ঢাকার সাভারে পোশাক শিল্পের তিনটি কারখানার প্রতিটির জন্য অনুমোদিত গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআই (প্রতি বর্গইঞ্চিতে গ্যাসের চাপের ইউনিট)। অথচ জানুয়ারি জুড়ে এগুলো শূণ্য থেকে ৬ পিএসআই চাপে গ্যাস পেয়েছে। একই অবস্থা নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত একটি স্পিনিং এবং আরেকটি টেক্সটাইল মিলের। এ দুইটি কারখানার জন্যও ১৫ পিএসআই চাপের গ্যাস বরাদ্দ থাকলেও গত মাসে সর্বোচ্চ ৪ পিএসআই চাপে গ্যাস পেয়েছে। কখনও কখনও কোনো গ্যাসই পায়নি। এ কারখানাগুলো মতো গ্যাস সংকটে ভুগছে দেশের প্রায় সব শিল্প কারখানা। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পেয়ে উৎপাদন কমেছে সেগুলোতে। উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রায় ২৫ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে টেক্সটাইল মিলসগুলোতে। স্পিনিং, নিটিং, গার্মেন্টস, স্টিলসহ বিভিন্ন শিল্পে ৫ থেকে ২০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে দৈনিক ৪৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে ২৫০ থেকে ২৭৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। গত ২-৩ বছর ধরে দৈনিক ৪১০-৪৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে ৩১০-৩৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে গত ৪ এপ্রিল ২৯৫ কোটি ঘনফুট, গত ১ আগস্ট ২৮৪ কোটি ঘনফুট এবং গত ৯ জানুয়ারি ২৫৬ কোটি গ্যাস সরবরাহ করা হয়। মূলত: উৎস থেকে গ্যাস কম পাওয়ার কারণেই সরবরাহে এ ঘাটতি কমতে শুরু করে। মোটা দাগে চারটি কারণে চাহিদা ও সরবরাহ ঘাটতি বাড়তে শুরু করে। এগুলো হলো- দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে প্রমাণিত মজুদ কমতে থাকা, বিশ^বাজারে এলএনজির (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) দাম বাড়তে থাকা, দেশে চালুথাকা দুইটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি গত নভেম্বরে অকার্যকর হয়ে যাওয়া এবং সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানায় কূপ সংস্কার কাজ চলা।
গত ১২ জানুয়ারি বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে সংস্কার কাজ শুরু হয়। সংস্কারশেষে গত সপ্তাহে এ গ্যাসক্ষেত্র থেকে সক্ষমতা অনুযায়ী নির্ধারিত পরিমাণে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। ফলে গত সপ্তাহে দৈনিক গ্যাস সরবরাহও কিছুটা বেড়েছে। গত ২৬ জানুয়ারি ২৬৬ কোটি ঘনফুট এবং ৩০ জানুয়ারি ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। অর্থাৎ বিবিয়ানায় সংস্কার কাজের জন্য যে ঘাটতি দেখা দিয়েছিল তা মিটেছে। এদিকে গত ১৮ নভেম্বর কক্সবাজারের মহেশখালীতে সমুদ্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) মুরিং ছিড়ে যাওয়ায় যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে তা আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি নাগাদ নিরসন হবে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান। তিনি বলেন, এ মাসের ৮ তারিখ নাগাদ টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি সারিয়ে তা অপারেশনাল করতে পারবে বলে জানিয়েছে সামিট। সব মিলিয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি নাগাদ এই এফএসআরইউ থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাবে বলে আশা করছি। এটি কার্যকর হলে দৈনিক ৪০ থেকে ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে। সে পরিমাণ এলএনজি আমদানি ও মজুদের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে।
সরকারের অতিরিক্ত সচিব নাজমুল আহসান বলেন, গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি কমিয়ে আনার জন্য সব ধরণের চেষ্টা করছে সরকার। দাম অপেক্ষাকৃত বেশি হলেও বিশ^বাজার থেকে এলএনজি আমদানির পরিমাণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। আরও এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করে গ্যাস আমদানি বাড়ানো হবে। দেশে গ্যাসের যতটুকু প্রমাণিত মজুদ আছে তার যথাযথ ও ভারসাম্যপূণ ব্যবহার করতে চায় সরকার। তাই যতদিন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হবে এবং প্রমাণিত মজুদ না বাড়বে ততদিন বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে যতটুকু গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে তার বেশি উৎপাদন করা যাবে না। স্থলভাগ এবং সমুদ্রভাগে গ্যাসের নতুন উৎসের সন্ধান জোরদার করা হয়েছে।
গত শনিবার বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, গত তিন মাস বা তারও বেশি সময় ধরে আমাদের কারখানাগুলো নির্ধারিত চাপে গ্যাস পাচ্ছে না। তিতাস গ্যাস কোম্পানি গ্যাস না দিয়ে পাইপলাইনে শুধু বাতাস সরবরাহ করে আমাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা বিল নিচ্ছে। ১ হাজার ২০০টি ইলেকট্রনিক ভলিউম ক্যারেক্টার (ইভিসি মিটার) আমদানি করা হলেও অল্পসংখ্যক মিলে তা স্থাপন করা হয়েছে। ইভিসি মিটার বসালে তিতাসের সিস্টেম লস কত শতাংশ, সেটি বোঝা যাবে। তাই হয়তো তারা ইভিসি মিটার স্থাপনে আগ্রহী নয়। অপর এক ব্যবসায়ী বলেন, নির্ধারিত চাপে ও মাপে গ্যাস না দিয়ে অতিরিক্ত টাকা নেয়ার মাধ্যমে তিতাসের এক শ্রেণীর কর্মকর্তারা প্রতারণা করছেন।
সাভার ও নারায়ণগঞ্জের পাশাপাশি গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ এবং কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত যে কারখানাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে তারা প্রায় সবাই জানিয়েছেন গত ২-৩ মাস ধরে গ্যাস সরবরাহ কমেছে। ফলে একদিকে উৎপাদন কমেছে। আবার উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। ঠিক সময়ে পণ্য দিতে না পারার ঝুঁকিতে থাকা রপ্তানিকারকরা ক্রয়াদেশ বাতিলের আশঙ্কা করছে। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বৈশি^ক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের শিল্প। এছাড়া গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুতের উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে যানবাহনে সিএনজি সরবরাহ বন্ধ এবং সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ আপাতত বন্ধ করে দিয়ে শিল্পে জোগান বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীদের একটি অংশ। তারা বলছেন, তেলে বা বিদ্যুৎ বা অন্য কোনো বির্কপ উপায়ে যানবাহন চলতে পারবে। অন্তবর্তী সময়ের জন্য সারও আমদানি করে চাহিদা মেটানো যাবে। কিন্তু শিল্পের বিকল্প উপায় নেই। তাই এখানে সরবরাহ বাড়াতে হবে। এছাড়া চলতি ফেব্রুয়ারিতে সেচ মৌসুম শুরু হচ্ছে। এ সময়ে কৃষিতেও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে।