শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে করোনার থাবা ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ 

প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও চীনের উহান প্রদেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা কমছে না। ভাইরাসটির একের পর এক জিনগতপরিবর্তনের জন্য বিজ্ঞানী ও গবেষকদের নতুন নতুন টিকা উদ্ভাবনও ফলপ্রসূ হচ্ছে না। বিশ্ব জুড়ে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশেও করোনা সংক্রমণ বিস্তার রোধে সরকার ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় দফায় দফায় ছুটি বেড়ে ১৭ মাস স্থায়ী হয়।

দীর্ঘ এ সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা অনলাইন ও টেলিভিশননির্ভর হয়ে পড়েছিল। ডিজিটাল এ শিক্ষাব্যবস্থায় ডিভাইসের অপ্রতুলতা, ইন্টারনেটের সংযোগে ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় সব শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়নি। উপরন্তু ঘরবন্দি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়তে থাকে হতাশা, উৎকণ্ঠা ও অনলাইন আসক্তি। এমনকি বিষণ্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে যায় বহু গুণ। অতঃপর দীর্ঘ অপেক্ষার পালাবদল শেষে গত ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১ থেকে শিক্ষার্থীদের সশরীর উপস্থিতিতে শুরু হয় শ্রেণিপাঠদান। এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের ফুল ও চকলেট দিয়ে বরণ করে নেয়। নতুন প্রত্যয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দেয় শিক্ষার্থীরা। তাদের কলরবে প্রাণ ফিরে পায় শিক্ষাঙ্গন।

তবে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ছড়িয়ে পড়া করানোর নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনের সংক্রমণে আবারও আতঙ্কিত বিশ্ববাসী। ইতিমধ্যে বাংলাদেশেও করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংক্রমণের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ২১ জানুয়ারিতে আবারও সরকারি পরিপত্রের মাধ্যমে জানানো হয়, আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, এই দুই সপ্তাহ বন্ধ রাখার পর ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা কিংবা বন্ধ রাখার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

একই সঙ্গে স্থগিত হয়ে যায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের চলমান পরীক্ষাসমূহ। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ নিজস্ব সিদ্ধান্তে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার কথাই জানিয়েছে। এতে করে শিক্ষা খাত যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ। বিশেষ করে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে সেশনজটের সংকটে পড়েছে। এ বন্ধের কবলে পড়ে তা আরো দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্যও এ এক বড় বাধা। এছাড়াও আবার বন্ধের প্রভাবে প্রাথমিক, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরও বিষণ্ণ মানসিকতা আবার ফিরে আসতে পারে, বেড়ে যেতে পারে অনলাইন গেমিং আসক্তি।

তাই যতদ্রুত সম্ভব জনসচেতনতা বৃদ্ধি নিশ্চিতকরণ ও যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীসহ সব স্তরের জনগণের মধ্যে শতভাগ টিকা প্রদান নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনাকে ত্বরান্বিত করতে হবে। কেননা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে সুন্দর পরিবেশ যেমন সামাজিকীকরণে ভূমিকা রাখে, তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, আত্মশুদ্ধি, মূল্যবোধ ও মনোজগৎকে বিকশিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এছাড়াও, সার্বজনীন শিক্ষাকে কার্যকরী করে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সশরীর শ্রেণিপাঠদানের কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়