শিশিরভেজা তাজা সবজিগুলো কুয়াশার চাদর ভেদ করে শীতের প্রভাতি সোনালি রোদে ঝিলমিল করে ওঠে। আর বর্ষায় খেতগুলো সবুজে ভরে ওঠে। এভাবেই একই জমিতে বছরব্যাপী সবজি চাষ করে নিজেদের স্বনির্ভর করে তুলেছেন সাতক্ষীরার কৃষকরা। সেই সঙ্গে ঘেরের মাছ চাষ এগিয়ে দিয়েছে তাদের।
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ভাড়াসিমলা ইউনিয়নে দিগন্ত জোড়া মাছের ঘেরগুলোর আইলে শোভা পাচ্ছে এসব সবজি। জমিতে সবজি ও মাছসহ বহুমুখী উৎপাদন করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।
মাছের ঘেরে শুষ্ক মৌসুমে চিংড়ি চাষ আর বর্ষায় মিষ্টি পানিতে সাদা মাছের চাষ কৃষকদের চাহিদা পূরণ করছে। খেতে সোলার প্যানেল বসিয়ে ডিপ ইরিগেশনের মাধ্যমে সবজি চারার গোড়ায় ফোটা ফোটা পানি ঝরছে। এতেই সজীব হয়ে উঠছে এ ফসল। কৃষি বিভাগের সহায়তায় মাছের ঘেরের আইলে বছরব্যাপী সবজি চাষই নয় শুধু, কৃষাণিরা পচনশীল ও বাজারমূল্য কমে যাওয়া টম্যাটো, কুল, বরই, তরমুজ, জলপাই এবং পেয়ারা দিয়ে নানা ধরনের আচার ও জেলি তৈরি করছেন। এভাবে একই জমি বহুমাত্রিক ব্যবহার করে ভাড়াসিমলার কৃষকরা তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে নিয়েছেন। কৃষকরা বলছেন, তাদের সবজি পানিসাশ্রয়ী এবং কীটনাশক ব্যবহার না করায় তা বিষমুক্ত। ভাড়াসিমলার ১০০ বিঘা আয়তনের একটি মাছের ঘেরের আইলে সবজি চাষ করেছেন ৩০ জন কৃষক। এছাড়া ৫০ জন কৃষাণি সবজি ও ফলের আচার, সস ও জেলি তৈরি করছেন।
সবজিচাষি জাকির হোসেন জানান, ১০০ বিঘা জমির এই ঘেরে আমরা ৩০ জন চাষি লবণাক্ত ও মিষ্টি পানির মাছের চাষ ছাড়াও বর্ষা ও শীত মৌসুমে আইলে সবজি চাষ করে আসছি। কৃষক আবুল হোসেন জানান, লবণাক্ততার কারণে বছরের তিন মাস কিছু হয় না। জলাবদ্ধতার কারণে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। তাই ঘেরের আইলের ওপর সবজি চাষ করি। আমরা শত বিঘা জমির এই ঘেরকে মাছ ও সবজি উত্পাদনে ভরে দিতে চাই। তবে পানি নিষ্কাশনের জন্য সিঅ্যান্ডবি খাল খনন দরকার।
কৃষাণি সুফিয়া খাতুন খুশী জানান, আমরা ৫০ জন কৃষাণি ফলের আচার, জেলি ও সস তৈরি করি। যেসব ফল পচনশীল ও বাজারে দাম কমে যায় সেগুলো নষ্ট না করে আমরা কাজে লাগাই।
ড. আরিফুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বেনেরপোতা, সাতক্ষীরা জানান, সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ চাষ হচ্ছে বছরব্যাপী। সবজির গোড়ায় ঝাঝরি কায়দায় ফোটা ফোটা পানির সেচ দেওয়া হয়। মাছ ও সবজি বিষমুক্ত থাকে। তিনি আরো জানান, ১০০ বিঘা ঘেরের চারদিকে প্রায় ১০ বিঘা আইল রয়েছে। এই আইল উৎপাদন কাজে ব্যবহারে আমরা সবসময় সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।
ড. এম এ রউফ, অতিরিক্ত সচিব কৃষি মন্ত্রণালয় জানান, আইলের পতিত জমিতে এই সবজি চাষ বছরব্যাপী। এটা পানিসাশ্রয়ী। সম্পূর্ণ জৈব সার প্রয়োগ করে চাষ করায় আইলের সবজি বিষমুক্ত। এই উদ্যোগকে আরো ছড়িয়ে দেওয়া দরকার।