বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন এবং বিএনপিসহ সরকারবিরোধী কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সমালোচনা-আপত্তির মধ্যেই সংসদে পাশ হলো নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের বহুল আলোচিত বিলটি। বৃহস্পতিবার (২৭ জানুয়ারি) সংসদে দীর্ঘ প্রায় তিন ঘণ্টা বিতর্কের পর কিছু সংশোধনীসহ ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২’ কণ্ঠভোটে পাশ হয়েছে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বিলটি পাশের জন্য উত্থাপন করলে দীর্ঘ প্রায় তিন ঘণ্টা বিতর্কের পর এটা সংসদে গৃহীত হয়। বিলটি পাশের পর সংসদে উপস্থিত থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে অভিনন্দন জানান।
কয়েক দিনের মধ্যেই সার্চ কমিটি
বিলটি সংসদে পাশের পর এখন রাষ্টÌপতি মো. আবদুল হামিদ তাতে সম্মতি দিলেই সেটি আইনে পরিণত হবে। ধারণা করা হচ্ছে, আজকালের মধ্যেই বিলটিতে রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করবেন, এরপর গেজেট প্রকাশ হবে। এই আইনের অধীনেই কয়েক দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করবেন। সার্চ কমিটির সুপারিশের পর দেশে প্রথম বারের মতো আইন অনুযায়ী নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করে দেবেন রাষ্ট্রপতি।
যেসব সংশোধনী গৃহীত
বিলের ওপর আনা কিছু সংশোধনী সংসদে গৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ছিল আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির করা সুপারিশ। বাকিগুলো হয়েছে গতকাল সংসদে কয়েক জন সংসদ সদস্যের আনা প্রস্তাবের ভিত্তিতে। বিলের শিরোনামেই পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাশের জন্য আইনমন্ত্রীর উত্থাপিত বিলের শিরোনাম ছিল, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২’। সংসদে সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে এখন নাম হবে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২’।
বিলে বলা ছিল, ‘রাষ্ট্রপতি ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করবেন।’ এর মধ্যে বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্য থেকে দুই জনকে মনোনয়ন দেবেন রাষ্ট্রপতি। এই দুই জনের মধ্যে একজন নারীকে রাখার প্রস্তাব দেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। তার প্রস্তাবটি গৃহীত ইসি গঠনে সার্চ কমিটি
হওয়ায় সার্চ কমিটিতে রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুই জন বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে বাধ্যতামূলক একজন নারীকে রাখার বিধান যুক্ত করা হয়েছে পাশ হওয়া বিলে। উত্থাপিত বিলে বলা ছিল, ‘সার্চ কমিটি ১০ কার্যদিবসের মধ্যে রাষ্ট্রপতির কাছে নাম প্রস্তাব করবে।’ এক্ষেত্রে সংশোধনী এনে ‘১৫ কার্যদিবস’ করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির করা দুটি সুপারিশও গৃহীত হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার শর্তে দুটি পরিবর্তন আনার সুপারিশ করে স্থায়ী কমিটির সভাপতি শহীদুজ্জামান সরকার বুধবার সংসদে বিলটির ওপর প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। সংসদে উত্থাপিত বিলে সিইসি ও কমিশনারদের যোগ্যতাসংক্রান্ত ধারায় বলা হয়েছিল, সিইসি ও কমিশনার হতে সরকারি, বিচার বিভাগীয়, আধা সরকারি বা বেসরকারি পদে নূন্যতম ২০ বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এই ধারায় সংশোধনী এনে সরকারি, বিচার বিভাগীয়, আধা সরকারি বা বেসরকারি পদের পাশাপাশি ‘স্বায়ত্তশাসিত ও পেশায়’? যুক্ত করার সুপারিশ করে স্থায়ী কমিটি। এছাড়া অযোগ্যতার ক্ষেত্রে বিলের ৬(ঘ) ধারায়ও স্হায়ী কমিটি কিছুটা পরিবর্তনের সুপারিশ করে। এ ধারায় বলা হয়েছিল, নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে নূন্যতম দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে সিইসি ও কমিশনার হওয়া যাবে না। এখানে দুই বছরের কারাদণ্ড উঠিয়ে শুধু ‘কারাদণ্ড’ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া বিলের ওপর বিভিন্ন শব্দ ও ছোটখাট কয়েকটি সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। সংসদ সদস্যদের ৬৪টি সংশোধনী প্রস্তাবের মধ্যে ২২টি আইনমন্ত্রী গ্রহণ করেন, যা সংসদে কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়। সংশোধনীগুলো গ্রহণের সময় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘এতগুলো সংশোধনী আগে কখনো গ্রহণ করা হয়নি।’ স্পিকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার অনেক দিন পর এমপিরা আমাকে পানি খাইয়ে দিয়েছেন।’
