ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ভক্তদের আনাগোনা থাকে হাইকোর্ট মাজারে

 
 
দুপুর পৌনে দুইটা। হাইকোর্টের মুল গেট ধরে ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে বৃদ্ধ আর বিকলঙ্গ ফকিরের সারিবদ্ধ লাইন। আর একটু এগিয়ে গেলে দেখা যায় বেশ বড় আকারে তৈরি মসজিদ। এই মসজিদের মধ্যখানে রয়েছে হযরত শাহ খাজা শরফুদ্দীন চিশতি (রহ.)-এর মাজার। যা ‘হাইকোর্টের মাজার’ নামে পরিচিত। ভোর থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত ভক্তদের আনাগোনা চলে মাজার প্রাঙ্গণে। ঢাকার প্রাণকেন্দ্র হাইকোর্টের মাজারটি অনেক আগে থেকেই হিন্দু-মুসলিমসহ সব মানুষের কাছে অতি পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত।
মাজারের এর এক পাশে লাইন ধরে দুপুরের খাবার নিতে দেখা যায় ফকির ও ভবঘুরেদের। মাজারের ভেতরে রয়েছে নারী ও পুরুষদের জন্য পৃথক নামাজের জায়গা। চাইলে সেখানে বিশ্রামও নেয়া যায়। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, মাজারকে ঘিরে সেখানকার মাটি, পানি, গাছ সবাই পাচ্ছে মাজারের ভক্তকুলে ভক্তিশ্রদ্ধা। প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে এই মাজারে। তবে শুক্র ও শনিবার এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ থেকে ৫ হাজারে। 
রঙিন টাইলস দিয়ে তৈরি ফটক পেরিয়ে সামনে যেতেই বাধা দেন একজন সাদাটুপি, পাঞ্জাবি পড়া প্রবীণ। বলেন, সামনে গিয়ে বাম পাশের গেটের ভেতরে মেয়েদের জন্যে আলাদা ব্যবস্থা রযেছে। তার কথা মতো সামনে এগিয়ে দেখা মেলে চারজনের একটি ভক্ত দলের সঙ্গে। তারা মাজারে প্রবেশ মুখেই মাটি ছুঁয়ে সালাম করে ভেতরে প্রবেশ করেন। ওজু করা থাকলেও মাজারের পানিতে ওজু করা যেন বাড়তি কিছু মেলাবে, এই বিশ্বাসে ওজুর পানিতেও সালাম করে শুরু হয় ভক্তকুলের মনবাসনা পূরণের কার্যক্রম। ‘মনের বাসনা পূরণে’ অনেক ভক্তকে কবুতর অবমুক্ত করতে দেখা যায়।
‘হাইকোর্টের মাজারে কত ফকির ঘোরে, কয়জনা আসল ফকির?’...। স্বাধীনতার পর থেকে সেখানে আস্তানা গেড়েছিলেন নূরা পাগলা নামের এক সাধু। সে সময়ে অথাত্ সত্তরের দশকে পপ সম্রাট শিল্পী আজম খানের গাওয়া একটি গানে মাজারটির পরিচিতি আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে দেশে।
জনশ্রুতি রয়েছে, ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে মাজারের সুখ্যাতি ক্রমেই ছড়িয়ে পড়লে সেখানে নূরা পাগলা নামক এক ফকিরের বসার আসনটি অর্থাত্ পাটের তৈরী পুরাতন একটি ছালা, ভক্তদের মাঝে বিক্রি হয় সে সময়ে ১০০ টাকা মুল্যে।
ইতিহাসবিদ ও ঢাকা গবেষকরা বলেছেন, হযরত শাহ খাজা শরফুদ্দীন চিশতি (রহঃ) দরগা তথা হাইকোর্টের ইতিহাস ঘেঁটে বিশেষ কিছু জানা যায় না। ঢাকা গবেষক নজির হোসেন ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে প্রথম মোঘল সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতির দাফন সম্পন্ন হয়েছিল যা পরবর্তিতে মোঘল সম্রাটের নিদের্শে কফিন তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ফতেপুর সিক্রিতে। তারই নামের পদবি অনুসারে এলাকটি ‘মহল­া চিশতিয়ান’ নামকরণ করা হয়। হাইকোর্টের প্রাঙ্গণে এক বুজুর্গানেদ্বীন হযরত শাহ খাজা শরফুদ্দিন চিশতির (রঃ) দাফন হয় ৯৯৮ হিজরী সনে। বর্তমানে মাজারের দরওয়ার ফটকে যা লিখা রয়েছে। মাজারটি দেখতে কিছুটা তত্কালীন মসজিদের মতো ছিলো। ব্রিটিশ আমলে ঢাকবাসীর কাছে এ মাজারের তেমন গুরুত্ব ছিল না। পাকিস্থান প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর ভারত থেকে আগত মোহাজিরদের আগমনে মাজার জিয়ারত শুরু হয় এবং ক্রমে এর গুরুত্ব বাড়তে থাকে। পাকিস্থান প্রতিষ্ঠার পর হযরত খাজা শরফুদ্দিন চিশতির (র.) দরগাহ হাইকোর্ট মাজার নামে পরিচিতি লাভ করে। সেখানে কিছু ফকিরের আস্তানা হয়। তারমধ্যে ফকির নূরা পাগলা ছিল অন্যতম। লোক সমাগম বাড়তে থাকলে ১৯৬০ সালে মাজার সংলগ্ন একটি মসজিদ নির্মিত হয়। মসজিদ ও মাজারটি স্বাধীনতার পর নতুন করে সম্প্রসারন করে এর সৌন্দর্য বাড়ানো হয়। বর্তমানে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মাজার রক্ষনাবেক্ষণ করা হয়।
