গাইবান্ধায় ১৭ হাজার বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত, ৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট

 
বন্যায় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার ৩০টি ইউনিয়নের ১৭ হাজার ৭৪টি ঘরবাড়ি এবং কৃষকের ৩ হাজার ৫ হেক্টর জমির ২৩ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকার  ফসল নষ্ট হয়েছে। পানি কমায় ক্ষতিগ্রস্তরা বাড়িতে ফিরতে শুরু করলেও ঘরবাড়ি সংস্কার ও কৃষকদের ক্ষতিপূরণ বা সহায়তায় এখন পর্যন্ত কোন সরকারি বা বেসরকারি পদক্ষেপ নেয়া হয় নাই। 
এদিকে বন্যা পরবর্তী ওই এলাকাগুলোতে মানুষের চর্মরোগ ও গবাদি পশুর খুড়া রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সরকারী ও বেসরকারীভাবে বিভিন্ন সংস্থার ত্রাণ তৎপড়তা অব্যাহত আছে।
সরেজমিন জেলার বন্যা কবলিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গাইবান্ধায় নদ নদীর পানি বিপদ সীমার নিচে নেমে গেছে। একারণে যাদের ঘরে বন্যার পানি উঠায় অন্যত্র নিরাপদ স্থানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের অধিকাংশ নিজ বাড়ির ভিটায় ফিরতে শুরু করেছেন। 
কিন্তু বন্যায় বাড়িঘর, ল্যাট্রিন, টিউবয়েল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেখানে থাকাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই পানি সরে গেলেও অনেকেই এখনো বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র, বাঁধ ও উঁচু স্থান ছেড়ে বাড়িঘরে ফিরতে পারছেন না।
এদিকে বিধস্ত বাড়িঘর নুতন করে তৈরি বা সংস্কারের মতো একদিকে যেমন নিজেদের হাতে টাকার অভাব রয়েছে অন্যদিকে নেই কোন সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা। 
অন্যদিকে এ বছর ওই এলাকাগুলোতে মানুষের ডায়রিয়া বা অন্য কোন রোগের ব্যাপকতা দেখা না দিলেও চর্মরোগ ও গবাদি পশুর খুড়া রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।  
জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ অফিস জানায়, বন্যায় জেলার চার উপজেলার ৩০ টি ইউনিয়নের ২৮ হাজার ২১৬ পরিবারের ১ লক্ষ ৩২ হাজার ৪৭ জন পানি বন্দি হয়। এতে মোট ১৭ হাজার ৭৪টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 
 রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত  হয় ৩০৮ কিলোমিটার, আর মধ্যে সম্পন্ন বিধস্ত মাত্র ৪৫ কিলো মিটার। ব্রিজ সম্পূর্ণভাবে তিগ্রস্ত ৪ টি এবং আংশিক ৭টি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত  ১১ টি এবং আংশিক ৩৪টি। নদীর বাঁধ আংশিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত  হয় ৪৫ কি.মি ।
 সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউ পি) চেয়ারম্যান মনজু মিয়া জানান, তার ইউনিয়নের ৩ হাজার পানিবন্দী পরিবারের মধ্যে ১ হাজার ২০০ পরিবারের বাড়িঘর, টিউবয়েল ও ল্যাট্রিন নষ্ট হয়ে গেছে। এগুলো সংস্কার করার মতো আর্থিক সামর্থ্যও তাদের নেই। সরকারি বেসরকারি কোন টিন বা আর্থিক সহায়তাও এখনো পাওয়া যায়নি। থাকার ঘরের অভাবে এখনও ৫টি আশ্রয় কেন্দ্র ও ওয়াপদা বাঁধে ১ হাজার পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে।
জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ অফিসের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুল হুদা জানান, তাদের হাতে ৯শ বান্ডেল টিন রয়েছে এগুলো ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। এছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বরাদ্দ চেয়ে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে।
ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ সরকার জানান, তার ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা এখন পর্যন্ত কোন সহায়তা পায়নি। এদিকে তাদের হাতে কোন টাকা না থাকায় পানি নেমে যাবার পর তারা নুতন করে চাষাবাদও করতে পারবেন না। 
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মীর আব্দুর রাজ্জাক জানান, বন্যায় সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার ২২টি ইউনিয়নে ৩৭ হাজার ৬৪০ কৃষকের ৩ হাজার ৫ হেক্টর ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে। তার মধ্যে রোপা আমন ২ হাজার ৬শ’ ৮১ হেক্টর, আউশ ধান ১শ’, আমন বীজতলা ১২৪ হেক্টর এবং শাক সবজি ১শ’ হেক্টর। যা টাকায়  ২৩ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকা।   
 তিনি আরো বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত জমি ও কৃষকদের তালিকা ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে। আশা করা যায় অন্যান্যবারের মতো সরকার তাদের সহায়তা দিবে। তবে কৃষকরা বসে না থেকে ওই জমিতে গঞ্জিকা ও ব্রি ২৮ ধান, আগাম ভুট্টা, মাস কালাই, খেসারি ডাল, মরিচ ও শীতের শাক্সবজি যাতে চাষ করে সে জন্য পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
গাইবান্ধা জেলা সিভিল সার্জনের দায়িত্বে থাকা ডাক্তার শাহাদৎ হোসেন শাহী জানান, বন্যা কবলিত এলাকায় ৫০ টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। পানি দীর্ঘ সময় থাকায় হাত ও পায়ে ঘায়ের যে প্রাদুভার্ব দেখা দিয়েছে। টিমগুলো তা প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে।
গাইবান্ধা জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা আবুল কাশেম জানান, তাদের নিকট যথেষ্ট পরিমাণ খুড়া রোগের ভ্যাকসিন মজুত আছে। মাঠে ১২ টি ভ্রাম্যমাণ টিম কাজ করছে। কিন্তু প্রতিটি ভ্যাকসিন মাত্র নাম মাত্র মূল্য ১০ টাকা দরে ওই টিমের কাছ থেকে কিনতে হবে। যা গ্রামের সাধারণ মানুষ নিতে চাচ্ছে না। এ জন্য অবশ্য ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।