সার্চ কমিটি গঠন
পাশকৃত বিলে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করবেন। সিইসি ও কমিশনার হিসেবে নিয়োগের জন্য প্রতিটি পদের বিপরীতে দুই জন করে মোট ১০ জনের নাম প্রস্তাব করার জন্য একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করবেন রাষ্ট্রপতি। অনুসন্ধান কমিটির সভাপতি হবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। আর সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত হাইকোর্টের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুই জন বিশিষ্ট নাগরিক (যাদের মধ্যে একজন নারী থাকবেন)। সার্চ কমিটি রাজনৈতিক দল এবং পেশাজীবী সংগঠনের কাছ থেকে নাম আহ্বান করতে পারবে। কমিটির কাজে সাচিবিক সহায়তা দেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার হতে যোগ্যতা-অযোগ্যতা
পাশকৃত বিলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য তিনটি যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। সেগুলো হল—বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে, নূন্যতম বয়স হতে হবে ৫০ বছর এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি, আধা সরকারি, বিচার বিভাগীয়, বেসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত পদে বা পেশায় কমপক্ষে ২০ বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এসব যোগ্যতা থাকলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশনার হতে পারবেন।
প্রস্তাবিত আইনে সিইসি ও কমিশনার পদের জন্য ছয়টি অযোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো—আদালত অপ্রকৃতিস্হ ঘোষণা করলে, দেউলিয়া হওয়ার পর দায় থেকে অব্যাহতি না পেলে, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিলে কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করলে, নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইবু্ন্যালস) অ্যাক্ট-১৯৭৩ বা বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইবু্ন্যালস) অর্ডার-১৯৭২-এর অধীনে কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হলে এবং আইনের দ্বারা পদাধিকারীকে অযোগ্য ঘোষণা করছে না, এমন পদ ব্যতীত প্রজাতন্ত্রের কর্মে লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকলে। এমন অযোগ্যতাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি সিইসি বা নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না।
রাষ্ট্রপতি আইনের বিষয়ে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন, আমরা তড়িঘড়ি করিনি: আইনমন্ত্রী
বিলটি পাশের সময় জাপা ও বিএনপির সংসদ সদস্যরা অভিযোগ করেন, খসড়া আইনটি ‘তড়িঘড়ি করে’ আনা হয়েছে। এর জবাবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘গত ১৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ করে। যারা সংলাপে যায়নি এবং গিয়েছেন তারা সবাই আইনের কথা বলেছেন। রাষ্ট্রপতি আইনের বিষয়ে তার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। আমরা তড়িঘড়ি করিনি।’
পাশকৃত বিলে কাউকে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়নি জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, এই আইনে লিগ্যাল কাভারেজ দেওয়া হয়েছে। এই আইনের মধ্যে কেউ অন্যায় করে থাকলে তাকে প্রটেকশন দেওয়া হয়নি।
বিএনপি আইন নয়, সরকারের উৎখাত চায়: মেনন