হিজরি ৭৩৮ সাল অনুযায়ি ১৩৪০ খ্রীষ্ঠাব্দে হযরত শাহ খাজা শরফুদ্দীন চিশতি (র.) ইন্তেকাল করেন। এরপর তার ভক্তরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তার মাজারটি সংরক্ষণ করে। বর্তমানে সুপ্রীম কোর্টের দক্ষিণ পশ্চিম কোনে ৭৬ শতাংশ জায়গা জুড়ে গড়ে মাজারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি মসজিদ। প্রতিদিন মাজারে আড়াই থেকে ৩০০ মানুষের এক থেকে দুইবেলা খাবারের ব্যবস্থা থাকে।              মাজারের একপাশেই রয়েছে অফিসঘর। এর সামনে একটি বড় কড়াইকাঠের গাছ। মাজারের বদৌলতে কড়াইগাছটিও পাচ্ছে ভক্তকুলের শ্রদ্ধা। গাছের গোড়ায় দুই ডজন মোমবাতি জ্বালিয়ে চুপচাপ দাড়িয়ে তাকতে দেখা যায় একজন মুসলি­কে। এরই একপাশে নারাায়নগঞ্জ থেকে আসা গুহবধু পান্না তার বনবাসনা পূরণে কবুতর অবমুক্ত করেন। ভক্তদের সঙ্গে স্যান্ডেল খুলে নারীদের জন্যে সংরক্ষিত কক্ষে প্রবেশ করে দেখা যায়, বিশাল একটি কক্ষের ভেতরে তিনটি দানবাক্স। একপাশের দেয়ালে বড় বড় হরফে লেখা —‘প্রতিবছর আরবি রজব মাসের ১৯ ও ২০ তারিখ ওরস মোবারক অনুষ্ঠিত হয়।’ মাজার জিয়ারতের নিয়ম হিসেবে লেখা—‘শুক্র, শনি সোম ও বৃস্পতিবার মাজার জিয়ারতের জন্যে উত্তম,’ তবে মাজারকে সিজদা করা হারাম।’
হাইকোর্টের মাজারের গেটের সামনেই কথা হয় দোকানী সুমনের সঙ্গে। সুমন সেখানে চার বছর ধরে মোম, আগরবাতি, আজমীর শরীফের রঙিন আশাপূরণ সুতা বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, মাজারটি হযরত খাজা শরফুদ্দিন চিশতি (রঃ) দরগা নামে পরিচিত। তবে, এর বেশি তেমন কিছু তিনি জানেন না, বলে জানান।
মাজারের ভেতরে কথা হয়, নারয়নগঞ্জ মাজার জিয়ারত করতে আসা গৃহবধু পান্নার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার একটি গোপন মানত আছে। তাই মাজার জেয়ারত করে কবুতর ছাড়তে এসেছি। এখন যদি আল­াহ আমার গোপন বাসনা পূর্ণ করে!’ তবে তিনি জানেন না, হাইকোর্টের মাজারটি কার নামে হয়েছে, কিংবা এর ইতিহাস।
ফারজানা নামের আরেক ভক্ত এসেছেন মীরপুর থেকে। তিনি বলেন, আমি দেশের বাইরে থাকি। কিন্তু দেশে এলই এইসব মাজার জিয়ারত করি। এখানে মনেরবাসনা পূরণে সামর্থের মধ্যে মানত করতে হয়। 
মাজারের নারী খতিব ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, অন্যান্য আর দশটা চাকরীর মতোই আমি এখানে বেতনে চাকরী করি। ১০টা থেকে বিকাল ৬টা পর্যন্ত ডিউটি শেষ করে চলে যাই। তবে তিনিও মজার সম্পর্কে তেমন কিছু বলতে পারেন না। মাজার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি অফিস কক্ষে কথা বলার পরামর্শ দেন।
মাজারের বাইরের দাকানী করিম শাহ বলেন, ‘আল­াহ বলেছেন ওলী আউলিয়ারা মরেন না। তারা জীবিত থাকেন। এখানে যারা আসেন তারা জানেন মাজারের ক্ষমতা আছে কি-না।   
সুপ্রিমকোট, হাইকোর্ট মাজার জামে মসজিদের ইমাম আলহাজ্ব হাফেজ মওলানা মো. আশরাফুল হক দাবি করে বলেন, বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা গেছে হযরত খাজা শরফুদ্দিন চিশতি (রাহঃ) ছিলেন ধর্ম প্রচারক হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতির (রঃ) দ্বিতীয় পুত্র। তিনি ১২৩০ খ্রিষ্টাব্দে আজমীর শরীফে জন্ম গ্রহণ করেন। তবে তিনি এ তথ্যের সমর্থনে কোনো ঐতিহাসিক প্রমান দেখাতে পারেননি।
 
ইঅ/চৌফে/শ৮৭৪