আদিকাল থেকে আমাদের এখানে জুয়েলারি ব্যবসা চলে আসছে। জুয়েলারি বা স্বর্ণ ব্যবসা লাভজনক হলেও এত দিন এটিকে ছোট ব্যবসা হিসেবে মনে করা হয়েছে। আমাদের এখানে অলংকারের প্রতি নারীর সহজাত আকর্ষণ প্রাচীনকাল থেকেই। বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির সঙ্গে স্বর্ণালংকারের নানা বিষয় জড়িয়ে রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই সোনার গহনা মানুষের কাছে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এটা অনেকের আভিজাত্য ও মর্যাদার অংশ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। আমাদের সমাজে ধনী-গরিব সব শ্রেণির মানুষ কম-বেশি তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সোনার অলংকার ব্যবহার করে। অনেকে ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ হিসেবে যতটা সম্ভব সোনার গহনা নিজের কাছে রাখতে চান। বাংলাদেশসহ এশিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে সোনার অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, স্বর্ণালংকার মানে জুয়েলারি শিল্পে ভ্যালু অ্যাড, অর্থাৎ মূল্য সংযোজন অন্যান্য শিল্পের তুলনায় অনেক গুণ বেশি। হাতে তৈরি সোনার গহনার প্রায় ৮০ শতাংশ বাংলাদেশ ও ভারতে প্রস্তুত হয়। অথচ সোনার অলংকার বিদেশে রপ্তানিতে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে। প্রতিবেশী দেশ ভারত বিদেশে সোনার অলংকার রপ্তানির মাধ্যমে বেশ ভালো পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছে প্রতি বছর। বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত সোনার অলংকার বিদেশে রপ্তানির বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও সেই সম্ভাবনা মোটেও কাজে লাগানো হয়নি এত দিন।
আন্তর্জাতিক বাজারে হাতে তৈরি সোনার গহনার কদর বাড়ছে দিনে দিনে। এশিয়ার বহু দেশ সোনার গহনা প্রতি বছর রপ্তানি করে। ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি গহনার বিপুল চাহিদা রয়েছে। আমাদের এখানে যারা স্বর্ণশিল্পী বা কারিগর রয়েছেন, তাদের হাতের কাজের সুনাম দুনিয়া জুড়ে। তাদের তৈরি স্বর্ণালংকার বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে খ্যাতি অর্জনের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও সম্ভব। তারা শত শত বছর ধরে উত্তরাধিকার সূত্রে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত আছেন। এক সময় এই খাতে আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য ছিল। স্বর্ণনীতি না থাকায় ক্রমেই বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছিল তা। জুয়েলারি শিল্প বিকাশের মাধ্যমে হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে।
বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার নিবন্ধিত জুয়েলারি ব্যবসায়ী রয়েছেন। শুধু শোরুম খুলে স্বর্ণালংকার বিক্রির মাধ্যমে তাদের ব্যবসাকে সীমাবদ্ধ না রেখে জুয়েলারি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার দিকে মনোযোগী হওয়ার সময় এসেছে।
বর্তমানে বিদেশ থেকে বার আকারে স্বর্ণ আমদানি করে অলংকার তৈরি করা হয়। ভবিষ্যতে বিদেশ থেকে স্বর্ণের বার আমদানি না করে এখানে গোল্ড রিফাইনারি স্থাপনের মাধ্যমে স্বর্ণের বার তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ দেশের রিফাইনারিতে উৎপাদিত স্বর্ণের বারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ খোদাই করা থাকবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে এ দেশের সুনাম বৃদ্ধি করবে। আমাদের স্বর্ণালংকার রপ্তানি হবে সারা বিশ্বে। বিশাল বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম গোল্ড রিফাইনারি স্থাপন করতে যাচ্ছে একটি বৃহৎ শিল্প গ্রুপ। এখানে গোল্ড রিফাইনারি চালু হলে জুয়েলারি ইন্ডাস্ট্রির দ্রুত বিকাশ ঘটবে সন্দেহ নেই। অনেক উদ্যোক্তাই বিদেশে রপ্তানির জন্য সোনার অলংকার প্রস্তুতের কারখানা গড়ে তুলবেন। বর্তমানে স্বর্ণের নীতিমালা থাকায় জুয়েলারি শিল্প বিকাশের পথ অনেকটা সুগম হয়েছে। এখানে গোল্ড এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠা যেমন প্রয়োজন, তেমনিভাবে গোল্ড ব্যাংকও দরকার।