অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকিতে রয়েছে। এ রোগ প্রতিরোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ না  নিলে এবং এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না করলে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। মানুষের মৃত্যু আশংকাজনক হারে বেড়ে যাবে এবং মরণব্যাধি ক্যান্সার ঘরে ঘরে দেখা দেবে। ডায়াবেটিস মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে যাবে। এ হুঁশিয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অসংক্রামক ব্যাধি (এনসিডি) নিয়ন্ত্রণ প্রোগ্রামের কর্মকর্তারা বলেন, এ দেশে অসংক্রামক ব্যাধি বেড়েই চলছে। ডায়াবেটিস, হূদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, স্তন ও জরায়ু ক্যান্সার এবং ফুসফুস ক্যান্সার প্রতি বছর দ্বিগুণ হারে বাড়ছে বলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তথ্য আসছে। বাংলাদেশ ডায়াবেটিস সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান বলেন, ডায়াবেটিস ব্যাপক হারে বাড়ছে। এর কারণ হিসাবে তিনি বলেন, ফাস্টফুড, হাঁটাহাঁটি কমিয়ে ফেলা, নগরায়নের নামে রাস্তাঘাট ও খোলা মাঠ দখল হয়ে যাওয়া ও ভেজাল খাদ্য সমাগ্রীর কারণে ডায়াবেটিস বেড়ে চলছে। আগামী ৩০ বছর এ অবস্থা চলতে থাকলে ডায়াবেটিস দ্বিগুণ হারে বাড়বে বলে তিনি সতর্ক করে দেন। তিনি বলেন, বর্তমানে ঘরে ঘরে ডায়াবেটিস রোগী রয়েছে। ডায়াবেটিস প্রতিরোধে খাদ্যাভাস পরিবর্তন ও ব্যায়ামসহ সচেতনতার কোন বিকল্প নেই।

আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে ৪ দিন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের ১১টি দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীরা এ অঞ্চলের প্রধান প্রধান স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করবেন। অসংক্রামক ব্যাধি আলোচনার অন্যতম মূল বিষয়বস্তু বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়।

এদেশে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ভাগ ফাস্টফুট খেতে পছন্দ করে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিক্রি হচ্ছে ফাস্টফুড। এ খাদ্য ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য মারাত্মক হুমকি বলে কিডনি, লিভার ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞগণ জানান। কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও  প্রখ্যাত কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, ক্রনিক কিডনি রোগ ও একিউট কিডনি রোগ বেড়েই চলছে। এর কারণ হিসাবে তিনি বলেন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়রিয়া, গর্ভাবস্থায় জটিলতা, সড়ক দুর্ঘটনা ও এন্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যাপক ব্যবহার করায় কিডনি রোগ প্রতি বছর দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ বাড়লে কিডনি রোগ বাড়বেই। এছাড়া ভেজাল, কেমিক্যাল ও বিষাক্ত খাদ্য সামগ্রীর কারণে কিডনি রোগ বাড়ছে বলে তিনি জানান।

নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউটের যুগ্ম পরিচালক ও নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম বলেন, সম্প্রতি এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মেডিসিন বিভাগে ভর্তিকৃত রোগীদের ৪০ ভাগই স্ট্রোক ও নিউরোলজি সংক্রান্ত। অপর এক জরিপে দেখা যায়, এক লাখ লোকের মধ্যে ২৫০ জন স্ট্রোকের রোগী। যত মৃত্যু হচ্ছে এর তিন নম্বর কারণই হচ্ছে স্ট্রোক। ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, ধূমপান, তামাক ও জর্দা পাতা গ্রহণ, হতাশা ও দুশ্চিন্তাগ্রস্তরা স্ট্রোক করছে বেশি। এ ছাড়া ভেজাল, কেমিক্যাল ও বিষাক্ত খাদ্যদ্রব্যের কারণে স্ট্রোক বাড়ছে।

ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আকরাম হোসাইন বলেন, ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্য এবং পরিবেশগত কারণে মরণব্যাধি ক্যান্সার বেড়েই চলছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী এক দশকে প্রতি পরিবারে একজন করে ক্যান্সার রোগী পাওয়া যাবে। এ চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। যা সাধারণ মানুষের পক্ষে ব্যয়ভার বহন করা কঠিন। এ ছাড়া শাক-সবজিতে কীটনাশক ব্যবহার, পরিচ্ছন্নতার অভাব, ধূমপান ও ইনফেকশনের কারণে ক্যান্সার বাড়ছে। এ রোগ প্রতিরোধে সে ধরনের কোন প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে না। এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করলে ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতে পারে বলে তিনি জানান।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের অসংক্রামক ব্যাধির বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তৃতায় বলেন, আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে অসংক্রামক ব্যাধিতে মৃত্যুর হার ২৫ ভাগ কমিয়ে আনা হবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর ওই বছরই সংক্রামিক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে অপারেশনাল প্রোগ্রাম চালু করা হয়। স্বাস্থ্য জনসংখ্যা পুষ্টি সেক্টর রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রোগ্রামের (এইচপিএনএসডিপি) আওতায় অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ২০১৬ পর্যন্ত ৫১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।
এ প্রোগ্রামের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. আমিরুল হাসান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী অসংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে দেশব্যাপী কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনসিডি কর্নার খোলা হয়েছে। সেখানে একজন ডাক্তার ও একজন নার্স দায়িত্ব পালন করছে। এছাড়া ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিকে এনসিডি প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি অসংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ নানা ধরনের প্রশিক্ষণ চলছে। ২০১৬ সাল নাগাদ অসংক্রামক ব্যাধিতে মৃত্যুর হার ২৫ ভাগ কমিয়ে আনা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।