বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা মেয়র থাকাকালে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দুটি অর্থবছরে ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) কয়েকটি খাতে ৫১ কোটি ২৪ লাখ ১২ হাজার ২২১ টাকার অনিয়ম পেয়েছে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়। সংস্থাটির বার্ষিক এই অডিট আপত্তি নিয়ে আজ বুধবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এই অর্থ সরকারি কোষাগারে ফিরিয়ে আনার জন্য এবং এ বিষয়ে এক মাসের মধ্যে কমিটির কাছে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই অর্থ অনিয়মের সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ‘গণ দাবি আইন-১৯১৩’ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ারও সুপারিশ করেছে কমিটি।
কমিটির সভাপতি ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটি অডিট আপত্তিতে দেখতে পায়, ‘ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস লিমিটেড’-এর কাছ থেকে ২০০৭ থেকে ২০০৯ অর্থবছরে হোল্ডিং কর বাবদ ৩ কোটি ৬৮ লাখ ৪৮ হাজার ২৩০ টাকা আদায় করা হয়নি। এর ফলে রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। এই অর্থ আদায়ের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার তাগিত দিয়েছে কমিটি। প্রসঙ্গত, গুলশানে অবস্থিত ওয়েস্টিন হোটেল ‘ইউনিক হোটেল এ্যান্ড রিসোর্টস লিমিটেড’-এর প্রতিষ্ঠান।
অডিট আপত্তিতে দেখা যায়, ২০০৭ থেকে ২০০৯ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়াধীন অবিভক্ত ডিসিসির বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনা, রাজস্ব আদায়ে অনিয়ম, বিলবোর্ডের টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না করা ও পশুর হাটের ইজারা কর ভূমি বিভাগে জমা না করাসহ কয়েকটি খাতে আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।
বিলবোর্ডে পাওনা ৪২ লাখ টাকা:
ডিসিসির আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় বিলবোর্ড স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা রয়েছে ৪২ লাখ ২ হাজার ১৩২ টাকা। বিলবোর্ডে স্থাপন করা বিজ্ঞাপনের ওপর ভ্যাট বাবদ এই টাকা পাওনা ডিসিসি।
পশুরহাটে রাজস্ব ফাঁকি ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা:
পশুর হাটের খাস আদায় হতে মূসক ও আয়কর বাবদ ৪০ লাখ ৫৫ হাজার ৯২৫ টাকা ৬০ পয়সা সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়নি। এছাড়া অস্থায়ী কোরবানি পশুরহাটের ইজারা মূল্যের ওপর ২০ শতাংশ হারে কর আদায় করা হলেও তা ভূমি রাজস্ব খাতে জমা দেয়া হয়নি। এতেও প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ২৮ হাজার ৩৩১ টাকা ক্ষতি হয়েছে। সবমিলিয়ে ১ কোটি ৭০ লাখ ৮৪ হাজার ২৫৬ টাকা থেকে বঞ্চিত হয় সরকার।
দামের চেয়ে মেরামত খরচ বেশি:
এ ছাড়া বর্জ্য অপসারণ ও রাস্তা সংস্কারের কাজে ব্যবহূত ভারি যন্ত্রপাতি কেনার চেয়ে মেরামত মূল্য বেশি দেখিয়ে অনিয়ম করা হয়। সিটি করপোরেশন ৩৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৩৪ টাকা দিয়ে টায়ার ডোজার (নম্বর-১ ও ৩) কেনে। অথচ এই টায়ার ডোজার মেরামতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১ কোটি ১৯ লাখ ৮৮ হাজার ৯৫ হাজার টাকা। যা বাস্তবসম্মত নয় বলে অডিট আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে সংসদীয় কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিষয়টির যৌক্তিকতা নির্ধারণ করে দু’পক্ষ বসে এর সুরাহা করে ১৫ দিনের মধ্যে অগ্রগতি কমিটিকে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
চাহিদার চেয়ে বেশি টায়ার-টিউব কেনা হয়:
অডিট আপত্তিতে দেখা যায়, সিটি করপোরেশন অযৌক্তিক চাহিদাপত্র প্রণয়ন করে বিদ্যমান গাড়ির সংখ্যা অপেক্ষা মাত্রাতিরিক্ত টায়ার ও টিউব কেনা হয়েছে। এগুলো সরবরাহ নিতে ব্যয় দেখানো হয় ১ কোটি ৬৩ লাখ ২৯ হাজার ৬শ টাকা। কমিটির, মতে- এর মাধ্যমে হয় প্রতিষ্ঠানের অপচয় করা হয়েছে, নতুবা কাগজপত্রে বেশি চাহিদা দেখিয়ে আর্থিক দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছিলেন সংশ্লিষ্টরা।
নিয়ম ভেঙে ৪০ লাখ টাকা পরামর্শক ফি:
বিধি বহির্ভূতভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কনসালট্যান্সি ফি বাবদ ৪০ লাখ টাকা দিয়েছে ডিসিসি। ওসমানী উদ্যানের সার্বিক উন্নয়ন প্রকল্পে প্রাক্কলন অপেক্ষা বিলে কাজের পরিমাণ বৃদ্ধি ও সিডিউল রেট অপেক্ষা দাখিল দর অস্বাভাবিক বাড়িয়ে ঠিকাদারকে আর্থিক সুবিধা প্রদাণ করায় ক্ষতি হয় ২২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
রড কেনায়ও দুর্নীতি:
গেন্ডারিয়া শরাফতগঞ্জ কমিউনিটি সেন্টার কমপ্লেক্সের পাইলিং সাব-স্ট্রাকচার কাজে এমএস রডের নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অতিরিক্ত দর ঠিকাদারকে দেয়া হয়েছে। এতে ক্ষতি হয় ৬১ লাখ ১০ হাজার ৫১৪ টাকা ২৮ পয়সা।
অনেক খরচের হিসাব অডিটে দেয়া হয়নি:
এয়ারপোর্ট রোড-রোকেয়া সরণী লিংকরোড নির্মাণ প্রকল্পে ২০০৭-০৯ বছরে ৩২ কোটি ৮৭ লাখ ২৪ হাজার টাকা ব্যয়ের হিসাবপত্র অডিটে উপস্থাপন করা হয়নি। আরও বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের বিপরীতে ৫ কোটি ৩১ লাখ ৪৩ হাজার ১৩৮ টাকা ব্যয়ের নথিপত্রও অডিটে দেয়নি ডিসিসি। এছাড়া ডিসিসি’র বিভিন্ন ওয়ার্ডে সড়ক ও ড্রেনেজ অবকাঠামো প্রকল্পে খরচ দেখানো ৪ কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার ৩৪১ টাকার হিসাবও অডিটে পেশ করেনি ডিসিসি।
সরকারি হিসাব কমিটির সদস্য আব্দুস শহীদ, এম. আমান উল্লাহ, ইসহাক হোসেন তালুকদার, আ.ফ.ম. রুহুল হক, আফছারুল আমীন, গোলাম দস্তগীর গাজী, শামসুল হক টুকু, মঈন উদ্দীন খান বাদল, এ কে এম মাঈদুল ইসলাম, রুস্তম আলী ফরাজী ও বেগম ওয়াসিকা আয়েশা খান বৈঠকে অংশ নেন। সিঅ্যান্ডএজি মাসুদ আহমেদ, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব ও ডিসিসি’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এতে উপস্থিত ছিলেন।
ইঅ/চৌফে/শ৬৮৯