মানবশিশু বিশ্বের এক অপার সম্ভাবনার নাম। এই সম্ভাবনাকে বিকশিত করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা ও শিশু-উপযোগী পরিবেশ। কারণ শিশুর সুষ্ঠু মনন বিকাশেই একটি জাতির সমৃদ্ধি নির্ভরশীল। সাধারণত শিশুর বিকাশ বলতে শিশুমনের উৎকর্ষ সাধনকেই বোঝায়। এই উৎকর্ষে অনেকগুলো বিষয় সম্পৃক্ত। এর মধ্যে শিশুর পারিবারিক পরিবেশ, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, নিয়মশৃঙ্খলা অন্তভুর্ক্ত হলেও শিক্ষার ভূমিকা সর্বাগ্রে। শিশুকে যোগ্য নাগরিক ও মননশীল মানুষে পরিণত করতে এবং সুপ্ত সম্ভাবনার বিকাশে শিক্ষার বিকল্প নেই। প্রতি দিনের যাপিত জীবনে নানা অমানবিকতা প্রত্যক্ষ হয় শৈশবের উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে। ফলে সমাজ অন্ধকারে আচ্ছন্ন হচ্ছে। মূল্যবোধের অবক্ষয় ও সামাজিক অস্হিরতা ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে অনিশ্চিত করছে। শিক্ষাবিদ থমসন মনে করেন, ‘শিক্ষা হলো শিশুর ওপর পরিবেশের প্রভাব, যে প্রভাবের দ্বারা শিশুর বাহ্যিক আচরণ, চিন্তাধারা এবং দৃষ্টিভঙ্গির স্থায়ী পরিবর্তন হয়।’ তাই পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থা শিশুমনন বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এই পরিকল্পনায় শিক্ষা হবে আনন্দময়।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও শিশুদের আনন্দময় শিক্ষার প্রতি জোর দিয়েছেন। তবে এই শিক্ষাকে অবশ্যই শিশুবান্ধব ও শিশু-উপযোগী হতে হবে। কারণ শিশুকালের শিক্ষাই এই প্রাগ্রসরের সূত্রপাত ঘটায়। শিশুর বিকাশকে পরিপূর্ণ করতে উপযুক্ত শিক্ষক, শিশুবোধক বই, শিশুবান্ধব পরিবেশ ও শিক্ষা উপকরণের ভূমিকা পরিপূরক উপাদান হিসেবে কাজ করে। শিক্ষায় শিশুকে আকৃষ্ট করে পঠনে অভ্যস্ত করতে এগুলো প্রধান সহায়ক। পঠনদক্ষতা শিশুকে শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী করে। তাই বিজ্ঞানে শিশুমনন বিকাশে শিশুশিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষা যদি যথাযথ ও উপযুক্ত না হয়, তাহলে এই বিকাশ ব্যাহত হবে। বর্তমান সরকারের শিক্ষাব্যবস্থায় সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে শিশুশিক্ষা। সরকার বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা আরম্ভের আগে ছয় বছরের কম বয়সি শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছে। খেলাধুলা ও আনন্দের মধ্য দিয়ে শিশুদের অক্ষরজ্ঞান ও গণনার হাতেখড়ি দেওয়াই এ ব্যবস্থার লক্ষ্য। সাধারণত দুই বা আড়াই বছর থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত এই শিক্ষার সময় বিস্তৃত। এই প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাস্তরটি শিশুদের দৈহিক ও বৌদ্ধিক বিকাশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মস্তিষ্কের অর্ধেক গঠিত হয় জন্মের ছয় মাসের মধ্যে এবং ৯০ শতাংশ তৈরি হয় আট বছরের মধ্যে। এ সম্পর্কে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ম. হাবিবুর রহমান উল্লেখ করেন, ‘শিশুরা স্কুলে ভর্তির অনেক অগেই তাদের মধ্যে শিক্ষার সুনির্দিষ্ট আদল গড়ে ওঠে। তারা ভাষাগত, বোধজাত ও সামাজিক দক্ষতাগুলো প্রাক-শৈশবেই অর্জন করে। আর এসবের ওপরই নির্মিত হয় শিশুর জীবনভর শিখনের মূল ভিত।’
