চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনার কাজ পেতে তিনটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান জোর তদবির চালাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে ঐসব দেশের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রসমূহ জানায়। এছাড়াও আরো কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান পিসিটির ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে প্রস্তাব দিয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরসংলগ্ন শাহ আমানত বিমানবন্দর সড়কের পাশে পতেঙ্গা এলাকায় কর্ণফুলী নদীতে পিসিটির নির্মাণকাজ আগামী এপ্রিল মাসে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০১৮ সালে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক পর্যায়ে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রায় এক বছর পূর্বে কাজ সম্পন্ন হওয়ার সময় নির্ধারিত থাকলেও তা আগামী এপ্রিলে বন্দরের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানা যায়। তিনটি কনটেইনার ও কার্গো জেটি এবং একটি ডলফিন জেটি (তেলবাহী জাহাজের জেটি) নিয়ে পিসিটি টার্মিনাল নির্মিত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং প্রতি বছর আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধিজনিত কারণে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়ে। মূলত ২০০৭ সালে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নির্মাণের পর কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ হয়নি। তার পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বন্দর জরুরি ভিত্তিতে পিসিটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কতৃর্পক্ষ মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং চট্টগ্রাম বন্দরসংলগ্ন সমুদ্র উপকূলে বেটার্মিনালের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। যার কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। আগামী ২০২৫ মাসের মধ্যে মেগা প্রকল্প দুইটির কাজ সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যার মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের জন্য গভীর সমুদ্রবন্দর ও বেটার্মিনাল ভূমিকা রাখবে বলে বন্দর বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
চট্টগ্রাম বন্দরের পিসিটি পরিচালনার কাজ পেতে সৌদি আরবের রেড সি, দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং ডেনমার্কের কনটেইনার পরিবহন কোম্পানি এপি মুলার লবিংয়ে এগিয়ে রয়েছে বলে জানা যায়। সৌদি আরবের রেড সি নামক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এক ব্যক্তি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আবার সৌদি আরবের রাজ পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উক্ত কোম্পানি হওয়ায় এবং সৌদি আরবে বাংলাদেশের বিশাল লোকজনের কর্মস্থল হওয়ায় তাদের অবস্থান সুদৃঢ় রয়েছে বলে একটি সূত্রে জানা যায়।
এদিকে দুবাইয়ের বিশ্বখ্যাত পোর্ট নির্মাণ ও পরিচালনা প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড চট্টগ্রাম বন্দরের পিসিটি, বেটার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও ধীরাশ্রম আইসিডিতে বিনিয়োগ প্রস্তাব কয়েক বছর পূর্বেই দিয়েছে। ২০১৯ সালে দুবাইয়ের সঙ্গে জি টু জি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষ থেকে পিসিটি পরিচালনার ব্যাপারে একটি প্রকল্প প্রস্তাব গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছেছে। সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ দুবাইয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে অবহিত হয়েছে। আগামী ২৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরের আরো একটি প্রতিনিধি দল দুবাই যাচ্ছেন বলে জানা যায়।
বিশ্বব্যাপী মার্কস লাইন কনটেইনার পরিবহনের যে বিস্তৃতি এবং টার্মিনাল বা জেটির মূল প্রাণ হচ্ছে পণ্যবাহী কনটেইনার ওঠানামা। এই ক্ষেত্রে মার্কস লাইনের কোম্পানি তথা এপি মুলার কর্তৃক পিসিটি পরিচালনা এবং জেটিকে কর্মময় করে রাখার ক্ষেত্রে তার অবস্থান এগিয়ে থাকবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের পণ্যবাহী কনটেইনার পিসিটি থেকে সরাসরি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে বলে বন্দর বিশেষজ্ঞদের অভিমত। যা তাদের ব্যবসার স্বার্থে প্রসারিত করতে পারে। পিসিটি পরিচালনার কাজ পেতে ইতিমধ্যে ডেনমার্কের সরকারের পক্ষ মার্কস লাইনের পক্ষে যোগাযোগ রক্ষা করা হয়েছে বলে সূত্র জানায়।
পিসিটি পরিচালনার দায়িত্ব যেই পাবে সেই প্রতিষ্ঠান ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ নিজস্ব উদ্যোগে করবে এবং অপারেশন কাজও তারা করবে। এটি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অবশ্য সবসময় বলে আসছে—যতদিন পর্যন্ত বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হবে না। ততদিন বন্দর নিজস্ব ইকুইপমেন্ট দিয়ে পিসিটির অপারেশন কাজ চালিয়ে নিবে।