সর্ষের মধ্যে ভূত

অনেকদিন পর বন্ধু শরীফের সাথে দেখা। কথাবার্তার এক পর্যায়ে চোখ পড়ল তার মাথায়, অনেকটা চমকিয়ে উঠলাম! এ অল্পদিনের মধ্যেই দেখছি তার মাথা থেকে অনেক চুলই পড়ে গেছে। মাথার প্রায় পুরোটাই চুলহীন হয়ে বেশ বড়সর একটা টাক গজিয়েছে! বন্ধুকে একটু মজা করেই বললাম, ‘কী রে! তুই যে দেখছি ছোটখাটো একটা চান্দু স্টেডিয়াম বানিয়ে ফেলেছিস!’

অভিমানের স্বরে ও বলল, ‘সবার মতো তুইও আমার মাথার টাক নিয়ে মজা করা শুরু করলি!’

ওর এরকম কথা শুনে হাসি মজা বাদ দিলাম। বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতেই বললাম, ‘এত চুল পড়ছে, এখনো ডাক্তারের কাছে যাসনি? চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলেই তো হয়!’

ও বিরক্তির স্বরে বলল, ‘হাসপাতাল আর ক্লিনিকে গিয়ে আলাদা তিনজন ডাক্তার দেখিয়েছি, কাজের কাজ কিছুই হয়নি!’

‘ওহ, তাহলে কী আর করার!’

খানিকটা উচ্ছ্বসিত হয়ে ও বলল, ‘তোর সাথে দেখা হয়ে ভালোই হলো, তোর কাজ না থাকলে চল আমার সাথে।’

জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথায়?’

‘পাশের মাদ্রাসা মোড়ের এক হোমিও ডাক্তারের কাছে!’

জিজ্ঞাসু স্বরে বললাম, ‘কিন্তু অ্যালোপ্যাথিতে কাজ হলো না, হোমিওতে কি হবে?’

ও অনেকটা আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘এক বড় ভায়ের কাছে ওনার কথা শুনলাম। বেশ অভিজ্ঞ ডাক্তার। বড় ভাইও শুনেছে অনেকের মাথায় নাকি চুল গজিয়েছে ওনার ওষুধ খেয়ে।’

হাতে তেমন কোনো কাজ ছিল না, আর অনেকদিন পর বন্ধুর সাথে সঙ্গ দেওয়া যাবে ভেবেই বললাম, ‘বেশ! চল যাওয়া যাক!’

 

হোমিও ডাক্তারের চেম্বারটা বেশ গোছানো। রোগীদের ভীড় লক্ষ্য করলাম। কম্পাউন্ডারের কাছে সিরিয়ালে শরীফের নাম লিখে অপেক্ষা করতে লাগলাম। একেকজন রোগীর সিরিয়াল আসছে, সেই সিরিয়াল অনুযায়ী একেকজন ঢুকছে আর বের হচ্ছে। রোগীদের যাওয়া আসার সময়টুকুতে দরজার ফাঁক দিয়ে ডাক্তারকে বেশ দেখা যাচ্ছে! ফর্সা মতো লোক, ক্লিনসেভ মুখমণ্ডল আর মাথায় একটা কাউবয় হ্যাট। বেশ কিছুক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে করতে অনেকটা বিরক্ত হয়ে গেছিলাম, বিরক্তি কাটাতে মগ্ন হয়ে পড়লাম মুঠোফোন নিয়ে। কিছুক্ষণ পরেই হঠাত্ শরীফ আমার শরীরটা ঝাকিয়ে বলল, ‘চল দোস্ত, ডাক্তার দেখাব না!’

অবাক হয়ে বললাম, ‘ক্যান? তোর সিরিয়াল তো কাছাকাছি চলে এসেছে! আর একটু অপেক্ষা করলেই তো হয়ে যাবে!’

মুখে একরাশ বিরক্তি এনে ও বলল, ‘আরে এ ডাক্তারে কাজ হবে না!’

অবাক হয়ে বললাম, ‘ক্যানো? আগেই কিভাবে বুঝে গেলি?’

‘ডাক্তারের দিকে তাকা, তাইলেই বুঝবি!’

দরজার ফাঁক দিয়ে ডাক্তারকে স্পস্ট দেখতে পেলাম, কিন্তু তেমন কিছুই বুঝলাম না। শরীফকে বললাম, ‘কই, কিছুই তো বুঝলাম না!’

‘আরে উনার মাথার দিকে তাকা!’

ডাক্তারের মাথার দিকে তাকিয়েও কিছু বুঝলাম না, শুধু দেখলাম মাথার হ্যাটটা তিনি খুলে রেখেছেন! শরীফের দিকে অবুঝের দৃষ্টিতে তাকালাম। ও বলল, ‘এখনো কিছু বুঝিসনি তাই তো!’

হ্যাঁ-বাচক মাথা ঝাঁকালাম, তারপর আবারও ডাক্তারের দিকে তাকালাম। এবার আর বুঝতে কিছু বাকি রইল না, ঘটনা দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার হয়ে গেল। ডাক্তারের মাথা ভর্তি একটা টাক দৃশ্যমান, সে টাকটায় মাথার ঠিক উপরে ঝুলানো বাল্বের আলো পড়ে রীতিমতো ফুটবল বিশ্বকাপ ট্রফির মতো চকচক করছে!

শরীফকে আর কিছু বলতে হয়নি। ঘটনায় আকস্মিকতায় আমার ওপর বোধকরি কবি ভর করল! দুই বন্ধু ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে ছড়া মেলালাম—

‘দেখলাম এ কি! সর্ষে দিয়ে ভূত তাড়াতে এসে—

সর্ষের মধ্যেই বিশাল একটা ভূত রয়েছে মিশে!’

 

রাজশাহী