জানতে শেখা, করতে শেখা, বাঁচতে শেখা ও মিলেমিশে বাস করতে শেখা—এই চারটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে মানুষ জীবনভর শিক্ষা গ্রহণ করে। শিশুও এর ব্যতিক্রম নয়। জীবনের প্রতিটি ধাপ থেকে সে শিখতে শুরু করে। এই শিক্ষায় গড়ে ওঠে শিশুর ব্যক্তিত্ব, জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গি। শিশু তার অসাধারণ কল্পনাশক্তির কারণে পারে উন্মুক্ত চিন্তা ও নিঃসংকোচে প্রশ্ন করতে। শিশুর এই সহজাত প্রবণতাকে প্রসারিত করে শিক্ষা। উপযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে যদি কল্পনাশক্তির বিকাশ না হয়, তাহলে তার চিন্তাশক্তি স্তিমিত হয়।
শিশুর নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কাজ চলতে থাকলে শিশুর মনে ক্রোধের সৃষ্টি হয়। নিয়মানুবর্তিতা এবং শৃঙ্খলা শেখাতে গিয়ে যদি তাদের মনোভাবের গুরুত্ব না দিয়ে তাদের ওপর পড়া ও বিভিন্ন ধরনের কাজ চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তারা সবকিছু থেকে আগ্রহ ও মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। এতে সে ধীরে ধীরে অমনোযোগী ছাত্রে পরিণত হয়। তাই শিশু যখন রাগ দেখিয়ে, অভিমান করে কিছু প্রত্যাশা করে, তখন বাবা-মা, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীকে সংবেদনশীলতা, বিবেচনা ও বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে শিশুকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখা প্রয়োজন। রুশো, ফ্রয়েবল, জন ডিউই প্রমুখ শিক্ষাদার্শনিক শিশুর সুপ্ত প্রতিভার পূর্ণ বিকাশের জন্য শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষাকে সমর্থন করেছেন। শিশুমনন বিকাশে শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষাকে যথাযথ বলা হয়, কারণ এখানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি না করে সহযোগিতার মনোভাব তৈরিতে উৎসাহিত করা হয়। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতার মনোভাবের মধ্যে শিশুরা বেড়ে উঠছে, ফলে তাদের মধ্যে হিংসা, স্বার্থপরতা, পরশ্রীকাতরতা, নিচতা ইত্যাদি অবাঞ্ছিত ও অসামাজিক প্রবৃত্তি প্রবল হয়ে উঠছে। অন্য দিকে সহযোগিতার মনোভাব তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও সংঘবদ্ধতা আনতে এবং সুষম স্বাস্থ্যময় ব্যক্তিসত্তা গঠনে সাহাঘ্য করবে। তাই সহযোগিতামূলক অংশগ্রহণ পদ্ধতি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তভুর্ক্ত করা প্রয়োজন।
বর্তমানে শিক্ষা নিয়ে নানারকম গবেষণা সংঘটিত হয়েছে। মনীষীরা নানাভাবে চিন্তা করেছেন ও শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যাগুলোকে উপস্থাপন করেছেন। বিভিন্ন শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের উদ্ভাবিত গবেষণার ফলে বর্তমানে শিক্ষার অনেক যুক্তিযুক্ত ও আধুনিক পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়েছে। মনোবিজ্ঞান, নীতিবিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ের আলোকে শিক্ষাকে বিন্যস্ত করা হয়েছে। আজ তাই শিক্ষাকে একটি উৎকৃষ্ট বিজ্ঞানে চিন্তা করা যায়। শুধু প্রয়োজন এর সঠিক বাস্তবায়ন। তাই বাংলাদেশের শিক্ষক, শিক্ষা পরিকল্পনাবিদ, শিক্ষাবিদ, শিক্ষাপ্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় নিযুক্ত ব্যক্তিসহ শিক্ষাবিষয়ক কর্মে নিয়োজিত সবাইকে শিশুশিক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
লেখক: গবেষক