চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন

সুপার সিনিয়রদের স্বতন্ত্র থাকাটা জরুরি: চিত্রনায়ক উজ্জ্বল

বিশ্বের সকল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেই একটি সাংগঠনিক ঐক্য থাকে। শিল্পী, টেকনিশিয়ান ও ক্রুদের নিয়ে এক নীতিতে চলা এই গিল্ডের ঐক্য ইউরোপ, আমেরিকা বা ভারতের শোবিজে খুবই শক্তিশালী সংগঠন। আমাদের দেশের সংগঠনের ভেতরে পার্থক্য হলো, বাইরের দেশের সেইসব শক্তিশালী সংগঠনের খবর বা নেতৃত্বের পালাবদলটা গণমাধ্যমে আসে না বললেই চলে। কারণ তাদের কাছে চলচ্চিত্রটা মুখ্য, সংগঠন নয়। বাংলাদেশে গত প্রায় ১ দশকে চলচ্চিত্রের পরিবেশ, বাজার, বিপণন গৌণ হয়েছে। মুখ্য হয়েছে এর সাংগঠনিক তৎপরতা। পরিতাপের সঙ্গেই এটা বলতে হয় আজ।

সেই মুখ্য সাংগঠনিক তৎপরতায় এবারের শিল্পী সমিতির নির্বাচন যেন সারাদেশের অন্যতম আলোচ্য। এটা কী হওয়ার কথা ছিল! যেন রঙ মাখানো ইশতিহারের প্রতিযোগিতা। অথচ এই বাড়তি ক্লাইম্যাক্সের কোনো প্রয়োজন ছিল না। আজ ডিজিটাল মাধ্যমের কল্যাণ বা অকল্যাণে সারাবিশ্বে এসব ছড়িয়ে পড়ে। তাই শিল্পীদের এসব বিষয়েও সাবধান হওয়াটা জরুরি।

রাজ্জাক ভাইসহ আমরা এই শিল্পী সমিতি যখন গড়েছিলাম তখন উদ্দেশ্য ছিল আমাদের মিলনমেলা তৈরি করা। আমরা যেমন আড্ডা দিতে বিভিন্ন ক্লাবে যাই, শিল্পী সমিতিটাও তেমন একটি দারুণ ক্লাব ছিল। এরপর আমরা দেখলাম নায়িকারা নেই। তখন শাবানা, ববিতা, রোজিনা, সুচরিতা থেকে শুরু করে সকলকে ডাকলাম। তখন ওরাই প্রস্তাব দিল, অমুক মাসে আমি সবাইকে ডেকে খাওয়াবো। অমুক মাসে আরেকজন। অমুক মাসে সবাইকে খাওয়ানোর স্পন্সর হয়তো নতুন কেউ। তাতে কী হতো? একসঙ্গে একটা মিলনমেলা তৈরি হতো। পাশাপাশি সেই দাওয়াতেই নিজেদের চাওয়া-পাওয়া, সাংগঠনিক কথাবার্তাও হয়ে যেত। আর যে যেবার খাওয়ানোর সুযোগ পেত সে-ই সবচেয়ে তৃপ্তি পেত যে, আমি সবাইকে ডেকে খাওয়াতে পারলাম। এই সম্প্রীতির আনন্দটা এখন কই?

গত কয়েকবছর ধরে যেমন দেখি, নির্বাচনের আগেই নানা ক্লাইমেক্সে যে যার মতো কথা বলে যাচ্ছে? এগুলো কে কাকে শোনায়? আমি ছোট ভাইবোনদের বলি, এখন ডিজিটাল যুগ। ক্যামেরা তাক করলেই তোমরা কথা বইল না প্লিজ। এতেই বিভ্রান্তি ছড়ায়!

আমাকে এবারের নির্বাচনের অনুষ্ঠানে দুই পক্ষই ডেকেছে। আমি বলেছি, দেখো সুপার সিনিয়রদের একটা স্বতন্ত্র অবস্থানে না থাকলে তোমরা নিজেরা বিপদে পড়বা। কারণ তোমাদের ভেতরে একটা সংকট তৈরি হলে কার কাছে যাবে? তখন সমাধানের জন্য তো একজনকে প্রয়োজন হবে।

আর সবচেয়ে বড় কথা, আমরা শিল্পী-তারকা যাই বলি না কেন, আমাদের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই। প্রডিউসার-পরিচালকসহ টোটাল ইউনিটের সমন্বয়ে আমরা তৈরি হই। আর ইমেজ বা জনপ্রিয়তা দেয় আমাদের দর্শকরা। আমরা হলাম অলঙ্কার। সবচেয়ে আদরের জিনিস। তাই নিজেদের সিনেমায় নিজেদের ইমেজ করাটা জরুরি। কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছে, আমরা সিনেমার আলাপের চেয়ে নির্বাচনের আগে মিষ্টি মিস্টি কথার আশ্বাস দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছি।

এসব মেধাবী ছেলেমেয়েদের হাতে সিনেমা কম। টোটাল সিনেমা সংখ্যা বাড়লে তখন আর এই পারস্পরিক অনৈক্য তৈরি হবে না। এটা আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু আমরা একে অপরের সম্পর্কে ভালো-মন্দ কথা বলে এমন এক ইমেজে নিয়ে গিয়েছি, যা দুঃখজনক।

আমি তো মুরুব্বি হয়ে প্রত্যাশা করি, নির্বাচনের ফলাফলের পর একসঙ্গে দুইপক্ষের সবাইকে নিয়ে কফি খাবো। সেটা কী সম্ভব? সেই আশ্বাস কেউ আমাকে দিতে পারবে? কারণ নির্বাচনের আগেই তো একে অপরের সম্পর্কে বিদ্বেষ তৈরি হচ্ছে। ক্ষোভ ক্রোধ এমন এক জিনিস! হয়তো সামনা-সামনি বলবে না। কিন্তু সবাই যার যার মনে ক্ষোভটা পুষে রাখে। যে কোনো সময় দেবে তার প্রতি উত্তর। এই আচরণকে আমি শিল্পীসূলভ বলতে পারি না।

তাই এই ইন্ডাস্ট্রির একজন সুপার সিনিয়র হিসেবে খুব কষ্ট লাগে আমার। কারণ মাত্র ৪২৮ জন ভোটার। সকলেই শিল্পী। এখানে দু-পক্ষের এত শোডাউন করাটা কী খুব জরুরি?

তাই আজকের নির্বাচনে যাই হোক না কেন, যে-ই আসুক, তারা যেন পরস্পরের এই ক্রোধটাকে প্রশমন করেন। এটা সবচেয়ে জরুরি। এরপর আমাদের সেই আগের নিয়মে ফিরতে পারো তোমরা। অর্থাৎ এই মাসে হয়তো এই পক্ষের একজন সবাইকে দাওয়াত করে খাওয়াবে। অপর মাসে আরেকজন। অন্যকে আলিঙ্গন করে ভালোবাসার আনন্দটা তো শিল্পীরাই সকলকে দেখাবে। কারণ আমাদের তো সকলে অনুকরণ করে বলেই আমরা আজ তারকা। আমরা যেন নিজেদের সেই সত্তা না ভুলে যাই!

লেখক :কিংবদন্তী চলচ্চিত্র অভিনেতা