরবে কাজ করতে যান যেসব বাংলাদেশি নারী শ্রমিক, তারা প্রতারণা, নিয়মিত বেতন না পাওয়া, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ও ভাষা সমস্যাসহ নানা ধরনের বিপদের শিকার হচ্ছেন। ফেরত আসা নারী শ্রমিকদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, যেসব বাড়িতে গৃহকর্মী পদে তাদের নিয়োগ করা হয় সেগুলো প্রায়ই যৌথ পরিবার। ফলে  সেখানে কাজের চাপ থাকে মাত্রারিক্ত। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে অধিকাংশ নারী শ্রমিকদের আরবি ভাষায় ন্যূনতম জ্ঞানও নেই। ফলে গৃহকর্তার সঙ্গে কথাবার্তার ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যা তৈরি হয়, প্রায়ই আকার ইঙ্গিতের সাহায্য নিতে হয় গৃতকর্মীদের। নির্যাতিত অনেক নারী অশিক্ষিত হওয়ার ফলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দায়েরও করতে পারেন না।

জানা যায়, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠায় না। ২০১১ সালে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দেয় ফিলিপাইন। দেশটির সংসদীয় প্রতিনিধি দলে তদন্তে প্রকাশ পায়, দেশটিতে প্রবাসী নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কাও দেশটিতে নারী পাঠায় না। জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রচুর দক্ষ নারী শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। এগুলো হলো- নার্স, আয়া, শিশু পরিচর্যাকারী, রিসিপসনিস্ট, ক্যাশিয়ার, বিউটিশিয়ান, হাসপাতাল ও শপিংমলের কর্মী ইত্যাদি। তাছাড়া, দক্ষ ও আধাদক্ষ শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও বেশি। দক্ষ ও শিক্ষিত নারীদের বিদেশে পাঠানো গেলে তারা মর্যাদার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন।

বিদেশে নতুন শ্রম বাজার অনুসন্ধান, শ্রম শক্তি রফতানিতে অনিয়ম, দুর্নীতি দূর করার জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রবাসীদের নারী শ্রমিকদের নানা দুঃখ-দুর্দশা, অভিযোগ এবং সমস্যাবলির প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। তাদের জন্য সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করতে হবে এবং বিভিন্ন বিষয়ে অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিরূপে গড়ে তুলতে হবে। এ খাতের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নারীদের নিরাপত্তার জন্য বিদেশি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় শর্তাবলি আরোপ করে চুক্তি সম্পাদন করতে হবে।