চট্টগ্রাম ওয়াসার ‘সিস্টেম লস’ দুর্নীতি

ট্টগ্রাম ওয়াসায় সিস্টেম লস দেখানো হচ্ছে প্রায় ৩০ শতাংশ। তার মধ্যে পাইপ লাইনে ছিদ্রের কারণে পানি অপচয় হচ্ছে ৫ থেকে ৭ শতাংশ। কিন্তু বাকি ২৩ শতাংশ সিস্টেম লসের কোনো হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না।

ওয়াসার বোর্ড সদস্যরা জানান, ওয়াসার বড় চ্যালেঞ্জ সিস্টেম লসের নামে পানি চুরি নিয়ন্ত্রণ করে রাজস্ব আয় বাড়ানো ও বকেয়া বিল আদায়। এসব অনিয়ম বন্ধ করতে বলা হলে সংশ্লিষ্টরা নানা সমস্যার অজুহাত তুলে ধরেন। প্রতি বোর্ড সভায় কর্মকর্তারা এসব বিষয় কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। কিন্তু পরবর্তী সভায় উপস্হাপিত প্রতিবেদনে দেখা যায় একই চিত্র। অনিয়মগুলোর কোনো পরিবর্তন আসছে না।

অভিযোগ রয়েছে, গ্রাহকদের মিটার নষ্ট হলেও সরবরাহ পায় না। স্টোরে মিটার পড়ে থাকলেও গ্রাহকরা পাচ্ছে না মিটার। এতে এসব গ্রাহকদের গড় বিল ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সিস্টেম লস নিয়ে পানি চুরি, বিপুল পরিমাণ বকেয়া অনাদায়ি থাকা, মিটার না দিয়ে গড়মিল করা ও আয় বাড়ানো নিয়ে ওয়াসা প্রতি বোর্ড সভায় আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়ন হয় না।
ওয়াসার বোর্ড সদস্য শওকত হোসেন বলেন, ওয়াসার আয় বাড়ানো তথ্যে ফাঁক আছে। গত বারের বাজেট আয় কম দেখানো হয়েছে আবার সামনের বাজেটে বেশি আয়ের কথা বলা হচ্ছে। গ্রাহকরা মিটার চাইলে বলা হচ্ছে মিটার স্টক নেই। এভাবে প্রচুর সংযোগের বিপরীতে গড় বিল করা হচ্ছে। সিস্টেম লস ২৮ থেকে ২৯ শতাংশ দেখানো হচ্ছে। কর্মকর্তারা আগেও বলেছেন তারা সিস্টেম লস সিংগেল ডিজিটে নামিয়ে আনবেন। কিন্তু বারবার বলা হলেও তা কমছে না। সিস্টেম লস কমানো গেলে রাজস্ব আয় আরো বাড়ত।’

বোর্ড সদস্য জহুরুল হক বলেন, মোট বকেয়ার প্রায় ৩০/৪০ কোটি টাকা সরকারি প্রতিষ্ঠানে রয়েছে। অনেক দিন যাবত্ ম্যাজিষ্ট্রেট নেই। ফলে মোবাইল কোর্ট করা যাচ্ছে না। সিস্টেম লস তারা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বলা হচ্ছে সরবরাহ লাইন জরাজীর্ণ থাকায় ছিদ্র দিয়ে পানি অপচয় হচ্ছে। আমরা বোর্ড সদস্যরা কর্মকাণ্ড নিয়ে সভায় যে সিদ্ধান্ত দিই তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। ফলে তাদের কার্যকর পদক্ষেপের ওপর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নির্ভর করে।’ বোর্ড সদস্য ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর নাজমুল হক ডিউক বলেন, পানি চুরি বন্ধসহ সিস্টেম লস কমাতে হলে কার্যক্রমকে কম্পিউটার সিস্টেমে রূপান্তর করতে হবে। এক সঙ্গে পুরো এলাকাকে করা যাবে না। ফলে একটি এলাকাকে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে কম্পিউটার সিস্টেমে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনেক অবৈধ সংযোগও রয়েছে। যার মাধ্যমে পানি চুরি হচ্ছে। আবার ওয়াসায় জনবল সংকটও রয়েছে। অনেকে কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।’

বোর্ড সদস্য জাফর আহমদ সাদেক বলেন, বোর্ড সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় কম। প্রতি সভায় একই বিষয় নিয়ে বারবার আলোচনা হচ্ছে। দেখা যায় বিলিংয়ের ৫০ শতাংশ অনাদায়ি থেকে যায়।

চট্টগ্রাম ওয়াসায় প্রায় ৭৬৬ কিলোমিটার পাইপ লাইন রয়েছে। আর গ্রাহক রয়েছে প্রায় ৭৮ হাজার। এসব গ্রাহকের মধ্যে ৪৯ হাজার গ্রাহকের সংযোগের পাইপ লাইন পরিবর্তন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ পাইপ লাইন বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। আগামী ২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে। ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম ইত্তেফাককে বলেন, এখনো নগরীর পুরো এলাকায় ওয়াসার সরবরাহ লাইন যায়নি। বাকি পাইপ লাইন পরিবর্তন ও নতুন এলাকা পাইপ লাইনের আওতায় আনার জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্প গ্রহণের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই হচ্ছে।’

ওয়াসার রাজস্ব বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ওয়াসায় সরকারি ও বেসরকারি খাতে পুঞ্জীভূত বকেয়া প্রায় ১২৫ কোটি টাকা। এসব বিল খেলাপিদের ইতিপূর্বে বকেয়া আদায়ের জন্য তাগাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাড়া সিলছে না। এখন বিল খেলাপিদের অনাদায়ি বিল পরিশোধ করার জন্য নোটিশ প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাগ করে বকেয়া আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।