আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম হাতিয়ার শিক্ষা। জনগণকে শিক্ষিত করে তোলা রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কারণ শিক্ষা ও শিক্ষার্থীরাই দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু শিক্ষা অর্জনের জন্য যেমন পরিবেশের প্রয়োজন তা আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেই বললেই চলে। যে শিক্ষার্থীরা আগামীতে দেশ পরিচালনা করবে তারা শিক্ষা, গবেষণামুখী পরিবেশ ও পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
সাম্প্রতিক বা প্রায়শই ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মৌলিক যে চাহিদাগুলো রয়েছে তা বেশির ভাগ সময়ই ঘাটতি থেকে যায়। যে ঘাটতি বা অধিকার আদায়ের জন্য শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে প্রায়শই তাদেরকে অবস্হান করতে হয় আন্দোলনের মাঠে। এবং দিনশেষে বাবা-মায়ের মেধাবী সোনার সন্তানদের ফিরে আসতে হচ্ছে পুলিশের লাঠিপেটায় রক্তাক্ত হয়ে। অথচ যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্হান হওয়ার কথা ছিল, সেই ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের রক্ত ঝরায়। আর যে প্রশাসনের শিক্ষার্থীদের সুবিধা অসুবিধার দেখভাল করার দায়িত্ব ছিল সেই প্রশাসনই শিক্ষার্থীর ওপর বর্বর হামলা করছে।
সম্প্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী রক্তাক্ত হয়েছেন। এমনটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন কোনো ঘটনা বা অবাক হওয়ার বিষয় না। কারণ এ রকম বহু ঘটনা অহরহ ঘটেই চলেছে।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা আসলে কোথায়? নিরাপত্তা চেয়ে বারবার আন্দোলনে নামতে বাধ্য হলেও কোথাও নিরাপত্তা মেলেনি। হয় পুলিশ না হয় ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের কর্মীদের দ্বারা শিক্ষার্থীদের মুখ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কথিত আছে বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তচর্চার উন্মুক্ত স্হান, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একযোগে জ্ঞানার্জন করে। অথচ সে সব তথাকথিত শিক্ষকের দ্বারাও হয়রানির শিকার হতে হয় শিক্ষার্থীর। মুখ খুললেই একাডেমিক ফল বিপর্যয়ের ভয় ভীতি দেখিয়ে দমিয়ে রাখা হয় তাদের।
মুক্তচর্চা দূরে থাক, বাধ্য হয়ে অত্যাচার সহ্য করে কোনো রকমে সার্টিফিকেট নিয়ে বিশ্ববদ্যালয়ের গন্ডি পেরোতে পারলেই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচা যায়। রাস্তাঘাটে বাজে নজর, ইভটিজিং, ধর্ষণ, সমাজের মানুষের কটু মন্তব্য এগুলো যেন অতি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে কখন যে বেপরোয়া গাড়ির চাপায় লাশ হয়ে বাড়িতে ফিরতে হবে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। রাস্তায় বের হওয়া মানেই প্রাণ হাতে বের হওয়া। আর গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া নিয়ে চালক হেলপারের সঙ্গে তর্কযুদ্ধ যেন নিত্যদিনের সঙ্গী।
শিক্ষার্থীদের চলার পথে এত শত যুদ্ধের পর দিনশেষে হাতে বই নিয়ে টেবিল পর্যন্ত পৌঁছাতেই যেন হাঁপিয়ে যেতে হয় তাদের। শিক্ষা যদি হয় রাষ্ট্রের মৌলিক চাহিদা এবং দেশের এক তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী যদি শিক্ষার্থী হয়, তবে তাদের অধিকার ও জীবনবাজি রেখে কেন বারবার আন্দোলনের মাঠে নামতে হয়? সরকার যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতি বছর মোটা অংকের বাজেট দেয় তার সিংহভাগ শিক্ষক, কর্মকর্তাদের বেতনে চলে যায়। শিক্ষার্থীদের স্বার্থের জন্য তাদের নিয়োগ হলেও তারা তাদের কাজে কতটুকু দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন? আমরা জানি, রাষ্ট্রের প্রতিটি দাপ্তরিক কাজের জন্য আলাদা আলাদা কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ প্রশাসনে উপাচার্য রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্হিতি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রক্টোরিয়াল বডি রয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের সুযোগসুবিধা পর্যবেক্ষণের জন্য ছাত্র-উপদেষ্টা রয়েছেন। শিক্ষার্থীদের নিজেদের অধিকার অর্জনের জন্য যদি আন্দোলনেই নামতে হবে, তাহলে তথাকথিত সে সব দায়িত্বশীল পদে থাকা কর্তাব্যক্তিদের কাজ কি?
স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়েও দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন বেহাল দশা আসলেই উদ্বেগের বিষয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাকি সব কিছু প্রগতিশীল হচ্ছে অথচ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দিন দিন অধঃপতন হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর সঙ্গে লড়াই করে গুটিকয়েক শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়। অথচ সারা জীবনের অর্জন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর উচ্চাকাঙ্ক্ষা তো দূরের বিষয় এখানে এসে হতাশায় ডুব দিতে হয় বেশির ভাগকে। কারণ প্রতিষ্ঠানের মূল ফোকাস শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক নয়। শিক্ষক রাজনীতি, ছাত্র রাজনীতি এবং কীভাবে ক্ষমতা অর্জন করা যায় মূল ফোকাস সেদিকে। এখানে বাস্তবধর্মী ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে চিন্তাচেতনার জায়গা খুবই সংকীর্ণ। শিক্ষাকে কেন্দ্র করে যদি কোনো প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়, সেখানে শিক্ষার্থীরা ঐ প্রতিষ্ঠানের মৌলিক উপাদান এবং বাকি সবকিছু ঐচ্ছিক। তাই তাদের সুযোগসুবিধার সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে।
যে কোনো দাবি যৌক্তিক হলে অনতিবিলম্বে তা নিশ্চিতের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত জ্ঞানচর্চার অভয়ারণ্য করে তুলতে হবে। ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে বৈষম্য কাটিয়ে বন্ধুভাবাপন্ন সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক যে কোনো সিদ্ধান্েত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যেন সাংঘর্ষিক না হয়, সেদিকে প্রশাসনেরই নজর দিতে হবে। প্রশাসনিক দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তারা যেন তাদের দায়িত্বের প্রতি আরো যত্নশীল হন। নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে যেন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া