নেক্রাফাইল 

—এই যতন ওঠ।
অনেকটা ঠেলা দিয়ে যতনকে ডাকল রতন ভক্ত। তবু কোনো হেলদোল নেই যতনের। কাঠের টেবিলটার ওপর ভাঁজ করা হাতে মাথা এলিয়ে বসে বসেই ঘুমায় যতন। নাক ডাকার শব্দও শোনা যায়। চেয়ারের নিচে একটা কয়েল জ্বলে। সেখান থেকে নাকে আসে ধোঁয়ার ঝাঁজালো গন্ধ। যতনের তাতে কোনো বিকার নেই। থাকবেই-বা কেমন করে? সেই সন্ধ্যা থেকে একনাগাড়ে বাংলা টেনে টেনে এখন বুঁদ হয়ে পড়ে আছে সে। সে কি আর এই জগতে আছে? তবু তার পাছায় একটা লাথি কষাল রতন।

—কিরে খানকির পোলা, এখনো উঠস নাই? বাইরে লাশ আসছে।

যতন আপন ছোটভাই হলেও এসব গালি রতন প্রকাশ্যেই দেয়। তাতে গালি কার ওপর গিয়ে পড়ল, সেই হিসেব সে কখনো করে না।

লাথি খেয়ে মুখ দিয়ে কেবল হুমমম শব্দ করে যতন। মাথাটা কনুইয়ের সীমানা থেকে তুলে ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করে। কাটা মাথার মতো দপ করে পড়ে যায় আবার আগের জায়গায়।

ঢাকায় আকাশে তখন রাত পৌনে দুইটা। তবে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যালের এই মর্গের সামনের রাত যেন তার চেয়েও গাঢ় ও গভীর ঘুমে ডুবে আছে। প্রতিদিন এখানে রাত এসে অদ্ভুত রহস্যময় হয়ে ঘূর্ণি খায়। কালো জামার ওপর গাঢ় বোরকা জড়িয়ে নেয়। পিঁপড়ার হেঁটে চলার শব্দও যেন ঠকঠক করে কানে বাজে। পাতা ঝরার শব্দকে মনে হয় বোমার আওয়াজ।

মর্গের বাইরে একটা রিকশাভ্যান। তার ওপরে শোয়ানো একটা লাশ। সস্তা বিছানার চাদর দিয়ে সেটি মোড়ানো। সাব ইন্সপেক্টর মানিকের মোবাইলটি বেজে ওঠে।

—স্যার। লাশ নিয়ে এসেছি স্যার। ওকে স্যার।

এর বেশি মানিককে আর কিছু বলতে শোনা যায় না। কথা বলে শেষে জোর গলায় জীবনকে ডাকে মানিক: কী রে, কাজ হলো?

সঙ্গে থাকা হাবিলদার সুরুজকে চোখ ইশারায় রতনকে তাড়া দিতে বলে মানিক। সুরুজ কলাপসিবল গেটের ভেতর ঢোকে।

মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধে রতনের দুই রুমের বাসা। সেখানের একটি ঘরে আসন্ন শীতের রাতে বউয়ের শরীরের ওপরে রতন তখন বুকডন দিচ্ছিল। চরম এক মুহূর্তে রতনের মোবাইলটি বেজে ওঠে। মানিকের কল। ডাক আসে, মর্গে যেতে হবে।

আচ্ছা স্যার! বলে ফোনটা রেখেই ‘খানকির পোলা’ শব্দটি উচ্চারণ করে রতন। শুনে যে কারো মনে হতে পারে, ‘স্যার’ আর ‘খানকির পোলা’ শব্দ দুটো মিলে একটি পূর্ণাঙ্গ শব্দ। গজগজ করতে করতেই জামা-কাপড় পরে নেয় রতন।

বউকে বিছানায় রেখেই রতনকে তড়িঘড়ি ছুটতে হয় সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যালের দিকে। ফাঁকা রাস্তায় মোটরসাইকেলে আসতে বেশি একটা সময় লাগেনি তার। এসেই যতনের এই পড়ে পড়ে ঘুমিয়ে থাকা দেখে মেজাজ কার ভালো লাগে?

মানিককে একটা সালাম দিয়ে রতন বলে, স্যার, যতন তো মাল খাইয়া টাল। এখন কী করব?

—তুমি একাই কাজ সারো।

—সঙ্গে একজন থাকলে সুবিধা হয় স্যার। ভাঙা গলায় বলে রতন।

—এত রাইতে এখন কারে ধরে আনবা?

—আমার ভাইগ্না পান্নাকে একবার ডাকব? ও কাছাকাছিই থাকে।

—ডাকো, যারে খুশি ডাকো। কাজ হওয়া হলো কথা। খানিকটা বিরক্তি নিয়েই মানিক কথাগুলো বলে।

একবার, দুইবার, তিনবারের মাথায় পান্না ফোনটা রিসিভ করে।

ঘুম জাড়ানো কণ্ঠে বলে, আসতাছি।

আধা ঘণ্টা পর তরুণ বয়সি একজন এসে হাজির। জিন্সের প্যান্ট, ডোরাকাটা টি-শার্ট, পায়ে সেন্ডেল। স্টাইল করে চুল কাটা। হাতে বালা, গলায় রুপার চেইন। নাকের নিচে পাতলা গোঁফ। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। একপলকে পান্নাকে মেপে নিল এস আই মানিক। রতনের পেছন পেছন মর্গের ভবনে ঢুকল পান্না ভগত। চেয়ারে বেঘোরে ঘুমিয়ে থাকা যতনকে আবারও একটা লাথি কষাল রতন। ধপাস করে চেয়ার থেকে পড়ে যায় যতন। কঁকিয়ে ওঠা ছাড়া এতে আর কিছুই ঘটেনি।