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, বিএনপি আইন নয়, সরকারের উৎখাত চায়। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে লাভ নেই। নির্বাচন কমিশন গঠনে তিনি একটি সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। এছাড়া সার্চ কমিটি যে নামগুলো দেবে সেগুলো সংসদের কার্য-উপদেষ্টা কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দেন। এছাড়া অনুসন্ধান কমিটি যে নামগুলো প্রস্তাব করবে সেগুলো অন্তত প্রকাশ করা এবং এরপর জনমত বিবেচনা করে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন, এই ব্যবস্থা করারও দাবি জানান।
বিএনপি একটি অস্বাভাবিক সরকার আনতে চায়: ইনু
সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, বিএনপি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তারা একটি অস্বাভাবিক সরকার আনতে চায়। তাদের এমপিরা এখানে সংশোধনী প্রস্তাব দিলেও বিএনপি নেতারা ইতিমধ্যে নির্বাচন বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছেন। নির্বাচনের আগেই তারা এ সরকারকে উৎখাত করতে চায়।
পরস্পরের প্রতি আস্থা না থাকলে আইন করে লাভ নেই: ফিরোজ রশীদ
জাপার কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, অনেক আইন বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, ১৫ পৃষ্ঠার আইন মাত্র ১৫ মিনিট লাগল করতে। এখন আনার পর এত তাড়াহুড়া করে আনা হলো একথা ঠিক না। আইন করে কিছু হবে না, যতদিন পর্যন্ত একে অপরের প্রতি বিশ্বাস বা আস্থা না স্থাপন করতে পারব, ততদিন পর্যন্ত আইন করে কিছু হবে না।
আইন প্রণয়নের নামে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রহসন করেছে: হারুনুর রশীদ
বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, আইনের ব্যাপারে জনগণের ধারণা একেবারে সুস্পষ্ট যে, সরকার আইন প্রণয়নের নামে জনগণের সঙ্গে প্রহসন করছে। কোনো সন্দেহ নাই যে, আইনটির সঙ্গে ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারি যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিলেন সেটির সঙ্গে খুব একটা অমিল নেই। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটি করে লাভ হবে না। অবশ্যই আইনটি সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জনগণের দাবি হচ্ছে—নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে।
আইনটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক: ফখরুল ইমাম
জাপার ফখরুল ইমাম বলেন, সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট লেখা আছে—রাষ্ট্রপতি মাত্র দুই জন ব্যক্তিকে নিয়োগ করতে পারেন। এক জন হলেন প্রধানমন্ত্রী, আরেক জন প্রধান বিচারপতি। এখন আসছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে কে নিয়োগ করবেন? সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে আইন তৈরি করবেন; কিন্তু ওখানে বলেন নাই সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অতিক্রম করে আইন তৈরি করবেন।
ইসি সম্পূর্ণ আমলানির্ভর: চুন্নু
জাপার মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু সাবেক সিইসি শামসুল হুদার সমালোচনা করে বলেন, ইসি সম্পূর্ণ আমলানির্ভর। আমলারা এরশাদ, বিএনপি, আওয়ামী লীগ—সব সরকারের আমলে আরামে চাকরি করেছেন, পরে চাকরি শেষে আবার পাঁচ বছরের জন্য সিইসি হয়েছেন। তারা ওপরেরটা খান, নিচেরটাও খান।
এখন সব নির্বাচন মাগুরার চেয়ে বেশি খারাপ: রুমিন ফারহানা
বিএনপির ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, আওয়ামী লীগও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্য আন্দোলন করেছিল। তখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি ছিল। এখন সে ঘাটতি আরো অনেক বেড়েছে। জাতীয় থেকে স্থানীয়—সব নির্বাচন মাগুরার নির্বাচনের চেয়ে এখন অনেক খারাপ হয়। সুতরাং ৯৬ সালের চেয়ে এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আরো বেশি দরকার।
নির্বাচন কমিশন গঠনে আইনের খসড়া গত ১৭ জানুয়ারি অনুমোদন দেয় মন্ত্রীসভা। এরপর ২৩ জানুয়ারি আইনমন্ত্রী ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২’ সংসদে উত্থাপন করেন। সবমিলিয়ে ১০ দিনের মধ্যে বিলটি পাশের প্রক্রিয়া শেষ হলো।