শীতের গ্রাম যেন এক অপূর্ব অমরাবতী

শহর লাগোয়া গ্রামে স্কুল-কলেজ পেরিয়ে দেশের রাজধানী কসমোপলিটন নগর ঢাকার পরিবেশে আজ শুধু কৃত্রিমতাই যাপিত জীবনের অনুষঙ্গ। বিজলিবাতি কিংবা লোডশেডিংয়ে ব্যাটারিচালিত বাতির সুযোগে গ্রামজীবনে বেঁচে থাকার পরম আশ্চর্যসুন্দর উপলক্ষ্য আজ সোনার হরিণ।

আমরা যারা মফস্বল থেকে ঢাকায় এসেছি শৈশব-কৈশোরের গ্রাম যেন তাদের কাছে ‘বিনি সুতোয় গাঁথা এক মালা’। শৈশবে-ফেলে-আসা কীর্তনখোলা নদী, সাগরদি গ্রাম পেরিয়ে বাজারঘেঁষা সর্পিল গতিতে বয়ে-যাওয়া সরু খাল আর নানাবাড়ির পরিমণ্ডলে বেড়ে-ওঠা শরিকি-বাগানে নানা গাছ-লতা-গুল্ম-পাখি আমাদের গ্রামমুখী করে তোলে। গ্রামে দুধসাদা জ্যোত্স্নায় কিংবা কাজলকালো অমাবস্যায় প্রকৃতির মাঝে লীন হওয়ার স্মৃতি বড়ই মধুর।

গ্রামের আর্কিটাইপ ঝিঁঝিঁপোকা, গাব-কুল-জামরুল-লটকনের মতো দেশিফল, জবা-টগর-হাস্নাহেনার মতো গার্হস্থফুল, দোয়েল-চড়ুই-টিয়া-কবুতরের কলতান নিয়ে যায় এক দূর অমরবতীতে। গ্রামের বাড়িতে শীতের কাঁচাসোনা রোদে মাটির চুলোয় মায়ের পরম মমতায় তৈরি পাটিসাপটা, কুলি, চিতই বা চৈ পিঠা খাওয়া। বড় বাড়ির যৌথ উঠোনে অসমবয়সি ভাইবোন মিলে দৈনিক পত্রিকা পড়া; সঙ্গে টক-ঝাল-মিষ্টি পরচর্চা; দুপুরে ইট-বাঁধানো ঘাটে সমবয়সিদের রোদমাখা আড্ডার পর ঘণ্টাখানেক পুকুরের পানিতে মাথা উঁচিয়ে আর শরীরের বাকি অংশ ডুবিয়ে কিংবা চিতসাঁতারে গোটা শরীরটাকে পানিতে বিছিয়ে দেয়ার মধুর স্মৃতি ‘সাত রাজার ধন’ বৈ আর কী!

শীতের রাতে ঘুম চুরি করে খুব সকালে উঠে সাগরদি গ্রামের পাড়াময় ঘুরে বেড়ানো। উদ্দেশ্য গাঁয়ের পরিচিত কারো বাড়ির খেজুররস চুরি; তারপর মাটির কলসিতে খেজুরের রসের বদলে কেবল পানি কিংবা মূত্র ত্যাগ—পরিচিত বা স্বজনের সঙ্গে এমন নির্মল মজা—কেবল ‘সবেধন নীলমনি’ গ্রামবাংলার বড়-হওয়া কিশোরবেলায়ই সম্ভব।

গ্রামে শীতের সকালে কুয়াশার রহস্যময়তার ভেতর দিয়ে মেঠোপথ কিংবা আলপথ ধরে হেঁটে বেড়ানোর স্মৃতি পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর নস্টালজিক অনুভূতির একটি। গ্রামের শস্যখেতে বেড়াতে-বেড়াতে অনিন্দ্যসুন্দর সরলতায় মনে হতে পারে—আকাশ বুঝি নেমে পড়েছে মাঠের ওপারে। কিছুটা এগোলে হয়তো আকাশ ছুঁতে পারব! গ্রামের দিগন্তবিস্তৃত মাঠে একলা বেড়াবার স্মৃতির অনুরণন দেখি নাগরিক কবি সাজ্জাদ আরেফিনের কবিতার চরণে—‘আমার কেবল আকাশ ছোঁয়ার কথা মনে পড়ে।’

নদীমাতৃক বাংলার গ্রামজীবনের আরেক স্মৃতি বৈঠাঅলা নৌকা। নাগরিক ঢাকার দূষিত বুড়িগঙ্গার বুকে যন্ত্রচালিত নৌকায় চড়ে কেবলই যন্ত্রণাবিদ্ধ হতে হয়। রাজধানীর বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলে বহুতল ভবনের উচ্চতায় ধান-নদী-খাল বরিশালের কীর্তনখোলায় ফেরার বাসনা ক্রমশ তীব্রতর হয়েছে।

আমাদের অস্তিত্বের শেকড় গ্রামেই সুগভীরভাবে প্রোথিত। তাই গ্রাম বেলা-অবেলা-সারা বেলা কারণে-অকারণে নানা বাহানায় কেবলই ডাকে। অদৃশ্যে থেকেও গ্রাম তাই আমাদের অস্তিত্বে সদাজাগ্রত।