মর্গে ডোমের কাজ-কারবার পান্না অনেক দিন ধরেই করে আসছে। রতন মামা তার গুরু। দিনে-রাতে যখন ডাকে, পান্না ঠিক চলে আসে। এলেই যে দু-চার শ টাকা পকেটে আসে। এটা দিয়ে সিগারেট, গাঁজা আর মাঝেমধ্যে বাংলা মদের টাকাটা হয়ে যায়। নিজেকে সব সময় সিনেমার নায়কদের মতো করে সাজিয়ে রাখে। মোটরসাইকেলে করে বিকেলবেলা হাতিরঝিলে ঘুরতে যায়। কম বয়সি মেয়ে দেখলেই টিজ করে। এর জন্য কখনোসখনো গালমন্দ তো বটেই, এক-দুবার মারও খেতে হয়েছে তাকে। তবু স্বভাব যায় না মলে!

পান্নাও রমিজ গ্যাংয়ের মেম্বার। তাদের গ্যাংয়ের কেউ অটোরিকশা চালায়, কেউ সেলুনে বা ওয়েলডিংয়ের দোকানে কাজ করে, কারো-বা ভাঙারির বিজনেস। রমিজ মোটর গ্যারেজে কাজ করে। তার সঙ্গে আবার সরকারি দলের এক পাতি নেতার দহরম-মহরম সম্পর্ক। ঐ পাতি নেতাই তার স্বার্থে রমিজকে ব্যবহার করে। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। পান্না তার মামার কাজটি বড় ভালোবেসে করে। মামার সঙ্গে লাশ কাটাছেঁড়া করতে করতে সে হাত পাকিয়েছে।

মিরপুর থেকে আজ যে লাশটি এসেছে তার বয়স আনুমানিক ১৬। সুইসাইড কেস। মেয়ে নাকি প্রেম করত কোনো এক ছোকরার সঙ্গে। এ নিয়ে মা তাকে হেব্বি গালমন্দ করে সন্ধ্যায়। ইমোশনাল মেয়ে তাই রাতেই সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে লটকে যায়। বাইরে থেকে দরজা ভেঙে লাশ বের করতে হয়েছে। লাশের কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। দেখলে মনে হয়, যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ছোট ছোট লাল-হলুদ ফুলের ডিজাইন করা কামিজ, লাল রঙের সালোয়ার পরা। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা। একহারা গড়ন। পিঠ অবধি চুল। খোলা, এলোমেলো। কানে সোনার রিং। বাঁ হাতে চুড়ি। হাতে-পায়ের নখে গোলাপি নেলপলিশ। বুঝতে অসুবিধা হয় না, সাজতে ভালোবাসত মেয়েটি।

রতন তার কাজটুকু সেরে ট্রলি বিছানায় লাশটিকে শুইয়ে দেয়। সকালে ডাক্তার রিজভী সাদিক এসে রিপোর্ট তৈরি করবেন। এর আগে রতনের আর কোনো কাজ নেই। নিজের মোবাইলে লাশের একটি ছবি তুলে রাখে, বডিতে নম্বর বসায়। ব্যস। এইটুকুই।

—পান্না, তুই গিয়ে যতনের পাশে গিয়ে বস। ঐ শালার ডিউটি আজ তোর। হারামির বাচ্চা কাল কোনো টাকা পাবে না।

সুবোধ বালকের মতো পান্না মাথা নাড়ায়। মর্গের ঘর থেকে রতন বেরিয়ে আসে। এস আই মানিক ও হাবিলদার সুরুজের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে, স্যার, সব ঠিকঠাক। সকালে রিপোর্ট পাঠিয়ে দেব।

মানিকের বাইকের পেছনে সুরুজ বসলে সেটি সোজা আসাদগেটের দিকে মোড় নেয়।

পান্নাকে রেখে রতন বেরিয়ে আসে। সে-ও গাড়ি স্টার্ট দেয় তড়িঘড়ি।

রাত তখন প্রায় সাড়ে তিনটা। মোবাইলে ফেসবুক খুলে বসে পান্না। কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে ইউটিউব অন করে। একসময় বরাবরের মতো তার প্রিয় সাইটগুলোতে ঢুঁ মারে। নারী শরীর, নারীর শরীর। উত্তেজনা, তুমুল উত্তেজনা। পান্না টের পায় তার একটি অঙ্গ ক্রমাগত স্ফিত হতে শুরু করেছে। যতনের পাশ থেকে উঠে দাঁড়ায় সে। মর্গের ঘরের ভেজানো দরজা ঠেলে ঢোকে। বড় লাইটটি জ্বালায়। ছোট ছোট পায়ে তরতাজা কিশোরীর লাশটির সামনে এসে দাঁড়ায় পান্না। গলায় কামড় দিয়ে নিস্তেজ হরিণশাবককে যেভাবে হিংস্র বাঘ টানতে টানতে নিয়ে আসে তার ডেরায়, ঠিক সেই বাঘের জ্বলজ্বলে আলো খেলা করে পান্নার চোখে। ট্রলি বিছানায় চিত্ হয়ে থাকা কিশোরী লাশের দিকে সে এগিয়ে যায় একটু একটু করে।