সারাদেশে বিভিন্ন সময়ে বইমেলা হলেও বা বইমেলার কথা শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলার ছবি। স্বাধীন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী যত মেলা আছে, তার মধ্যে বইমেলা অন্যতম।
এই মেলার ইতিহাস স্বাধীন বাংলাদেশের মতোই প্রাচীন। ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ ভাষার মাসে শুরু হয় এ বইমেলা। আর প্রকাশকদের ব্যস্ততা শুরু হয় ডিসেম্বর মাস থেকেই।
কিন্তু কোভিড-১৯-এর কারণে শঙ্কা ছিল বই মেলা হবে কি না? তবে গতবার করোনার ভেতরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বেশ উৎসবমুখর পরিবেশে মেলা হয়েছিল। বইমেলার সময় করোনার প্রাণঘাতী নতুন ধরন ওমিক্রনের তাণ্ডব দেখা দিয়েছে।
বইমেলার আগে করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন বেড়ে যাওয়ায় বইমেলা নিয়ে চিন্তিত লেখক-প্রকাশকেরা। তবে বইমেলা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ফের বেড়ে যাওয়ায় দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে অমর একুশে বইমেলা। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে এবারের বইমেলা।
বইমেলা নিয়ে তরুণ লেখকদের অভিমত জানতে তাদের সঙ্গে কথা বলেন ফিচার লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী সাজেদুর আবেদীন শান্ত।
লেখক ও নাট্যকার প্রিন্স আশরাফ বলেন, ‘বইমেলা মানেই প্রাণের মেলা। পৃথিবীতে হরেক রকমের মেলা হয়, তার মধ্যে শুধু বই নিয়ে যে মেলা হয়, আমার মতে সেই মেলা সর্বোৎকৃষ্ট। বইয়ের পাতায় পাতায় ধারণ করে জ্ঞান। আর মানুষ হিসেবে জ্ঞানই আমাদের পার্থক্য গড়ে দেয়। প্রাণের মেলা বইমেলায় লেখক, প্রকাশক, কবি সাহিত্যিকরা প্রাণ খুঁজে পায়। গতবারের অমর একুশে বইমেলা করোনার ঊর্ধ্বগতির কারণে অস্বস্তির মধ্যে কেটেছে। এ বছরও করোনা সংক্রমের ঊর্ধ্বগতির আশঙ্কায় বইমেলা আবারও অস্বস্তির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। আশা করি, সব আশঙ্কা আর অস্বস্তিকে হটিয়ে দিয়ে এবারের বইমেলা প্রাণ ফিরে পাবে। পরিণত হবে লেখক পাঠক প্রকাশকের মিলনমেলায়।’
কবি ও লেখক নাজনীন মোসাব্বের বলেন, ‘করোনার কারণে গত বইমেলা ভালোভাবে হয়নি। হলেও মনে সংশয় ছিল। কিন্তু এবার করোনার প্রকোপ কমাতে কিছুটা আশা ছিল যে প্রাণ জাগবে বইমেলার। তবে বিধিবাম, আবারও করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্টের প্রকোপ। তবে আশা করছি এবারের বইমেলা ভালোভাবেই হবে। করোনার প্রকোপ কমে যাবে বইমেলার আগেই। সবার প্রাণের বইমেলা আমাদের হতাশ করবে না। পাঠকরা অত্যন্ত সচেতনভাবে বইমেলায় প্রবেশ করবেন। নিজে ও অন্যদের এ ব্যাপারে সহযোগিতা করবেন। তাহলেই বইমেলা তার ঐতিহ্য ফিরে পাবে।’
কবি মনদীপ ঘরাই বলেন, ‘ছেলেবেলায় বইমেলাটাকে বিশাল মনে হতো। হারিয়ে যাওয়ার মতো বিশাল। নতুন বই হাতে ফিরতাম মহা-আনন্দে। সময় পার হয়েছে। বড় হয়েছি। এখন আর হারিয়ে যাওয়ার ভয় পাই না। শুধু মন হারাই নতুন বইয়ের মিছিলে। অতিমারির ঘোলাজলে বদলে গেছে বইমেলার ধরন। শুধু বদলাইনি আমরা। সুযোগ পেলেই মলাটবদ্ধ বইয়ের টানে ছুটে যাবো বইমেলার চেনা আঙিনায়। তবে প্রাণঘাতী ওমিক্রন চোখ রাঙাচ্ছেন। আশাকরি ঘাতক ওমিক্রনের প্রকোপ কমে যাবে, আমাদের প্রাণের বইমেলা আবার উৎসব মুখর পরিবেশে ফিরতে শুরু করবে।’
থ্রিলার লেখক মালিহা তাবাসসুম বলেন, ‘২০২০ এর মার্চ থেকে করোনায় পুরো বিশ্ব স্থবির হয়ে গিয়েছে চোখের পলকে। একজন লেখক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের কর্মী হিসেবে জীবন থেকে করোনায় কেড়ে নেওয়া দুটো বছরে পাওয়ার থেকে না পাওয়ার ফিরিস্তিই অনিঃশেষ। তবু একুশের শেষার্ধে করোনার সংক্রমণ কমে যাওয়ায় আশায় বুক বেঁধেছে লেখক-প্রকাশক ও পাঠক। মলাটবাঁধা ভালোবাসা পাঠকের হাতে তুলে দিতে লেখক হিসেবে আমিও উৎসুক হয়ে ছিলাম। তবে করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন থাবা বসিয়েছে। শেষ মুহূর্তে একটাই আশা, যেন ওমিক্রনের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রিত হয়, প্রাণের মেলায় আবার যেতে পারি নতুন রূপে। বইমেলার আয়োজন করা হলে সকল পাঠক, শুভানুধ্যায়ীদের যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে মেলায় আসার আহ্বান রইলো।’
লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী মো. সাঈদ মাহাদী সেকেন্দার বলেন, ‘শিল্প,সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক মেলবন্ধন সৃষ্টিতে অমর একুশে বইমেলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাঙালির প্রাণের উৎসব বইমেলা। এবারের বইমেলা নিয়ে লেখক ও পাঠকের বাড়তি আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে গত বইমেলা সশরীরে হলেও লকডাউন পরিস্থিতি উৎসব মুখর পরিবেশে ভাটা তৈরি করে। এবার বাংলা একাডেমি কিংবা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মানুষের পদচারণা উৎসবমুখর আবহ নিয়ে আসবে বলে বিশ্বাস করি। বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা, সৃষ্টিশীলতা ও সাহিত্যচর্চার এই প্ল্যাটফর্ম আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করবে। সম্প্রীতির মেলবন্ধনে এগিয়ে যাবে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি। মেলায় কিশোর-যুবা-বৃদ্ধদের মেলবন্ধনে প্রাণচাঞ্চল্য বিরাজ করবে সে প্রত্যাশা রইলো। আশা করি, প্রাণের বইমেলা তার আপন মহিমায় পাঠকের তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম হবে।’
কাজী আরজিনা বলেন, ‘বইমেলা শব্দটি যেন বাঙালির প্রাণের স্পন্দে মিশে আছে। আমরা সবাই জানি বইমেলা প্রাণের উৎসব। বইমেলা আমার কাছে সর্বজনীন উৎসবও মনে হয়। এখানে বই লেখক বই পড়ুয়া দুই গ্রুপের একটা মিলনমেলা। ছোট ছোট শিশুরা বইয়ের পাতা দেখতে দেখতে নতুন একটা সুগন্ধ অনুভব করে। এই দৃশ্য সবাইকে মোহিত করে। পাঠকরা লেখকদের কাছে তাদের প্রগাঢ় অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম অথবা দেখার আয়োজন করে বইমেলাতে। বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক মানুষ আসেন। কেউ বইমেলা দেখতে কেউ প্রিয় লেখকের বই সংগ্রহ করতে, কেউ বা অবসর সময় কাটানোর জন্য এসে ঘুরে যায়।
কবি শব্দনীল বলেন, ‘একদিকে ওমিক্রন, অন্যদিকে প্রাণের গ্রন্থমেলা। মেলার মাঠে যে স্বাস্থ্যবিধির নিয়ম থাকবে, তা মেনে ঘুরে ঘুরে ভালো কিছু বই সংগ্রহ করার ইচ্ছা আছে। পাঠকদের একটা কথা বলতে চাই, আপনারা বইমেলার প্রাণ। সুনির্দিষ্ট লেখকের বই সংগ্রহ করতে মেলায় না এসে, ঘুরেঘুরে বই সংগ্রহ করুন। এতে নতুন যারা লিখছে, তাদের কিছু লেখা আপনাদের পছন্দ হতে পারে এবং একটি বই নিলে তরুণ সাহিত্যিকরা আরও ভালো কিছু করার উৎসাহ পাবে।’
লেখক আহমেদ শিমু বলেন, ‘গতবার করোনা সংক্রমণে পণ্ড হয়ে গিয়েছিল এই মেলা। একজন লেখক হিসেবে চাই এবার সে রকম না হোক। জ্ঞানপিপাসু মানুষ ফিরে পাক তাদের প্রাণের উৎসব। কিন্তু কিছুদিন ধরে আবার করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যাচ্ছে বিষয়টি আমাকে ভাবাচ্ছে। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে বই মেলা হবে কি না, হলেও মেলার প্রাঙ্গণে পাঠকের সাড়া মিলবে কি না, এগুলো নিয়ে একটা ভাবনা থেকেই যায়। তবে যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে, তাহলে আমি চাই, আবার মেতে উঠুক মেলার প্রাণকেন্দ্র। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবাই মেলায় আসুক।’
প্রসঙ্গত, বাঙালির প্রাণের বইমেলার জন্য বাংলা একাডেমি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। একাডেমি প্রাঙ্গন ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে অবকাঠামো তৈরির প্রস্তুতি চলছে।